মো. জিয়াউল হক
২০২১ সালের মে ও জুন মাসে দাপ্তরিক সফরে দেশের সীমান্তবর্তী নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁ ও পঞ্চগড় জেলা ভ্রমণ করি। আগে শোনা যেতো, উত্তরবঙ্গ মানে মঙ্গাপীড়িত এলাকা। ভ্রমণকালে ভুল ভেঙ্গে এক বিচিত্র দৃশ্য ও অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়। উক্ত সফরে দেখা যায়, রাস্তার দুই পার্শ্বের বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে ভুট্টার চাষ হয়েছে। বর্তমানে ভুট্টার গাছ হতে ভুট্টার মোচা সংগ্রহ এবং তা বাড়ির আঙিনা বা রাস্তায় মোচা হতে ভুট্টা মাড়াইযন্ত্রের মাধ্যমে ভুট্টার দানা পৃথক করা, পিচঢালা হাইওয়ের মাঝ বরাবর শুধুমাত্র একটি গাড়ি চলাচলের সংস্থান রেখে ত্রিপল বা পলিথিন বিছিয়ে কৃষক/কৃষাণিগণ হলুদ রং এর সমারোহে ভুট্টা শুকানো এবং সেই সাথে গুদামজাতকরণ কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছেন। তাই সীমান্তবর্তী ভুট্টা চাষাবাদের প্রতি লক্ষ্য করে বিচিত্র এ দৃশ্য ও অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে মনে পড়ে যায় কবি দ্বিজেন্দ্র লাল রায় এর ‘নতুন কিছু করো’ কবিতার শেষ চারটি চরণ-
ঘোড়াগাড়ি ছেড়ে এখন
বাইসাইকেলে চড়ো,
—- নতুন কিছু করো
একটা নতুন কিছু করো।
বাংলার সীমান্তবর্তী জেলার কৃষকগণ নিজের অজান্তে কবি দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের “নতুন কিছু করো” কবিতার বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয় উত্তরবঙ্গের কৃষক/কৃষাণিরা কত বেশি অভিযোজন (Adaptation) জ্ঞান এবং ক্ষমতা সম্পন্ন। ভুট্টা দানাদার খাদ্য শস্য হিসেবে সারাবিশ্বে সুপরিচিত হলেও বাংলাদেশে এর পরিচিতি খুবই কম সময়ের। আজ থেকে প্রায় ১০ হাজার বছর পূর্বে মেক্সিকোতে সনাতন পদ্ধতিতে ঘাস ও দানাদার শস্য হিসেবে ভুট্টা চাষাবাদ শুরু হয়। ভুট্টাকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় Corn এবং ভারতবর্ষ ও স্প্যানিশ ভাষায় Maiæe বলা হয় (বাংলা পিডিয়া)। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সাল হতে কম্পোজিট জাতের বীজ দিয়ে ভুট্টা চাষাবাদ শুরু হয়। তৎকালে বেশিরভাগ ভুট্টা পশুখাদ্য ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কালের পরিক্রমায় সময় এবং চাহিদার প্রেক্ষিতে ভুট্টা স্বগুণে মনুষ্য খাদ্যশস্য হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। কারণ ভুট্টায় ১২.৪% আমিষ, ৭৪% শর্করা, ৪৬১ কিলোক্যালোরি শক্তি এবং প্রতি ১০০ গ্রামে ৯০ মিলিগ্রাম ক্যারোটিন বা ভিটামিন রয়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ু ও মাটি ভুট্টা চাষের উপযোগী; যা রবি ও খরিপ উভয় মৌসুমে চাষ করা যায়। প্রথমদিকে বীজের মান উত্তম না হওয়ায় ফলন কমের ফলে কৃষক আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিএআরআই) কর্তৃক হাইব্রিড জাতের ভুট্টা অবমুক্ত করে। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সাল হতে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে এদেশে ভুট্টার হাইব্রিড জাতের বীজ চাষাবাদ চালু হয়। ফলে বাড়তে থাকে একই সাথে ভুট্টার জমি ও উৎপাদন। দেশে দানাদার শস্যগুলোর মধ্যে হেক্টর প্রতি উৎপাদনের দিক থেকে ভুট্টার অবস্থান প্রথম। কৃষিপ্রধান এদেশে দানাদার শস্যের আবাদী এলাকা এবং মোট উৎপাদনের দিক থেকে ধানের পরই ভুট্টার অবস্থান। অপরদিকে দানাদার শস্য হিসেবে বিশ্বে ভুট্টার অবস্থান ২য়। বিশ্বে ভুট্টা উৎপাদনে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ২৩তম। এক পরিসংখানে জানা যায়, ২০০২-০৩ সালে ভুট্টার মোট উৎপাদন ছিল মাত্র ১.৭৫ লাখ মেট্রিক টন যা ২০১২-১৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.৭৮ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক দশকে উৎপাদন প্রায় ১২ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার ২০১৯-২০ সালে উৎপাদন ৫৪.০৪ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ বিগত সাত বছরে প্রায় ১.৫ গুণ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষিতাত্ত্বিক হিসেবে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশে ভুট্টার চাহিদা ৬৬.৭২ লাখ মেট্রিক টন এবং উৎপাদন ৫৪.০৪ লাখ মেট্রিক টন (সূত্র: ২৫/০২/২১ ডব্লিউএমআরআই এর সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপিত পেপার)। বর্তমানে ভুট্টার সিংহভাগ হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু এবং মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হলেও মানুষের খাদ্য হিসেবে গমের সাথে সংমিশ্রণে আটা তৈরির প্রচলন শুরু হয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা ও যমুনা বিধৌত চরাঞ্চলে ব্যাপক ভুট্টা চাষ হয়ে থাকে। তাই শস্য জোনিং অনুসরণ করে দেশের যেসব এলাকায় সেচের পানির সমস্যা সেসকল জেলায় কৃষি মৌসুমভিত্তিক কম বেশি ভুট্টার চাষ বিস্তৃতি লাভ করছে। এ সম্প্রসারণের সাথে সাথে ব্যবহার ও বিপণন ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটছে। ফলে সারাদেশে ভুট্টা প্রক্রিয়াজাতকরণে বিভিন্ন শিল্প কারখানা এবং শ্রমের সংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
বিএডিসি’র ক্ষুদ্রসেচ বিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন “লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান ইউনিয়নের ভূপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ সম্প্রসারণ মডেল স্থাপনের লক্ষ্যে পাইলট প্রকল্প” এর কার্যক্রমসহ অন্যান্য প্রকল্পের কার্যক্রম সরজমিনে পরিদর্শনের নিমিত্ত গত মে, ২০২১ মাসে লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম এবং জুন, ২০২১ মাসে ঠাকুরগাঁ ও পঞ্চগড় জেলা ভ্রমণকালে সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে মঙ্গাপীড়িত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর কৃষিতে অভাবনীয় অগ্রগতি দেখতে পাই। বিএডিসি’র আওতায় বাস্তবায়নাধীন পাইলট প্রকল্পের কার্যক্রম নিয়ে প্রকল্প এলাকার ৩টি ২কিউসেক ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিচালিত পাম্প (এলএলপি) এর গ্রুপ ম্যানেজার ও চাষী যথাক্রমে জনাব মো. নরুল ইসলাম ও মো. আব্দুর রহিম শেখ (গ্রাম: নিজ শেখ সুন্দর পাড়া) এবং জনাব মো. খাজা মিয়া (গ্রাম বলিপাড়া, হাতীবান্ধা, লালমনিরহাট)-এর সাথে বিস্তারিত আলাপ হয়। আলাপচারিতায় তারা জানান, হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান ইউনিয়নটি নিজ শেখ সুন্দর, আরজী শেখ সুন্দর, পাক শেখ সুন্দর ও ঠেংধরা মৌজা অর্থাৎ মোট ৪টি মৌজা নিয়ে গঠিত। ইতোপূর্বে সেচ সুবিধা না থাকায় অত্র এলাকায় তেমন কোন ফসলের চাষাবাদ হতো না। শুধুমাত্র কিছু গম,তামাক, মাসকালাই, শাক-সবজি ও রোপা আমন ফসল উৎপাদিত হতো এবং ফলন অনেক কম হতো। আজ থেকে এক যুগের বেশি আগে পরীক্ষামশূলকভাবে ভুট্টার চাষাবাদ শুরু হয়। তিস্তার বালুময় চর এলাকায় সেচনালা তৈরি ও সেচযন্ত্র পরিবহণ পরিবহণ সমস্যা এবং ফসলে বেশি পানির প্রয়োজন হওয়ায় কৃষকগণ শস্য উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলে তিস্তার চরাঞ্চলে কৃষি জমি ও সেচের পানির বিতরণের সমস্যার কারণে চাষাবাদ বিঘ্নিত হয়। দিনের পর দিন এ সমস্যা নিয়ে চলছিল স্থানীয় কৃষকগণ। এ সমস্যা সমাধানের নিমিত্ত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)’র মাধ্যমে বালিময় চর এলাকায় সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটি (ডব্লিউএমআরআই), নশিপুর, দিনাজপুর কর্তৃক পানি সাশ্রয়ী অধিক উৎপাদনশীল জাতের হাইব্রিড ভুট্টা বীজ উদ্ভাবনে বর্ণিত এলাকায় কৃষিতে সবুজ বিপ্লব সাধিত হয়েছে। সেচ বিভাগ কর্তৃক উল্লেখিত প্রকল্পটি চালুর পর সানিয়াজান ইউনিয়নটিতে ব্যাপক ভুট্টা এবং অন্যান্য রবি শস্য চাষাবাদ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগে সীমান্তবর্তী এলাকায় দিনে একবেলা যাদের খাবার জোটানো কষ্টসাধ্য ছিল, আজ তাঁদের ঘরে বিদ্যুতের লাইট, ফ্যান, টিভি, ফ্রিজ, মটর সাইকেল ও গ্রামগঞ্জের হাট বাজারে চা-বিস্কুট ও অন্যান্য তৈরি খাবার স্থান করে নিয়েছে। যা আজ থেকে প্রায় একযুগ আগে অকল্পনীয় ছিল। বর্তমানে সানিয়াজান ইউনিয়নটি বিদ্যুৎচালিত এলএলপির সাহায্যে ভূপরিস্থ পানির সেচে আন্ত:সংযুক্ত ভূগর্ভস্থ (Inter-Linking Buried Pipe) সেচ পদ্ধতি চালুর ফলে ভুট্টার চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ইউনিয়নটির চারিদিকে তাকালে দেখা যায়, শুধু ভুট্টা আর ভুট্টা। ভুট্টার সেচ ব্যবস্থা এবং চাষ পদ্ধতি বিষয়ে কৃষকগণ জানান, ভুট্টার জমিতে মাত্র ৩-৪টি চাষ দিতে হয়। ভুট্টার বীজ ৮-১০ কেজি/একর এবং রোপন একটি বীজ সারি থেকে সারির দুরত্ব ২২ ইঞ্চি, গাছ হতে গাছের দুরত্ব ১০ ইঞ্চি। ভুট্টার জীবনকালে জমিতে ৩-৪টি সেচ লাগে। যা যথাক্রমে ১ম সেচ-বীজ বপনের ১৫-২০ দিনের মধ্যে (৪-৬ পাতা পর্যায়), ২য় সেচ-বীজ বপনের ৩০-৩৫ দিনের মধ্যে (৮-১২ পাতা পর্যায়), ৩য় সেচ-বীজ বপনের ৬-৭০ দিনের মধ্যে (মোচা বের হওয়া পর্যায়) ও ৪র্থ সেচ-বীজ বপনের ৮৫-৯৫ দিনের মধ্যে (দানা বাঁধার পূর্ব পর্যায়) দিতে হবে। প্রতি সেচে চাষীদের খরচ ৪০০ টাকা/একর। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৪টি সেচে খরচ প্রতি মৌসুমে ১৬০০ টাকা/একর। যা রবি মৌসুমে বোরো ধানের সেচ খরচের ২৫%। ভুট্টার ফুল ফোঁটা ও দানা বাঁধার সময় কোনক্রমেই জমিতে যাতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। এখানে আরও উল্লেখ্য, বিএডিসি সানিয়াজান ইউনিয়নে মোট ১০টি এলএলপির আন্ত:সংযুক্ত ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ করেছে। আন্ত:সংযুক্ত ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণের ফলে যদি কোন একটি সেচযন্ত্র যান্ত্রিক ক্রটি কারণে বিকল হয়ে যায় তবে নিকটবর্তী পাম্পের পানিতে সেচ প্রদান করা সম্ভব হয়। ভূপরিস্থ পানির আন্ত:সংযুক্ত ভূগর্ভস্থ সেচনালা স্থাপনের ফলে সেচ খরচ, সার ব্যবহার, সময় ও পানির অপচয় অনেক কমেছে। এছাড়াও জমিতে আগাছা হলে তা দমনে নিড়ানি বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। সারের পরিমাণ-১ম ডোজ-ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি প্রতি শতাংশে ১.০ কেজি করে এবং প্রতি একরে জিপসাম-৫০ কেজি, বোরন-৪.০ কেজি, জিংক-৬.০ কেজি ও ম্যাগনেসিয়াম-১০ কেজি প্রয়োগ করা হয়। ৩৫-৪০দিন পর ২য় ডোজ-প্রতি শতাংশে ৫০০ গ্রাম করে ইউরিয়া ও টিএসপি প্রয়োগ করা হয়। ৬০-৬৫ দিন পর ৩য় ডোজ, শুধুমাত্র প্রতি শতাংশে ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া প্রয়োগ করা হয়। যা মাটির গঠন ও বুণট ভেদে সেচের সংখ্যা ও সারের পরিমাণ কম বেশি হতে পারে। ভুট্টা পরিপক্ক হলে মোচা সংগ্রহের পর জ্বালানি হিসেবে ভুট্টার গাছ কর্তন বা ট্রাক্টর দিয়ে জমিতে মিশিয়ে জৈব সার তৈরি করা হয়। ভুট্টার মোচা হতে দানা পৃথক করার জন্য ভুট্টা মাড়াইযন্ত্র ব্যবহার করা হয়। ভুট্টার উৎপাদন প্রতি শতাংশে প্রায় ১.৫ মণ (প্রায় ৫৫-৬০ কেজি) পাওয়া যায়। যার বর্তমান বাজার মূল্য ৭৫০-৮০০ টাকা প্রতিমণ। ভুট্টায় সাধারণত আন্ত:ফসল হিসেবে দুই সারির মাঝের কেলেতে সরিষা, মরিচ, মশূলা, লালশাক ও নাপা শাক চাষ করা হয়ে থাকে। তাই অন্য কোন ফসলের চেয়ে ভুট্টা অনেক বেশি লাভজনক। ফলে আজকের আধুনিক লাগসই ও টেকসই কৃষি প্রযুক্তি আমাদের আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
উক্ত ভ্রমণকালে এবং পরবর্তীতে আলাপ হয় প্রচার বিমুখ, স্বল্পভাষী, প্রথিতযশা বৈজ্ঞানিক ড. প্রকৌশলী মো: এছরাইল হোসেন, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটি, নশিপুর, দিনাজপুর মহোদয়ের সাথে, তাঁর কর্মস্থলে ও সেল ফোনে। জানা মতে, তিনি একাধারে একজন সার্থক কৃষি প্রকৌশলী, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং যার ছোঁয়ায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এর ফার্ম মেশিনারিজ এন্ড পোস্ট হারভেস্ট প্রসেসিং বিভাগে ভুট্টা মাড়াইযন্ত্রসহ অনেক আধুনিক লাগসই ও টেকসই কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবিত হয়েছে। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের সফল কৃষিমন্ত্রী তাঁকে ভুট্টার নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের নিমিত্ত বর্ণিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রদান করেছেন। ড. প্রকৌশলী মো. এছরাইল হোসেন জানান, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠাকাল হতে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৯টি মুক্ত-পরাগায়িত এবং ১৯টি হাইব্রিড ভুট্টার জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করেছে। জাতগুলোর উৎপাদনশীলতা যথাক্রমে ৫.৫-৭.০ মে.টন/হেক্টর ও ৭.৫-১৩.০ মে. টন/হেক্টর। তন্মধ্যে খরা, তাপ ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু ও স্বল্প সেচের চাষোপযোগী জাত রয়েছে। তিনি আরও জানান, মুজিব বর্ষে ডব্লিউএমআরআই হাইব্রিড ভুট্টা-১ এবং ডব্লিউএমআরআই হাইব্রিড বেবিকর্ণ-১ জাত অবমুক্ত করেছে। প্রতিটি জাত বিএডিসিতে মালটিপ্লিকেশন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। মনুষ্য খাদ্য হিসেবে বেবিকর্ণ, খৈ ভুট্টা ছাড়াও গমের সাথে ভুট্টার সংমিশ্রনে আটা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, ভুট্টা হতে উচ্চমূল্যের খাবার কর্ণ ফ্লেক্স, কর্ণ চিপস ও কর্ণ সিরাপ তৈরি হচ্ছে। ভুট্টার দানায় ৪-৬% মূল্যবান তেল রয়েছে, যা পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং স্বাস্থ্যসম্মত। এতে কোন আমিষ বা শর্করা নেই, রয়েছে শতকরা ১০০ ভাগ চর্বি। যার পুষ্টিমাণ অন্যান্য ভোজ্য তেলের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। ভুট্টার সবুজ ঘাস প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে পশুখাদ্য বা সাইলেজ তৈরি করা হয়ে থাকে। তাছাড়াও ভুট্টা পশু, হাঁসমুরগি ও মৎস্য এর প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। ভুট্টা টেক্সটাইল ও কাঁচ শিল্পে প্রচুর পরিমানে স্টার্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভুট্টার গাছ ও মোচা জ্বালানি ও কাগজ শিল্পে ব্যবহার করা যায়। তিনি জানান, আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ভুট্টা ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আগামী দিনে ব্যবহারের অপার সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে। তাই ভুট্টা একটি সম্ভাবনাময় ফসল।
কৃষির এ অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর নিমিত্ত প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আধুনিক লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার ও অর্থ বিনিয়োগ। আমাদের দেশের দুর্গম চরাঞ্চলগুলো সবসময় সবার দৃষ্টি সীমার বাইরে থাকে এবং বরাবরই উন্নয়ন বঞ্চিত। তাই অবহেলা, উপেক্ষা ও বঞ্চনার মাত্রাও বেশি। চরে বসবাসরত জনগোষ্ঠির বৃহৎ অংশ অতিদরিদ্র এবং সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত। দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১.০-১.২% চরা ভূমি এবং প্রায় ৩২টি জেলার ১০০টিরও অধিক উপজেলার অংশবিশেষ। যার পরিমাণ প্রায় ১.৭০ লাখ হেক্টর। আর এ কৃষি জমিতে অধিক ফসল উৎপাদন করতে হলে প্রথমে চরের কৃষকদের বিভিন্ন ধরণের কৃষি সহায়তা, প্রশিক্ষণ, আধুনিক ও টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। চরের বিপুল জমিতে কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে, খাদ্য নিরাপত্তাসহ পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ফলে চরাঞ্চলের জনগোষ্ঠির স্বাস্থ্যমানের উন্নয়ন ঘটবে। তাই সরকারি পর্যায়ে আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির সেচ ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতির সমন্বয়ে প্রথম পর্যায়ে “যমুনা ও তিস্তার চরাঞ্চল সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও জীবিকায়ন” শিরোনামে প্রকল্প গ্রহণপূর্বক চরাঞ্চলে সেচসুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নতজাতের ভুট্টা উৎপাদনের মাধ্যমে বিপুল জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যেতে পারে। পরবর্তীতে সেচের পানির সমস্যা কবলিত এলাকাসমূহে পানি সাশ্রয়ী ভুট্টা চাষ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে । ফলে কৃষি ব্যবস্থার পাশাপাশি এ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।
লেখক: সদস্য পরিচালক (ক্ষুদ্রসেচ), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), প্রধান কার্যালয়, দিলকুশা, ঢাকা।

