ঢাকাTuesday , 15 June 2021
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জলাবদ্ধতা দূরীকরণে লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি

Link Copied!

মো. জিয়াউল হক
বাংলাদেশ নদ-নদী, খাল-নালা, ঝর্ণা, হাওর, বাওর-বিল ও পুকুর-জলাভূমির দেশ। এ দেশে রয়েছে ৩২০ (প্রায় ২৪,১৪০ কি. মি.) নদ-নদী, ৪২৩ (প্রায় ৭.৮৪ লাখ হেক্টর) হাওর, প্রায় ৬৩০০টি বাওর, বিল এবং অসংখ্য পুকুর জলাশয়। খাল-নালার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন দপ্তর/বিভাগ/সংস্থার সাথে যোগাযোগে জানা যায়, দেশব্যাপী এর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারেরও অধিক এবং কিলোমিটারে প্রায় ৫০ হাজারের অধিক খাল-নালা রয়েছে। খাল-নালা বিষয়ে মতামত এ রকম – একটি খাল-নালা বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন নামে প্রবাহিত করা হয়ে থাকে। এছাড়াও সারাদেশে বিছিন্নভাবে মৌসুমী জলাবদ্ধ এলাকা রয়েছে, যা নির্দিষ্ট সময় পর শুকিয়ে যায়; এতে কোনো প্রকার মৎস্য অভয়াশ্রম নেই। এ জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকের পক্ষে সঠিক সময়ে বীজ বপন বা চারা রোপন এবং অনেক সময় মাঠের উঠতি ফসলও সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। অপরদিকে সঠিক সময়ে বীজ বপন বা চারা রোপন করা সম্ভব না হলে ফসলের ফলনের পার্থক্য হয়ে থাকে। ফলে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দেশ খাদ্য ঘাটতিতে পরিণত হয়। দেশে কৃষি মৌসুম ৩টি যথা- ১) খরিপ-১, ২) খরিপ-২ ও ৩) রবি এবং প্রতিটি মৌসুম সময়াবদ্ধ। যেমন-খরিপ-১ মৌসুম মধ্য মার্চ হতে মধ্য জুলাই, খরিপ-২ মৌসুম মধ্য জুলাই হতে মধ্য নভেম্বর এবং রবি মৌসুম মধ্য নভেম্বর হতে মধ্য মার্চ পর্যন্ত। পৃথিবীতে হাজার বছর পূর্ব হতে খাল-নালা খনন/পুন:খনন/সংস্কারের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও সরকারিভাবে বিভিন্ন দপ্তর/বিভাগ/সংস্থা অথবা স্থানীয় জনগণ নিজ উদ্যোগে খাল-নালা খনন/পুন:খনন/সংস্কারের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ করে আবাদী জমিতে পরিণত এবং এক ফসলি জমিকে দুই/তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করে আসছে। খাল-নালা খনন/পুন:খনন/সংস্কারের বিকল্প পন্থায় জলাবদ্ধতা দূরীকরণ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর নিজস্ব উদ্ভাবনী লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি জলাবদ্ধতা দূরীকরণে সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
অতিবৃষ্টি বা বন্যার কারণে কোনো স্থানে পানি জমে অর্থাৎ স্থানটি জলে আবদ্ধ থাকলে তাকে জলাবদ্ধতা এলাকা বলা হয়ে থাকে। এ জলাবদ্ধতা সাধারণত দুই কারণে হয়। যেমন- ১) প্রকৃতি সৃষ্ট জলাবদ্ধতা এবং ২) মনুষ্য সৃষ্ট জলাবদ্ধতা। পৃথিবীর ভূকম্পন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদ-নদী এবং এর শাখা-প্রশাখা ও খাল-নালার গতিপথ পরিবর্তন এবং মোহনায় পলি ভরাট হওয়ার কারণে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় তাকে প্রকৃতি সৃষ্ট জলাবদ্ধতা বলে। অপরদিকে বিভিন্ন বিভাগ/অধিদপ্তর/সংস্থা/ব্যক্তি নিজ নিজ পরিকল্পিত ও অপরিকল্পত বিভিন্ন প্রকার উন্নয়নমূলক কার্যক্রম যেমন রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার ও বিভিন্ন প্রকার অবকাঠামো/স্থাপনা নির্মাণের ফলে বিভিন্ন স্থানে যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় তাকে মনুষ্য সৃষ্ট জলাবদ্ধতা বলে। সাধারণত বড় আয়তনের জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য খাল-নালা খনন/পুন:খনন/সংস্কারে প্রয়োজনীয় খাল-নালা পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে দেশে কৃষি জমি দিন দিন হ্রাস, খাল-নালা পলি ভরাট, কৃত্রিমভাবে ভরাট করে কৃষি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার এবং জমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কম আয়তনের জলাবদ্ধ এলাকার জন্য খাল-নালা খনন, পুন:খনন, সংস্কারের জমি পাওয়া যায় না এবং খাল-নালা খনন, পুন:খননে জমিরও অপচয় হয়। এছাড়াও প্রতিবছর পলি ও পাড় ভাঙ্গনের ফলে পাঁচ হতে সাত বছরের মধ্যে খাল-নালাটি ভরাট হয়ে যায়। এ সমস্যা সমাধানে বিএডিসি’র সেচ বিভাগের নিজস্ব উদ্ভাবিত লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফলতা পাওয়া গেছে। বিএডিসি’র নিজস্ব উদ্ভাবনী প্রযুক্তিটি হলো ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইন স্থাপনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ করে আবাদি জমিতে রূপান্তর করা।
বিএডিসি’র নিজস্ব উদ্ভাবনী লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তিতে জলাবদ্ধতা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত জরিপ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জরিপ করে মোট নিষ্কাশিত পানির পরিমাণ, পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি প্রবাহের গতিপথ, পানি নির্গতের স্থান ও পাইপ স্থাপনের ঢালুতা এবং স্বাভাবিক গতিতে নিষ্কাশিত পানির পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইনের মাধ্যমে জলাবদ্ধ এলাকার নিষ্কাশিত পানির পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে পাইপের দৈর্ঘ্য, ডায়ামিটার, এয়ার ভেন্টের সংখ্যা এবং পাইপ লাইন পরিষ্কার করার জন্য পিটের সংস্থান রাখা হয়। উক্ত জলাবদ্ধ পানি প্রবাহের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে পাইপের বিণির্দেশনা (Specification) তৈরি করা হয়, যাতে প্রবাহিত পানির চাপে ভূ-গর্ভস্থ পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। অপরদিকে, আগাম বন্যার পানিতে উঠতি ফসল যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে লক্ষ্যে ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইনের ইনলেট অথবা আউটলেটে স্লুইস গেইট বা কপাট এবং যাতে কোন প্রকার ময়লা-আবর্জনা প্রবেশ করতে না পারে সে লক্ষে ইনলেট ও আউটলেটে নেট ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও জলাবদ্ধ এলাকার পানি ইনলেটে প্রবেশের জন্য বড় আকারে পিট এবং আউটলেটের ভাঙনরোধে আরসিসি ব্লক স্ট্রাকচার স্থাপন করা হয়ে থাকে। ভূগর্ভস্থ পাইপটির ডায়ামিটারের ওপর ভিত্তি করে তা নির্দিষ্ট গভীরতায় স্থাপন করা হয়। ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইনে খাল-নালা খনন/পুনঃখননের ন্যায় কোন আবাদী জমির অপচয় হয় না। অপরদিকে ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইনের স্থায়িত্বকালও অনেক বেশি। তাই উদ্ভাবনীটি জলাবদ্ধতা দূরীকরণে লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি। অপরদিকে জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য স্থাপিত ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইন পরিচালনার নিমিত্ত সুবিধাভোগীদের সমন্বয়ে পানি ব্যবহারকারী গ্রুপ (Water User Group) গঠন করা হয়। উক্ত গ্রুপ অর্থাৎ সুবিধাভোগীগণ নিজ উদ্যোগে ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইন মেরামত, সংরক্ষণ ও পরিচালনা করে থাকে। পরবর্তীতে বিএডিসি শুধুমাত্র ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইনের কারিগরি সহায়তা প্রদান করে থাকে।
বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের মেয়াদে বিএডিসি’র মাধ্যমে ২০০৯-১০ অর্থবছর হতে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৮,৭১২ কিলোমিটার খালা-নালা খনন/ পুনঃখনন/সংস্কারের মাধ্যমে সারাদেশে ১,২৯,৯৯০ হেক্টর জমিতে সেচ সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রায় ৭৫,১০০ হেক্টর জমির জলাবদ্ধতা দূরীকরণ করে আবাদি জমিতে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছে। অপরদিকে, অদ্যাবধি যেসকল এলাকায় খাল-নালা নেই বা খাল-নালা খনন/পুনঃখনন/সংস্কার করা সম্ভব নয়, সেসকল এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য বিএডিসি’র উদ্ভাবিত লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৪.৪২ কি.মি. বিভিন্ন ডায়ামিটার (১ ফুট হতে ২ ফুট) এর ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইন স্থাপনের মাধ্যমে যথাক্রমে পূর্বাঞ্চলীয় সমন্বিত এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কুমিল্লা জেলার তিতাস উপজেলায় হরিপুরে ১৫০ হেক্টর, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষীপুর জেলায় ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় লক্ষীপুর জেলার সদর উপজেলার চররমণী মোহনে ২০০ হেক্টর, ময়মনসিংহ বিভাগ এবং ঢাকা বিভাগের টাংগাইল ও কিশোরগঞ্জ জেলায় ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় টাংগাইল জেলার ধনবাড়ী উপজেলার হাতিবান্ধায় ২৫০ হেক্টর এবং বৃহত্তর ঢাকা জেলা সেচ এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গাজীপুর জেলার সদর উপজেলায় নীলের পাড়ায় ৫০ হেক্টর অর্থাৎ মোট প্রায় ৬৫০ হেক্টর জমির জলাবদ্ধতা দূরীকরণ করা সম্ভব হয়েছে। খাল-নালা খনন/পুনঃখনন না করায় কোন আবাদী জমি অপচয় হয়নি। দেশের বিভিন্ন জেলায় বর্ণিত কার্যক্রম বাস্তবায়নে কৃষকগণ উপকৃত, সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে একাজে বিএডিসি প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়েছে। তাই আগামীতে ছোট আকারের জলাবদ্ধ এলাকাসমূহ বর্ণিত লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি গ্রহণ করে জমির অপচয়রোধ, স্থায়িত্ব বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতা দূরীকরণের মাধ্যমে আবাদি জমিতে রূপান্তর এবং এক ফসলি জমিকে দুই/তিন ফসলি জমিতে পরিণত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

লেখক: সদস্য পরিচালক (ক্ষুদ্রসেচ), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), প্রধান কার্যালয়, দিলকুশা, ঢাকা।