
গণতন্ত্রের বিজয় দিবসে ছাত্রলীগের মোটরসাইকেল মহড়া
নিজস্ব প্রতিবেদক : বিরোধী দলের কর্মসূচি ব্যর্থ করার উদ্দেশ্যেই সরকারি দলের পাল্টা কর্মসূচি অথবা অঘোষিত কর্মসূচি পালনের চর্চা ইদানীং শুরু হয়েছে। সঙ্গত কারণেই সরকারি কর্মসূচিগুলোই সব সময় সফলভাবে পালিত হয়। ফলে অর্থনীতিতে এর প্রভাবও বেশি পড়ে।
আনুমানিক হিসাবে জানা যায়, বিরোধী দলের এক দিনের হরতাল বা অবরোধ কর্মসূচিতে অর্থনীতিতে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। কিন্তু সরকারি দলের ঘোষিত বা অঘোষিত অবরোধের মতো কর্মসূচিতে ক্ষতির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় দ্বিগুণেরও বেশি।
বিরোধী দল হরতাল-অবরোধ ডাকলে বিশেষ করে রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকে। একই সঙ্গে সরকারি দলের নেতাকর্মীরাও মারমুখি ভূমিকা নেয়। ফলে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা মাঠে নামার সাহস করে না। এ কারণে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিকই থাকে। যদিও কোথাও কোথাও ঝটিকা মিছিল, চোরাগোপ্তা পিকেটিং, ককটেল ফুটানোর ঘটনা ঘটে।
সাধারণ ব্যবসায়ীরা জানান, বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধে ঢাকায় যান চলাচল মোটামুটি স্বাভাবিক থাকে। জনগণের স্বাভাবিক চলাচলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতা থাকে। সার্বিক নিরাপত্তার কারণেই মালিকরা সাহস করে মিল কারখানা বা অফিস আদালত খোলা রাখে বা রাখার চেষ্টা করে। তবে এর মাঝেও ঘটে যায় দুর্ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে অনেকটা ঢিলেঢালাভাবে ব্যবসায়িক কাজ হয় বলে দিনে সব খাত মিলিয়ে ক্ষতি হয়ে যায় প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা।
তবে সরকারি দল যদি (ঘোষিত-অঘোষিত) একটি অবরোধের মতো কর্মসূচি দেয় তাহলে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড চালানোর মতো সুযোগ থাকে না। দোকানপাট, গাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। এতে করে প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবসায়ীক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে। ঢাকা শহরে রিকশা ও হাতেগোনা কয়েকটি টেম্পু ছাড়া কোনো গণপরিবহনের দেখা পাওয়া যায় না। পুরোপুরি ভেঙে পড়ে আমাদানি-রপ্তানির চেইন অব শিডিউল’। ব্যবসায়ীদের ধারণা এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় ১৫০০ কোটি টাকার দ্বিগুণেরও বেশি।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা হরতাল অবরোধের বাইরে থাকতে চাই। কারণ ক্ষমতাহীন বা ক্ষমতাসীন যে দলই হোক না কেন, ক্ষতি আমাদের হবেই। কম আর বেশি।’
তবে ক্ষমতাসীন কেউ অবরোধ ডাকলে তাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের আরও বেশি ক্ষতি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এতে করে কেউ গাড়ি-ঘোড়া নিয়ে বাইরে বের হতে পারে না। কোম্পানিগুলোর মালামাল আনা নেয়ার গাড়িগুলোও নড়চাড়া করতে পারে না। দোকানপাট বন্ধ রাখতে হয় পুরোদমে। সে হিসেবে ক্ষতি তো দ্বিগুণ হবেই।’
তিনি বরাবরের মতো রাজনীতিবিদদেরকে এ ধরনের কর্মসূচি বন্ধ করে নতুন করে প্রতিবাদের পদ্ধতি বের করার অনুরোধ জানান।
এ ব্যাপারে পোশাক শ্রমিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজীম বলেন, ‘সবার (বিরোধী বা ক্ষমতাসীন) হরতাল অবরোধেই আমাদের কাজকর্ম স্থবির হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে আমাদের আমদানি রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বাধাগ্রস্ত হয়।’
৫ ডিসেম্বরের সরকারি দলের কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে আমরা দেখেছি ক্ষমতাসীনরা হরতাল দিলে তা বেশ শক্তভাবে পালন করা হয়। কারণ নেতারা সব জায়গায় তাদের প্রভাব খাটাতে পারে। ফলে গাড়ি-ঘোড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবই বন্ধ রাখতে হয়। এতে তো ক্ষতি বেশি হবেই।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই রাজনৈতিক দলগুলো শান্তিপূর্ণ আলোচানার মধ্য দিয়ে সব বিষয়ে সমঝোতায় আসুক। কারণ ব্যবসা বন্ধ মানেই তো আর্থিক ক্ষতি। যার প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়বেই। সুতরাং এ ধরনের কর্মসূচি থেকে বের হয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই।’
এদিকে নতুন বছরের শুরুতেই টানা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় বেশ বেকায়দায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা জানান, ২০১৩ সালের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছিল তা-ই এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি অনেকে। তার উপর নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় বেশ হতাশ তারা। ২০১৩ সালে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে জাতীয় অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল তা সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে ব্যবসায়ীরা। ঠিক যে মুহূর্তে সব সূচকে ইতিবাচক দিক পরিলক্ষিত হচ্ছে, সে মুহূর্তে আবারও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা শুরু হলো।
গত বছরের বিএনপির ডাকা মার্চ ফর ডেমোক্রেসি প্রতিহত করতে ‘সরকারি অবরোধ’ বাস্তবায়নে মাঠে নামে পুলিশ, সরকারি দলের নেতাকর্মী, সরকার-সমর্থক বাস ও লঞ্চের মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। এমনকি ট্রেন চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। কয়েক দিন ধরে এ অব্স্থা চলে।
সর্বশেষ ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা দিবসের কর্মসূচি প্রতিহত করতে সরকারি দল এবং তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে যেভাবে স্বল্প ও দূরপাল্লার পরিবহনসহ সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিল তাতে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যবসায়িক ক্ষতিতে বিরোধী দলকে দোষ দেয়ার সুযোগ খুব কমই ছিল।

