ঢাকাSunday , 1 May 2016
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সুন্দরবনে আগুন: অনিশ্চিত ভবিষ্যতে বনজীবীরা

Link Copied!

sundarbon
বাগেরহাট প্রতিনিধি : একমাসে সুন্দরবনে ৪ দফায় আগুন। স্থানীয় গ্রামবাসী, বনবিভাগ, ফায়ার সার্ভিস যে যেভাবে পেরেছে আগুন নেভাতে কাজ করে যাচ্ছে।

ভয়ঙ্কর সুন্দর রয়েল বেঙ্গলকে তারা ছেলেবেলার বাঘ মামা বলে আলিঙ্গন করতেও পিছপা হবে না এমন প্রত্যয় ছিল তাদের চোখেমুখে। কথায় আছে ‘মামা ভাগ্নে যেখানে, বিপদ নাই সেখানে’। কথাটি বারবার মনে পড়ছিল গহীন অরণ্যে মানুষের আপ্রাণ প্রয়াস দেখে। বাঘ মামা যেমন তার হিংস্রতা দিয়ে সুন্দরবনকে আগলে রাখে, তেমনি মামার ঘরে আগুন লাগায় ভাগ্নে হয়ে কতিপয় মানুষ জীবনের পরোয়া না করে বনকে বাঁচাতে প্রাণপন লড়াই করে। গহীন বনে মোবাইল নেটওয়ার্ক নাই, ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দে যেখানে নিজের কথা নিজে শোনাই দুষ্কর সেখানে বনের প্রতি ভলোবাসা চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না।

সুন্দরবনে যে কয়বার আগুন লেগেছে প্রতিবার স্থানীয় সাধারণ মানুষ সর্বপ্রথম ছুটে এসেছে। খবর দিয়েছে বন বিভাগকে। আগুন নেভাতে কাজ করেছে স্বেচ্ছাশ্রমে। কেনো বনের প্রতি এমন ভালোবাসা তাদের মুখে শুনতে বড় ইচ্ছা জাগে।

শনিবার (৩০ এপ্রিল) বেলা ১১টা। বাগেরহাট শহর থেকে মোটরসাইকেলে রওনা হই। মোড়েলগঞ্জের পানগুছি নদীতে ফেরি পার হয়ে শরণখোলার পল্লীমঙ্গল বাজার থেকে রাজাপুর গ্রাম। এরপর বনসংলগ্ন ভোলা নদী পার হয়ে দু’কি.মি. পায়ে হেঁটে সুন্দরবনের ধানসাগর স্টেশনে ফরেস্ট অফিসে পৌঁছাই। তখন রোদের তীব্রতা অত্যন্ত প্রখর। ভাটার কারণে খালে পানি খুবই কম। তাই বাধ্য হয়ে জোয়ারের অপেক্ষা। উদ্দেশ্য বনবিভাগের প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মো. ইউনুছ আলী আসবেন সুন্দরবনে আগুনের পর সর্বশেষ অবস্থা সরেজমিনে দেখতে সেই খবরটি সংগ্রহ করা।

ঘড়িতে তখন সময় বিকেল ৩টা। শুনলাম পাশেই একটি গ্রাম্য হাট (সাপ্তাহিক বাজার) বসবে। লোক সমাগম বেশি তাই তথ্য সংগ্রহ কিছুটা সহজ হবে ভেবে পায়ে হেঁটে রওনা দিলাম হাটে।  দেখা হলো মাঝ বয়সী এক লোকের সাথে, তার হাতে একটি বড় সাইজের দেশি ‘মোরগ’।

কথা বলতেই তিনি জানান, তার নাম জয়নাল ফরাজী (৩৭)। পেশায় একজন জেলে। সুন্দরবনের গহীনে মাছ ধরে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। সাংবাদিক পরিচয়ে দুঃখভরা কণ্ঠে জানালেন তার কষ্টের কথা। সুন্দরবনে সর্বশেষ লাগা আগুনের সময় (২৭ মার্চ) তিনি বনের ভেতরই মাছ ধরায় ব্যস্ত ছিলেন সঙ্গী সাথীদের নিয়ে। দূর থেকে ধোঁয়া দেখতে পেয়ে আগুন বুঝতে পেরে দলবলে ছুটে আসে আগুন নেভাতে। রুটিরুজির কথা চিন্তা না করে টানা ২ দিন আগুন নেভাতে বন বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের সাথে কাজ করেছেন। এরপর বন বিভাগ সব ধরনের পাশ পারমিট বন্ধ করে দেয়ায় এবং বন থেকে সব লোককে বের হতে বলায় এখন আর মাছ ধরতে যেতে পারছেন না।

তিনি বলেন,  ‘বনের (সুন্দরবনের) আগুনে মোর কপাল পুড়িছে। দুই দিন ধইরে মাছ ধরতি পারি না। ইনকাম নেই। তাই বাড়িত্তে মোরগডা ধইরে নিয়ে আসলাম। বেইচে বাজার করবো। মাছ ধরতি না পারলি সংসার অচল হইয়ে যাবে।’

পল্লীমঙ্গল বাজারে পৌঁছালে এক চায়ের দোকানে কথা হয় কয়েকজন বনজীবীর সঙ্গে। প্রায় সাড়ে তিনটা বাজে তখন। কথার এক পর্যায়ে তারা জানান, পাশ পারমিট বন্ধ থাকায় কাজ নেই। তাই এই সময়ে তারা বাজারে। অনেকেই জানালেন এভাবে আর সপ্তাহখানেক চললে মানুষের বাড়িতে কাজ করা বা শহরে যেতে হবে কাজের সন্ধানে।

সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল এসব মানুষ বলছেন, ‘যারা সুন্দরবনে আগুন দিয়েছে তারা সংখ্যায় গুটি কয়েক। তাদের জন্য আমাদের আয়ের পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বনবিভাগ পাশ পারমিট বন্ধ করে দিয়েছে। বনবিভাগ যদি আমাদের বনে ঢুকতে না দেয় তাহলে আমাদের পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। তাদের প্রতিরোধ করতে আমরা বনবিভাগকে সহযোগিতা করবো।’ তারা সুন্দরবনে প্রবেশের পাশ পারমিট পুনরায় চালু করার দাবি জানান।

বনবিভাগের প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মো. ইউনুছ আলী প্রায় পৌঁছে গেছেন এমন খবর পেয়ে আবার ফিরলাম ধানসাগর স্টেশনে। সেখানে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কয়েজন সাংবাদিকের সাথে একটি ট্রলারে বন বিভাগের একজন বনরক্ষী ও স্থানীয় কয়েকজনকে সাথে নিয়ে আগুন লাগার স্থানে রওনা হই।

ট্রলারে মিরাজ নামে স্থানীয় এক জেলে বেশ রাগের সুরে বলেন, ‘ভাই, বনে যারা আগুন দিছে ধরতি পারলি আগে ইচ্ছা মতো ছেছা (পিটান/মার) দিমু। পরে পুলিশে দিমু। ওগে ঠেলাম আমার মতো কয়েকশ পরিবার এখন কাজের অভাবে সিটকি মাইরে আছে।’

জানা গেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, মংলা ও রামপাল উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ যুগ যুগ ধরে বনের মাছ, জ্বালানি কাঠ, গোলপাতা সংগ্রহ ও মধু আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবনে হঠাৎ করে আগুন দেয়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে পাশ পারমিট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও তা প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। এছাড়া আমরা বনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা করছি। এটা বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনের ওপর চাপ কমবে এবং সুন্দরবনও সুরক্ষিত থাকবে।’

বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বনবিভাগের প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মো. ইউনুছ আলী বনে পৌঁছে সাংবাদিকদের জানান, নাশকতার জন্য দুর্বৃত্তরা সুন্দরবনে পরিকল্পিতভাবে আগুন দিয়েছে। সর্বশেষ ২৭ এপ্রিলের এ আগুন জেলে, বাওয়ালী বা মৌয়ালদের দেয়া নয়। এবারের আগুনের ধরণ ভিন্ন। দুর্বৃত্তরা তুলাতলার কয়েকটি স্থানে আগুন দিয়েছে। যারা এ নাশকতা চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর গত শুক্রবার (২৯ এপ্রিল) র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান(র‌্যাব)- ৬ খুলনার কমান্ডিং অফিসার (সিও) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, ব্যক্তি স্বার্থে কতিপয় দুর্বৃত্ত ওই আগুন ধরিয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে। এ নিয়ে মামলা করায় ক্ষুদ্ধ তারা ‘প্রতিশোধ’ নিতে আবারও আগুন দেয়। সম্প্রতি ধানসাগর স্টেশনে বন রক্ষায় ওয়াচ টাওয়ার স্থাপনের কারণে সর্বশেষ (২৭ এপ্রিল) ওই দুর্বৃত্তরা উল্টো পথে নৌকায় করে বনের ভিতর দিয়ে এসে আধা কিলোমিটার পর পর কয়েকটি স্থানে আগুন দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ অপরাধীদের দমনে প্রয়োজনীয় সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

পূর্ব সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলদের জন্য যে নিষেধাজ্ঞা দেয়া (পাশ পারমিট বন্ধ) হয়েছে তা সাময়িক। বনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তা আবার প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। আগুনে সুন্দরবনের তেমন কোনো মূল্যবান গাছ পোড়েনি। যা পুড়েছে তার মধ্যে বলা, লতাগুল্ম জাতীয় গাছ এবং ২০০৭ সালের সিডরে উপড়ে পড়া শুকনা গাছও রয়েছে।

সুন্দরবন বিশ্ববাসীর কাছে বিশ্ব ঐতিহ্য, দেশের জন্য অমূল্য সম্পদ আর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ সুন্দরবনকে ‘মা’ এর সাথে তুলনা করেন। এই বন একদিকে লাখ লাখ মানুষের জীবিকার আশ্রয়স্থল অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় রক্ষাকবজ। তাই এই বন রক্ষায় সরকারের কঠোর পদক্ষেপ ও সকলের সম্মিলিত সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নাই।