ঢাকাTuesday , 12 April 2016
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বন্ধুত্বের অনুষ্ঠান হালখাতা

Link Copied!

halkhataলাইফস্টাইল : দিগন্তের শেষ গোধূলিতে ডুবতে শুরু করেছে বাংলা ১৪২২ সাল। সকল ক্লান্তি, দুঃখ, সংশয় আর বিরহ নিয়ে হারিয়ে যাবে চলতি বছর। আপন কুঠুরিতে যত্নের সঙ্গে তোলা থাকবে প্রিয় কিছু স্মৃতিকথা, অস্বস্তি নিয়ে থাকে হয়তো অপ্রিয় কথাও। নতুন বছরে সবকিছু আবার শুরু হবে নতুন প্রত্যয়ে। ভুল ভ্রান্তি কাটিয়ে নতুনভাবে পথচলার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হবে সবাই। এই ধারাবাহিকতার স্পষ্টতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ব্যবসায়ীদের কারবারে। হালখাতা আমন্ত্রণের সঙ্গে চুকিয়ে নিতে চান পুরাতন সব হিসাব-নিকাশ। আদরের সঙ্গে ঘরে তুলে নেন নতুন বাংলা বছরকে। এরই মধ্যে গোটা বাঙালি জাতি নিয়েছে নতুন আশা ও স্বপ্নের সঙ্গে ১৪২৩ সনের যাত্রাকে সুগম করার সব প্রস্তুতি।
হালখাতা শব্দটি আমোদের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে গেছে ওতোপ্রত ভাবে। বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করে থাকেন। বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা তাদের দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এজন্য খদ্দেরদের বিনীতভাবে পাওনা শোধ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। এ উপলক্ষে নববর্ষের দিন ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ করিয়ে থাকেন। খদ্দেররাও তাদের সামর্থ অনুযায়ী পুরোনো দেনা শোধ করে দেন। আগেকার দিনে ব্যবসায়ীরা একটি মাত্র মোটা খাতায় তাদের যাবতীয় হিসাব লিখে রাখতেন। এই খাতাটি বৈশাখের প্রথম দিনে নতুন করে হালনাগাদ করা হতো। হিসাবের খাতা হাল নাগাদ করা থেকে “হালখাতা”-র উদ্ভব। শুধু বাংলাদেশ নয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছোট বড় মাঝারি যেকোনো দোকানে এটি পালন করা হয়ে থাকে।
ইতিহাস বলছে, ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে মুগল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ঐ সময়ে বঙ্গে শক বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হতো, যার প্রথম মাস ছিল চৈত্র। বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রথমে ‘তারিখ-ই-এলাহী’ বা ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল। পরে বাংলা সন পরিবর্তন করে বছরের প্রথম দিন হিসেবে পহেলা বৈশাখ করা হয়। আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান আনুষ্ঠানিকতা ছিল হালখাতা করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব-বই বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব-বই বন্ধ করে নতুন হিসাব-বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকনদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।
পুরনো হিসাব মিটিয়ে ফেলার ধুম পড়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। সারা দেশের মত রাজধানীর পুরান ঢাকার শাঁখারিবাজারের শাঁখা সিঁদুর স্বর্ণের দোকান, ইসলাম পুরের কাপড়ের দোকান, শ্যামবাজারের আড়ত, সদরঘাটের ফলের আড়ত শুরু করেছে প্রস্তুতি। কর্মচারীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে দোকান সাঁজাতে।
যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই রীতিতে রীতিমত আঘাত হেনেছে প্রযুক্তি। হালখাতার আগের যৌবনে ভাটা পড়েছে অনেকটায়। এখন আর আগের মত ব্যবসায়ীর মুখের কথায় বিশ্বাস করে টাকা বাকি দেন না। লেনদেন চলছে ব্যংকের মাধ্যমে। প্রযুক্তি হাতে লেখা খাতা থেকে অনেকে নিষ্কৃতি দিয়েছে। বড় বড় দোকানে যুক্ত হয়েছে কম্পিটার ও হিসাব নিকাশের আধুনিক সফটওয়্যার। আর এরই মধ্য বিদায় নিতে শুরু করেছে ক্রেতা আর বিক্রেতার বন্ধন সুত্র লাল কাপড়ে মোড়া হালখাতা।
রাজধানীর পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী মখলেচুর রহমান বলেন, ‘হালখাতা শুধু হাল(নতুন) খাতা নয়। হালখাতা ব্যবসায়ী আর খদ্দেরের মিলন মেলা, বন্ধুত্বের অনুষ্ঠান।’
মোঘল আমল থেকে বৈশাখের প্রথমদিন হিসাবের খাতা নতুন করা বা হাল নাগাদ করা থেকে “হালখাতার”-র উদ্ভব। শুধু বাংলাদেশ নয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছোট বড় মাঝারি যে কোন দোকানেই এটি পালন করা হয়ে থাকে ।
মূলত পঁচিশে বৈশাখের সকালে সনাতন ধর্মাবলম্বী দোকানী ও ব্যবসায়ীরা সিদ্ধিদাতা গনেশ ও বিত্তের দেবী লক্ষ্মীর পূজা করে থাকেন এই কামনায় যে তাদেরর সারা বছর যেন ব্যবসা ভালো যায়। দেবতার পূজার্চনার পর তার পায়ে ছোঁয়ানো সিঁদুর ও চন্দন চর্চিত খাতায় নতুন বছরের হিসাব নিকাশ শুরু করে। তবে হালখাতার এই রীতি সব ধর্মাবলম্বী ব্যাবসায়ীদের মাঝে বিদ্যমান। এখনো আমাদের গ্রামে বা ছোট গঞ্জে হালখাতার রীতিটা বেশ রমরমা। কোথাও কোথাও মাইক বাজিয়ে মেজবান করে হালখাতা করা হয়। দোকান ঘর সাজানো হয় রঙিন কাগজ, জরি, ফুল ইত্যাদি দিয়ে। ক্রেতার সঙ্গে বিক্রেতার এ যেন বন্ধুত্বকে হালনাগাদের অপর নাম মাত্র।