লাইফস্টাইল ডেস্ক : শুভ বড়দিন। ধরে নেয়া হয় ২৫ ডিসেম্বর তারিখে যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন। এ উপলক্ষ্যে এটি বাৎসরিক খ্রিস্টীয় উৎসব। খ্রিস্টান অনুসারিদের কাছে দিনটি বড়দিন বা প্রধান ধর্মীয় উৎসবের নাম। আদি যুগীয় খ্রিস্টানদের বিশ্বাস অনুসারে, এই তারিখের ঠিক নয় মাস আগে মা মেরির গর্ভে অলৌকিকভাবে প্রবেশ করেন যিশু। সম্ভবত, এই হিসাব অনুসারেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখ যিশুর জন্মতারিখ ধরা হয়। অপর এক মতে একটি ঐতিহাসিক রোমান উৎসব অথবা উত্তর গোলার্ধের দক্ষিণ অয়নান্ত দিবসের অনুষঙ্গেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখে যিশুর জন্মজয়ন্তী পালনের প্রথা চালু হয়।
প্রকৃতিগতভাবে একটি খ্রিস্টীয় ধর্মানুষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও, একাধিক অ-খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও মহাসমারোহে বড়দিন উৎসব পালন করে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎসবের আয়োজনে প্রাক-খ্রিস্টীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ বিষয় ভাবনার সমাবেশও দেখা যায়। উপহার দেয়া, সংগীত, খ্রিস্টমাস কার্ড বিনিময়, গির্জায় ধর্মোপাসনা, ভোজ এবং খ্রিস্টমাস বৃক্ষ, আলোকসজ্জা, মালা, মিসলটো, যিশুর জন্মদৃশ্য, হলি সমন্বিত এক বিশেষ ধরনের সাজসজ্জার প্রদর্শনী আধুনিককালে বড়দিন উৎসব উদযাপনের অঙ্গ। কোনো কোনো দেশে ফাদার খ্রিস্টমাস (উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও আয়ারল্যান্ডে সান্টাক্লজ) কর্তৃক ছোটোদের জন্য বড়দিনে উপহার আনার প্রথাটি বেশ জনপ্রিয়।
আমাদের দেশেও এসব রীতি বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার ভেতর দিয়ে পালন করা হয়। বাংলাদেশে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী কম থাকলেও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে সব উৎসব প্রেমির হৃদয়ে।
এবার জেনে নেয়া যাক যিশুর জন্ম সংক্রান্ত প্রাপ্ত তথ্য কী বলে?
আদি বাইবেলের ত্রাণকর্তা-সংক্রান্ত একাধিক ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হয়েছে, কুমারী মেরির গর্ভে তাদের মসিহা বা ত্রাণকর্তার জন্ম হবে। আর সে নিয়মের বাস্তব রূপ যিশুর জন্ম। সংস্কারকৃত বাইবেলে বলা হয়েছে, যিশুর জন্মকাহিনী খ্রিস্টমাস উৎসবের মূলভিত্তি। এই উপাখ্যান অনুসারে, হবুস্বামী জোসেফের সাহচর্যে বেথলেহেম শহরে উপস্থিত হয়ে মেরি যিশুর জন্ম দেন। জনপ্রিয় ধারণা অনুযায়ী, একটি আস্তাবলে গবাদি পশু পরিবৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন যিশু। যদিও বাইবেলের উপাখ্যানে আস্তাবল বা গবাদি পশুর কোনো উল্লেখ নেই। সেখানে একটি যাবপাত্রের উল্লেখ আছে। ‘আর তিনি আপনার প্রথমজাত পুত্র প্রসব করিলেন এবং তাকে কাপড়ে জড়াইয়া যাবপাত্রে শোয়াইয়া রাখিলেন, কারণ পান্থশালায় তাহাদের জন্য স্থান ছিল না’।
যিশুর জন্ম-সংক্রান্ত প্রথম দিকের চিত্রগুলিতে গবাদি পশু ও যাবপাত্র পরিবৃত একটি গুহায় যিশুর জন্মদৃশ্য দর্শানো হয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এটি বেথলেহেমের চার্চ অফ দ্য নেটিভিটির অভ্যন্তরে। এক স্বর্গদূত বেথলেহেমের চারপাশের মাঠের মেষপালকদের যিশুর জন্ম সম্বন্ধে অবহিত করেন। এই কারণে তারাই সেই দিব্য শিশুকে প্রথম দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেন। আর সে কারণেই সম্ভবত মা মেরিকে এতো গুরুত্ব দেয়া হয়।
অনেক খ্রিস্টানই মনে করেন, যিশুর জন্ম আদি বাইবেলের ত্রাণকর্তা-সংক্রান্ত ভবিষ্যদবাণীগুলোকে পূর্ণতা দেয়। তারা যিশুকে ঈশ্বর পুত্র হিসেবেও জ্ঞান করতেন। মথিলিখিত সুসমাচার অনুসারে, কয়েকজন ম্যাজাই (জ্যোতিষী) স্বর্ণ, সুগন্ধিতেল ও ধূপ নিয়ে শিশুটিকে দর্শন করতে যান। কথিত আছে, একটি রহস্যময় তারকা তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। সাধারণভাবে বেথলেহেমের তারকা নামে পরিচিত এই তারাটি ছিল প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে ইহুদিদের রাজার জন্মবার্তার ঘোষক। ম্যাজাইদের আগমনের স্মরণে পালিত হয় ৬ জানুয়ারির এপিফেনি উৎসব। কোনো কোনো চার্চে এই ৬ জানুয়ারিতেই আনুষ্ঠানিকভাবে বড়দিন উৎসব সমাপ্ত হয়।
এদিকে যিশু খ্রিস্ট নাকি আদৌ আস্তাবলে জন্মগ্রহণ করেননি। জায়গার অভাবে মোটেও শিশু খ্রিস্টকে ঘোড়ার জাবনা খাওয়ার গামলায় শুতে দেয়া হয়নি। আসলে পরিবারের অতিথিদের জন্য নির্দিষ্ট চিলেকোঠায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন যিশু এবং ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচাতে তৎকালীন রেওয়াজ মেনেই খড়ের ওপর সদ্যোজাতকে শোওয়ানো হয়েছিল। চিরাচরিত বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গতবছর এমনই চমকপ্রদ তথ্য পেশ করেছেন যাজক আয়ান পল।
তবে যখন যে মতই আসুক না কেন, বিশ্বের বেশির ভাগ খ্রিস্টানের পালিত উৎসব এই বিশ্বাসকে জানান দেয়, ‘আজকের দিনে ধরায় এলো যিশু’।
খ্রিষ্টানরা নানাভাবে বড়দিন উদযাপন করে থাকে। এগুলির মধ্যে বর্তমানে গির্জার উপাসনায় যোগ দেয়া সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম জনপ্রিয় প্রথা বলে বিবেচিত হয়। বড়দিনের আগে যিশুর জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ নেটিভিটি উপবাস পালন করে থাকে। অপরদিকে পাশ্চাত্য খ্রিস্টধর্মে অধিকাংশ চার্চে অ্যাডভেন্ট পালন করা হয়। বড়দিনের সর্বশেষ প্রস্তুতিটি নেয়া হয় খ্রিস্টমাস পূর্বসন্ধ্যায়।
বড়দিন উৎসব পর্বের অন্যতম অঙ্গ হল গৃহসজ্জা ও উপহার আদান প্রদান। কোনো খ্রিস্টীয় শাখা সম্প্রদায়ে ছোটো ছেলেমেয়েদের দিয়ে খ্রিস্টের জন্মসংক্রান্ত নাটক অভিনয় এবং ক্যারোল গাওয়ার প্রথা আছে। আবার খ্রিস্টানদের কেউ কেউ তাদের গৃহে পুতুল সাজিয়ে খ্রিস্টের জন্মদৃশ্যের ছোটো প্রদর্শনী করে থাকেন। এই দৃশ্যকে নেটিভিটি দৃশ্য বা ক্রিব বলে। এই ধরনের প্রদর্শনী উৎসবের মুখ্য আকর্ষণ হয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও লাইভ নেটিভিটি দৃশ্য ও ট্যাবলো ভাইভ্যান্টও অনুষ্ঠিত হয়। এই জাতীয় অনুষ্ঠানে অভিনেতা ও জন্তুজানোয়ারের সাহায্যে যিশুর জন্মদৃশ্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।
চিত্রশিল্পে যিশুর জন্মদৃশ্য ফুটিয়ে তোলার ঐতিহ্যটি সুদীর্ঘ। এই সকল দৃশ্যে মেরি, জোসেফ, শিশু যিশু, স্বর্গদূত, মেষপালক এবং যিশুর জন্মের পর বেথলেহেমের তারকার সাহায্যে পথ চিনে তাকে দর্শন করতে আসা বালথাজার, মেলকোয়ার ও ক্যাসপার নামক তিন জ্ঞানী ব্যক্তির চিত্র অঙ্কন করা হয়।
যে সব দেশে খ্রিস্টান সংস্কার প্রবল, সেখানে দেশজ আঞ্চলিক ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে মিলনের ফলে বড়দিন উদযাপনে নানা বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। অনেক খ্রিস্টানের কাছে ধর্মীয় উপাসনায় অংশ নেয়া এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। উল্লেখ্য, বড়দিন ও ইস্টারের মৌসুমেই গির্জায় জনসমাগম হয় সর্বাধিক।
অনেক ক্যাথলিক দেশে খ্রিস্টমাসের অগেরদিন ধর্মীয় শোভাযাত্রা বা কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। অন্যান্য দেশে সান্টাক্লজ ও অন্যান্য মৌসুমী চরিত্রদের নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই মৌসুমের অন্যতম বহুলপ্রচলিত বৈশিষ্ট্য হল পারিবারিক সম্মেলন ও উপহার আদানপ্রদান। অধিকাংশ দেশেই বড়দিন উপলক্ষ্যে উপহার আদানপ্রদান হয়। আবার কোনো কোনো দেশে এই প্রথাটির জন্য বেছে নেওয়া হয় ৬ ডিসেম্বরের সেন্ট নিকোলাস ডে বা ৬ জানুয়ারির এপিফেনির দিনগুলি।
ইংল্যান্ডের খ্রিস্টমাস পুডিং
অনেক পরিবারেই বড়দিন উপলক্ষ্যে বিশেষ পারিবারিক ভোজসভা আয়োজিত হয়। ভোজসভার খাদ্যতালিকা অবশ্য এক এক দেশে এক এক রকমের হয়। সিসিলি প্রভৃতি কয়েকটি অঞ্চলে খ্রিস্টমাসের পূর্বসন্ধ্যায় যে ভোজসভা আয়োজিত হয় তাতে পরিবেশিত হয় বারো রকমের মাছ। ইংল্যান্ড ও ইংরেজি সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবান্বিত দেশগুলিতে সাধারণ বড়দিন ভোজসভার পদে দেখা যায় টার্কি (উত্তর আমেরিকা থেকে আনীত), আলু, শাকসবজি, সসেজ ও গ্রেভি ছাড়াও থাকে খ্রিস্টমাস পুডিং, মিন্স পাই ও ফ্রুট কেক। পোল্যান্ড, পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের ভোজে মাছের উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। তবে এই সব অঞ্চলে ভেড়ার মাংসের মতো অত্যধিক-চর্বিওয়ালা মাংসের ব্যবহারও বাড়ছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ায় হাঁস ও শূকরের মাংস বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া প্রায় সারা বিশ্বেই গোমাংস, হ্যাম ও মুরগির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ফিলিপিনসের ভোজসভার প্রধান খাদ্য হল হ্যাম।
বিশেষ ধরনের টার্ট ও কেকের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ ডেসার্টও তৈরি হয়। খ্রিস্টমাস উপলক্ষ্যে মিষ্টি আর চকোলেট সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। খ্রিস্টমাসের বিশেষ মিষ্টিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য জার্মান স্টোলেন, মারজিপান কেক বা ক্যান্ডি এবং জামাইকান রাম ফ্রুট কেক। উত্তর দেশগুলিতে শীতকালে যে অল্প কয়েকটি ফল পাওয়া যায় তার মধ্যে কমলালেবু খ্রিস্টমাসের বিশেষ খাদ্য হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত।
বড়দিনের সাজ
বড়দিন উপলক্ষ্যে বিশেষ ধরনের সাজসজ্জার ইতিহাসটি অতি প্রাচীন। প্রাক-খ্রিস্টীয় যুগে, রোমান সাম্রাজ্যের অধিবাসী শীতকালে চিরহরিৎ বৃক্ষের শাখাপ্রশাখা বাড়ির ভিতরে এনে সাজাত। খ্রিস্টানরা এই জাতীয় প্রথাগুলিকে তাদের সৃজ্যমান রীতিনীতির মধ্যে স্থান দেয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর লন্ডনের একটি লিখিত বর্ণনা থেকে জানা যায়, এই সময়কার প্রথানুসারে খ্রিস্টমাস উপলক্ষ্যে প্রতিটি বাড়ি ও সব গ্রামীণ গির্জা ‘হোম, আইভি ও বে এবং বছরের সেই মৌসুমের যা কিছু সবুজ, তাই দিয়েই সুসজ্জিত করে তোলা হত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, হৃদয়াকার আইভিলতার পাতা মর্ত্যে যিশুর আগমনের প্রতীক, হলি প্যাগান (অখ্রিষ্টান পৌত্তলিক) ও ডাইনিদের হাত থেকে রক্ষা করে। এর কাঁটার ক্রুশবিদ্ধকরণের সময় পরিহিত যিশুর কণ্টকমুকুট এবং লাল বেরিগুলি ক্রুশে যিশুর রক্তপাতের প্রতীক।
খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে রোমে নেটিভিটি দৃশ্য প্রচলিত ছিল। ১২২৩ সালে সেন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসি এগুলিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এরপর শীঘ্রই তা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। সমগ্র খ্রিস্টান বিশ্বে স্থানীয় প্রথা ও প্রাপ্ত দ্রব্যাদির অনুষঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সাজসজ্জার প্রথা চালু রয়েছে।
ইউরোপিয়ান খ্রিস্টমাস সজ্জা
অস্ট্রেলিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপে বাড়ির বাইরে আলোকসজ্জা এবং কখনও কখনও আলোকিত স্লেজ, স্নোম্যান, ও অন্যান্য খ্রিস্টমাস চরিত্রের পুতুল সাজানোর প্রথা রয়েছে। পুরসভাগুলিও এই সাজসজ্জার পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। রাস্তার বাতিস্তম্ভে খ্রিস্টমাস ব্যানার লাগানো হয় এবং টাউন স্কোয়ারে স্থাপন করা হয় খ্রিস্টমাস বৃক্ষ।
পাশ্চাত্য বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মীয় খ্রিস্টমাস মোটিফ সহ উজ্জ্বল-রঙা রোলকরা কাগজ উৎপাদিত হয় উপহারের মোড়ক হিসেবে ব্যবহারের জন্য। এই মৌসুমে অনেক গৃহে খ্রিস্টমাস গ্রামের দৃশ্যরচনার প্রথাও লক্ষিত হয়। অন্যান্য প্রথাগত সাজসজ্জার অঙ্গ হল ঘণ্টা, মোমবাতি, ক্যান্ডি ক্যান, মোজা, রিদ ও স্বর্গদূতগণ।
অনেক দেশে নেটিভিটি দৃশ্যের উপস্থাপনা বেশ জনপ্রিয়। এই সব দেশে জনসাধারণকে সম্পূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত নেটিভিটি দৃশ্য সৃজনে উৎসাহিত করা হয়।

