লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : জেলার রামগতি উপজেলাবাসীর কাছে পরিচিত রাজনীতিকের নাম এই আজাদ উদ্দীন চৌধুরী। দীর্ঘ তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনে অনেক আলোচিত-সমালোচিত এ নেতাকে সবাই ‘আজাদ নেতা’ নামেই চিনেন। এক সময় ভূমিহীনদের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে এ উপাধি পান। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এমনকি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছেন। আর এজন্য সুবিধা নিতে কখনও যোগ দিয়েছেন বিএনপিতে, কখনও আ.লীগে। সবশেষ এবারের পৌরসভা নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে।
শুরুটা ১৯৮২ সালের দিকে। রামগতি উপজেলার মেঘনা নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা নতুন চর ‘চরগজারিয়া’ দখলকে ঘিরে। চরের জমি বন্দোবস্ত পেতে ভূমিহীনদের বিবাদমান দু’টি পক্ষের একটির নেতৃত্ব দিতেন তিনি। ওই পক্ষকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ভূমিহীন সমিতি’। অদম্য সাহসিকতা আর নেতৃত্বশীল ভূমিকার জন্য সমিতির সদস্যরা সভাপতি করেন তাকে। উপাধি পান ‘ভূমিহীন আজাদ নেতা’ নামে। এ সময় ওই দু’পক্ষের মধ্যে সংঘটিত বিভিন্ন সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় একাধিকার কারাভোগ করে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেন স্থানীয়দের কাছে। এটাকেই পুঁজি করে ১৯৮৮ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে উপজেলা সদর আলেকজান্ডার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়া তার। নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলেও অল্প ব্যবধানে হেরে যান তিনি। ইউনিয়ন জুড়ে শক্ত একটা অবস্থান তৈরি হয় তার।
এরই মধ্যে ১৯৯১ সালে তার চাচাশ্বশুর আবদুর রব চৌধুরী বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার হাত ধরেই বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন আজাদ উদ্দীন। কোনো পদ-পদবি গ্রহণ না করলেও উপজেলা বিএনপির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তার হাতে। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তার হাতেই পরিচালিত হয়েছিল বিএনপির রাজনীতি। ওই প্রভাবে ‘৯২ সালে প্রথম মেয়াদে এবং ‘৯৭ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে আলেকজান্ডার ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বিপুল ভোটে।
কিন্তু চিত্র পাল্টে যায় ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময়। দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে আবদুর রব চৌধুরী বিএনপি ছেড়ে যোগ দেন আ.লীগে। চাচাশ্বশুরের সঙ্গে আজাদ উদ্দীনও যোগ দেন আ.লীগে। বিএনপি অধ্যুষিত এ এলাকায় আ.লীগের অবস্থান তখন খুবই নাজুক থাকলেও রব চৌধুরী ও আজাদ উদ্দীনের জনপ্রিয়তায় পুরো সংসদীয় এলাকায় নৌকা প্রতীকের শক্ত ভিত তৈরি হয়। অল্প ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থীর কাছে হেরে যান রব চৌধুরী। যে কারণে কেন্দ্রীয় আ.লীগের কাছে রব চৌধুরী ও আজাদ উদ্দীনের একটা অবস্থান তৈরি হয়। এরই মধ্যে আলেকজান্ডার ইউনিয়নের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয় রামগতি পৌরসভা।
২০০২ সালের ওই পৌরসভার প্রথম নির্বাচনে আ.লীগের সমর্থন নিয়ে আজাদ উদ্দীন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবি আব্দুল্লাকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। ফলে আ.লীগেও তার ভিত মজবুত হতে থাকে। যে কারণে ২০০৮ সালে সরকার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের উদ্যোগ নিলে সেদিকে দৃষ্টি পদে আজাদ উদ্দীনের। পৌর মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ করে প্রার্থী হন উপজেলা চেয়ারম্যান পদে। মনোনয়নপত্র নেন স্ত্রী রোকেয়া আজাদের নামেও। মামলা সংক্রান্ত তথ্য গোপনের দায়ে নির্বাচন কমিশন বাতিল করেন তার মনোনয়নপত্র। আ.লীগের একাংশের সমর্থন ও স্বামীর জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শরাফ উদ্দিন আজাদ সোহেলকে পরাজিত করে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন রোকেয়া আজাদ। কিন্তু দু’বছর পর ২০১১ সালে পৌর নির্বাচনে মনোনয়ন দৌড়ে জেলা আ.লীগের এক নেতাকে পেছনে ফেলে আ.লীগের সমর্থন নিয়ে আবারও মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আজাদ উদ্দীন। তবে দলীয় কোন্দলের কারণে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন তিনি।
আজাদ উদ্দীনের রাজনীতির চিত্র আবারও পাল্টায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়। এ নির্বাচনে রব চৌধুরীকে হটিয়ে আ.লীগের টিকিট পান শিল্পপতি আব্দুল্লাহ আল-মামুন। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে সংসদ সদস্য পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন আজাদ উদ্দীন। নির্বাচনে পরাজিত হন আ.লীগ প্রার্থীর কাছে।
এতেই থেমে যাননি তিনি। তিন মাস পরে (২০১৪ সালের মার্চে) অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আবারও চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন আজাদ উদ্দীন। ওই নির্বাচনে উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল ওয়াহেদ অংশ নেয়ায় শত চেষ্টা করেও আ.লীগের সমর্থন নিতে পারেননি তিনি। ভোট করেন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে। এখানেও পরাজয় ঘটে তার। এটাকে কেন্দ্র করে আ.লীগে তৈরি হয় গ্রুপিং। একটি গ্রুপের নেতৃত্ব ছিল তার হাতেই। ওই গ্রুপকে কাজে লাগিয়ে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পেতে জোর লবিংও চালান। কিন্তু স্থানীয় সংসদ সদস্যের চরম বিরোধীতায় শেষ পর্যন্ত দলীয় টিকিট আর জোটেনি তার কপালে।
২ ডিসেম্বর সকালে আ.লীগের কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডের এমন সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত হয়ে ওই দিন দুপুরেই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরাশাদের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে জাপায় যোগ দেন তিনি। লক্ষ্মীপুর জেলা জাতীয় পার্টির সম্মানিত সদস্য করে জাপা চেয়ারম্যান পৌর মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রত্যয়ন দেন আজাদ উদ্দনীকে। পরদিন এলাকায় এসে লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী হয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন তিনি।
আজাদ উদ্দীনের এ দলবদলের রাজনীতির কথা পুরো উপজেলাবাসীর কাছেই জানা। যে কারণে সবাই তাকে চেনেন ‘ডিগবাজ রাজনীতিক’ হিসেবে।
নির্বাচনে তার বারবার অংশগ্রহণ এবং দলবদল প্রসঙ্গে পৌর এলাকার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ভোটে অংশগ্রহণ এবং দলবদলই যেন তার (আজাদ উদ্দিনের) নেশা।’
তিনি বলেন, ‘স্বার্থের জন্য জাতীয় পার্টিতে যোগ দিলেও ৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ শেষ হলে পরদিন তিনি ওই দলে থাকবেন এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না।’
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন জানান, আজাদ উদ্দীন বিএনপির সমর্থন নিয়ে দু’বার ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও ২০০১ সালে চাচাশ্বশুরের সঙ্গে তিনি আ.লীগে যোগ দেন। সে দলে থাকা অবস্থায় ২০০৪ সালের দিকে বিএনপির এক সভায় যোগ দিয়ে আবারও তিনি বিএনপিতে ফেরার ঘোষণা দেন। সুবিধার কথা ভেবে তখন আ.লীগ না ছাড়লেও মনোনয়ন না পেয়ে এবার জাপায় যোগ দিয়েছেন। ’স্বার্থের জন্য এভাবে দল বদল করাই যেন তার নেশা’ বলে জানা তিনি।
উপজেলা আ.লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাওলা চৌধুরী বলেন, ‘দল বদল ও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়াই যেন আজাদ উদ্দীনের নেশা।’
বারবার দল বদল এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে আজাদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘সাধারণ মানুষের ভালোবাসার কারণে আমি বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছি। তাছাড়া দল বদল আমি নিজের ইচ্ছায় করছি না। দলগুলো আমাকে বাধ্য করাচ্ছে।’

