
নিজস্ব প্রতিবেদক : পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)’র মহাপরিচালক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেছেন, পাট শুধু সোনালী আঁশ নয়; পাট আগামীর ডায়মন্ড তন্তুরূপে বিশ্বে সমাদৃত হবে। সম্প্রতি গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে আলোচনাকালে এ কথা বলেন তিনি।
প্রবীণ এ মুক্তিযোদ্ধা এ সময়ে বলেন, বিশ্বের ভয়ংকর নেতিবাচক জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ সর্বনাশা পলিথিনের যথেচ্ছা ব্যবহার। পলিথিনের অবাধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণকল্পে পাটের ব্যবহার বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। বিষয়টিকে মাথায় রেখে বর্তমান সংশ্লিষ্ট সকল ক্ষেত্রে পাটের ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাট প্যাকেজিং বাধ্যবাধকতা আইন বাস্তবায়ন করছে। তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ক্যালিফোর্নিয়া সিনেট পলিথিন নিষিদ্ধের লক্ষ্যে আইন পাশ করে।
বিজেআরআই’র সাম্প্রতিক অর্জন সম্পর্কে জানতে চাইলে ড. কামাল উদ্দিন বলেন, এ প্রতিষ্ঠানের গবেষকগণ পাটের প্রায় ৪৪টি উফশী জাত উদ্ভাবন করেছেন। পাট পচনের উন্নত কৌশল রিবন রেটিং পদ্ধতিটি এখন পাওয়ার রিবনারের মাধ্যমে উন্নয়ন করা হয়েছে। আরো উন্নতমানের আঁশের জন্য প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীগণ নিরলস কাজ করে চলেছেন।
এ সময় বিজেআরআই’র সাফল্য সম্পর্কে ড. কামাল উদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক খ্যতিসম্পন্ন প্রয়াত ড. মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে বাংলাদেশের পাট বিজ্ঞানীগণ পাটের জীবন রহস্য আবিষ্কার করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন সত্যিকার দেশপ্রেম ও একাগ্র চিত্তে গবেষণা করলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পাটের জীবন রহস্য উন্মোচনকে জাতীয় সংসদে বিশ্ববাসীকে অবহিত করেন, যা বিজেআরআই’র অন্যতম সেরা সাফল্য। এ ছাড়া পাটসহ পাঁচশতাধিক উদ্ভিদের কাণ্ডপচা রোগ সৃষ্টিকারী ছত্রাকেরও জীবন রহস্য বিজেআরআই’র বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন। পাটজাত দ্রব্যের উপর পাওয়া ২৫টি পেটেন্ট এ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের একটি বড় অর্জন। এ ছাড়া লবণ সহিষ্ণু জাতের উদ্ভাবন বাংলাদেশের দক্ষিণ এলাকায় পাট চাষকে উৎসাহিত করবে বলেও জানা তিনি।
তিনি আরো বলেন, পাট ও তুলার সংমিশ্রণে নানাবিধ পরিধেয় বস্ত্র, হালকা শপিং ব্যাগ, ফার্নিশিং কাপড়, পলিথিনের বিকল্প ব্যাগসহ অগ্নিনিরোধী আঁশ ও বস্ত্র উদ্ভাবন, কম্বল, জিন্স (ডেনিস), জামদানি শাড়ি, আসবাবপত্র, জুটিন, জুট কম্পোজিট ইত্যাদি তৈরি বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। এছাড়া নদীর বাঁধ, রাস্তা তৈরিতে মাটির ধ্বস রক্ষাকল্পে জুট জিও টেক্সটাইল ব্যবহার পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের অনেক সফলতার মধ্যে একটি।
পাটের উৎপাদন সম্পর্কে জানতে চাইলে ড. কামাল উদ্দিন বলেন, বিজেআরআই’র বিজ্ঞানীগণ দিনরাত পরিশ্রম করে পাটের উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছেন বলেই পাটের আবাদী জমি কমলেও উৎপাদন হ্রাস পায়নি। এ বছর পাট আঁশের উৎপাদন প্রায় ৭৬ লাখ বেল। উফশী জাতের উদ্ভাবন, বহুবিদ ব্যবহার উপযোগী শিল্প প্রযুক্তি বিজেআরআই’র বিজ্ঞানীদের অবদান।
বর্তমান সরকারের সঠিক ও সুষ্ঠু কৃষিনীতির প্রশংসা করে তিনি বলেন, পাট গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য সরকার সকল প্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা দিচ্ছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন তিনি।
সবশেষে ড. কামাল উদ্দিন বলেন, বিশ্বে পাট অত্যাবশ্যকীয় সমাদৃত প্রাকৃতিক আঁশ। পাট পরিবেশ বান্ধব এবং উন্নত বিশ্বে এটি বেশ সমাদৃত। ইদানিং চীনসহ উন্নত বিশ্ব পাট আঁশ নিয়ে বেশ কাজ করছে। মায়ানমার এবং চীন পাট দিয়ে পাল্প, পেপার এবং ভিসকোস রেয়ন তৈরি করছে। বাংলাদেশ সরকারও এ বিষয়ে উদ্যোগ প্রহণ করেছে। তিনি বলেন, আমাদের বিজ্ঞানী, পাটচাষি ও সরকার একত্রে কাজ করলে একে শুধু সোনালী আঁশ নয়, ডায়মন্ড আঁশে পরিণত করা সম্ভব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পাটজাত দ্রব্য ব্যবহারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, অতীতের সোনালী আঁশ ভবিষ্যতে হীরক আঁশ হিসেবে বিশ্বে সমাদৃত হবে।

