নিজস্ব প্রতিবেদক : ধানমন্ডি-৩২ নম্বর ভবনের সেই মূল সিড়িই সকল ব্যথা-বেদনা সহ্য করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য কাজ করার প্রেরণার যোগায় বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বুধবার বিকেলে দশম জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশনের দ্বিতীয় কার্যদিবসে সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য বেগম ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পির লিখিত প্রশ্নের জবাবে সংসদকে এ কথা বলেন শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জিয়াউর রহমান ধানমন্ডির বাড়ি ও ৩২ নম্বর সড়কের নম্বরও বদলে দেয়। প্রতি রাতে ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করে রাখে। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালের ১২ জুন হঠাৎ করে এক ঘণ্টার নোটিশে বাড়িটি আমাকে হস্তান্তর করা হয়। তখন আব্দুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ধূলি-ধূসর, বিধস্ত, রক্তের ছোপ ছোপ কালো দাগ ও রক্তমাখা ছড়ানো ছিটানো কাপড়-চোপড়, ছেড়া বালিশ, রক্তমাখা তুলা, দেয়াল ও মেঝে গুলির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত, এমনি অবস্থায় ওই বাড়িতে যখন প্রবেশ করতে যাই, আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম।’
তিনি বলেন, “একটি কথা আমি এখনো বুঝি না। হঠাৎ বাড়িটা হস্তান্তরে কীসের এত তাড়া ছিল? আমাকে ধরে সিড়ি দিয়ে উপরে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যখনই আমি সিড়ির ধাপের মাঝামাঝি উঠে আসি, তখনই আমার নজরে পড়ে সিড়ির সেই অংশটি, যেখানে ঘাতকের আঘাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন আমার বাবা। আমি সহ্য করতে পারিনি। ছুটে নিচে ফিরে গিয়েছিলাম। কিন্তু বের হতে পারিনি। নিচতলার করিডোরে বাইরে যাওয়ার যে কলাপসিবল গেট ছিল, তা বন্ধ ও তালা দেওয়া ছিল। আমি ‘দরজা খোল’ বলে চিৎকার দিয়ে ওখানে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।”
তিনি বলেন, ‘জানি না কত সময় পরে, দেখি, আমি তিন তলার ছাদে। আমার সামনে অনেক কাগজ আমাকে সই করতে হবে। আমার ফুফা সৈয়দ হোসেন সাহেব বললেন, একজন আইনজীবীর মাধ্যমে বুঝে নিতে, কিন্তু সরকারি লোকেরা তাও মানবে না। আমাকেই সই করতে হবে। আমি অনেকটা অচেতন অবস্থায়ই সই করে দিতে বাধ্য হই। কারণ আমার সঙ্গে যে নেতারা ছিলেন তারাও তাগাদা দিচ্ছিলেন। এর পর বহু বছর লেগেছে আমার ওই বাড়ির দোতলায় প্রবেশ করতে। পিছনে পাকের ঘরের সঙ্গে যে সিড়ি, সেটা ব্যবহার করেছি। আর মূল সিঁড়িতে গিয়ে বসে থেকেছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি এখনো মাঝেমাঝেই সেখানে যাই। আমার সকল ব্যথা-বেদনা সহ্য করার শক্তি আর বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার জন্য কাজে প্রেরণা সঞ্চয় করার জায়গা যেন সেটি। এই বাড়ি থেকেই যেন শক্তি পাই। এক দিকে সব হারাবার বেদনা, অন্যদিকে মানুষের সেবা করার প্রেরণা, সবই সেখানে গেলে পেয়ে থাকি।’
শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘১৯৮১ সালের ১৭মে দেশে ফিরে আসি। জিয়াউর রহমান আমাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে সফল হতে পারেনি। কারণ বাংলাদেশের জনগণ ও আওয়ামী লীগের নিবেদিত কর্মী বাহিনী সকল বাধা উপেক্ষা করে আমাকে দেশে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু দেশে এসে আমি যখন ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে প্রবেশ করতে যাই, আমাকে ওই বাড়িতে যেতে দেওয়া হয়নি।
পিতা-মাতা, ভাইদের জন্য একটু দোয়া করার সুযোগও দেওয়া হয়নি। পুলিশ প্রহরা ও গেটে তালা দিয়ে আমার পথ রুদ্ধ করা হয়। আমি রাস্তার ওপরই বসে পড়ি এবং আমাদের নেতা-কর্র্মীদের নিয়ে মিলাদ ও দোয়া পড়ি।’
তিনি বলেন, ‘১৫ আগস্ট শুধু যে ঘাতকেরা হত্যাকা- চালিয়েছে তাই না, তারা লুটপাটও করেছে। ১৯৮১ সালের ১২ জুন পর্যন্ত ওই বাড়িতে আওয়ামী লীগের কোনো মানুষকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।’
প্রধানমন্ত্রী সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে আরো বলেন, ‘১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত আমাদের বিদেশের মাটিতেই পড়ে থাকতে হয়। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের রাজনীতি ও দল গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের সকল নেতা-কর্মীকে কারাগারে বন্দি করে মিথ্যা মামলা দিয়ে নির্যাতন করা হয়। ১৯৭৯ সালে তারা মুক্তি পান। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে আমার অবর্তমানে আমাকে দলের সভাপতি নির্বাচন করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘সমগ্র বাংলাদেশেই কয়েদখানায় পরিণত হয়। খুনি মোশতাক ও তার দোসর জিয়াউর রহমান ১৫ আগস্ট হত্যাকা- চালায়। বাংলাদেশে ক্যু, হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু করে। সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পালা শুরু হয়। জিয়া নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা দেয়। আমি ও রেহানা দেশে ফিরতে চাইলে আমাদের বাধা দেওয়া হয়। রেহানার পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে সময় বর্ধিত করতে লন্ডন হাইকমিশনে পাঠানো হয়, জিয়াউর রহমানের নির্র্দেশে তা বর্ধিত করা হয় নাই। তাকে পাসপোর্ট দেওয়া হয় নাই।’
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই আমি ও রেহানা জার্মানিতে রওনা হই। ৩১ শে জুলাই জার্মানি পৌঁছাই। ১৫ দিনের মাথায় হঠাৎ শুনি আমরা দুই বোন এতিম হয়ে গেছি। নিঃস্ব, রিক্ত হয়ে গেছি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাসায় ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে আমার পিতা-মাতা, ভাইসহ পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের জীবনে যেমন এই দিনটি একটি কালো দিন, তেমনি বাংলাদেশের জনগণের জীবনেও নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার।’
তিনি বলেন, ‘১৫ আগস্ট ঘাতকের দল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং সেই দিনও তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা, আমার ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, মুক্তিযোদ্ধা লেফটেনেন্ট শেখ জামাল, দশ বছরের ছোট্ট শিশু ভাই শেখ রাসেলকে নির্মমভাবে হত্যা করে। কামাল-জামালের নব বধূ যাদের হাত তখনও বিয়ের মেহেদির রঙে রাঙানো, তাদেরও নির্মমভাবে হত্যা করে। আমার একমাত্র চাচা মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসেরকে হত্যা করে। রাষ্ট্রপতির মিলিটারি সেক্রেটারি কর্নেল জামিলকে হত্যা করে। কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারদের হত্যা করে। একই সঙ্গে শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিকে হত্যা করে। কৃষি মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও তার ১৩ বছরের মেয়ে বেবী, ১০ বছরের ছেলে আরিফ, চার বছরের নাতি সুকান্ত, ১৭ বছরের ভাগ্নে রিন্টু, ভ্রাতুষ্পুত্র সাংবাদিক শহীদ সেরনিয়াবাত, কাজের মেয়ে ও তার শিশু সন্তান পোটক, আরো আত্মীয়-স্বজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আমার ফুফু হেলেন গুলির আঘাতে আহত হন। তার পুত্রবধু সাহানা, ১২ বছরের মেয়ে রীনা, ২০ বছরের মেয়ে বিউটি, ১৮ বছরের ছেলে খোকন গুলির আঘাতে আহত হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করে। একই সঙ্গে ঘাতকরা আমার ছোট ফুফু লিলির বাড়িতে যায় এবং আমার ফুফা সৈয়দ হোসেনকে গ্রেফতার করে এবং ফুফুকে গৃহবন্দি করে রাখে।’

