নিজস্ব প্রতিবেদক : গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নতুন করে গণশুনানির আয়োজন করে বিএনপি ও দেশের সকল স্টেক হোল্ডারদের মতামত নিয়ে দাম পুনর্মূল্যায়নেরও দাবি করেছে দলটি।
শনিবার দুপুরে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানান বিএনপির মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন।
এর আগে বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বিইআরসি। সে অনুযায়ী, গ্যাসের দাম গড়ে ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং বিদ্যুতের দাম ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ বাড়ানোয় গ্যাসের মাসিক বিল ২০০ টাকা বাড়িয়ে এক চুলার জন্য ৬০০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৬৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান এ আর খান জানিয়েছেন, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন এই মূল্যহার কার্যকর হবে।
সংবাদ সম্মেলনে রিপন বলেন, সরকারের আজ্ঞাবাহী বিইআরসি দাম বাড়ানোর জন্য দেশের অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনদিনব্যাপী গণশুনানি করেছে। গণশুনানির রায় ছিল দাম না বাড়ানোর। কিন্তু লোক দেখানো শুনানির নামে নিজেদের ইচ্ছেমতো তারা গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।
বিএনপির এই নেতা বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য পুনরায় পর্যালোচনার জন্য শাসকদলের এক নেতাও দাবি জানিয়েছেন। এর ফলে প্রমাণিত হয়েছে, বিএনপি শুধু সরকারের বিরোধিতার নীতি থেকে এই মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিকে প্রতিবাদ করছে না, বরং জনগণের স্বার্থে কথা বলছে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ও বিইআরসি চেয়ারম্যান মূল্যবৃদ্ধির স্বপক্ষে যে যু্িক্ত তুলে ধরেছেন তা প্রত্যাখান করে বিএনপির মুখপাত্র বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি, সিস্টেম লস কমাতে পারলে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা জনগণের ওপর চাপাতে হতো না। বিইআরসি চেয়ারম্যান ‘পে-স্কেল আসিতেছে’ শুনিয়ে আগাম মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা জিজ্ঞেস করতে চাই, গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের মধ্যে সরকারি পে-স্কেলের আওতায় কত জন? জনগণের প্রতি মায়া-শ্রদ্ধা না থাকার কারণেই এসব উদ্ভট যুক্তি তারা তুলে ধরেছেন।’
গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপির এই মুখপাত্র বলেন, জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করা দল হিসেবে বিএনপি মনে করে এ দাম বৃদ্ধি অযৌক্তিক। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ আরেক দফা দুর্ভোগে পড়বেন।
তিনি বলেন, যখন সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় তাপে অস্থির এবং আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকাতে মানুষের এমনিতেই নাভিশ্বাস, তখন গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে সংসার চালাতে তাদের আরো হিমশিম খেতে হবে।
রিপন বলেন, গ্যাস খাতে সরকারের ভর্তুকি দিতে হয় না এবং লোকসানও নেই। বরং পাঁচ বছরে যেখানে পেট্রোবাংলার ২০ হাজার ৮০ কোটি টাকা লাভ করেছে। সেখানে গৃহস্থালি কাজে এক বার্নার ও দুই বার্নার চুলায় এক লাফে ২০০ টাকা বৃদ্ধির ঘোষণা নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের প্রতি নিদারুণ অবিচার।
জনগণের প্রকৃত ভোটে নির্বাচিত নয় বলেই সরকার জবাবদিহিতার কথা ভাবছে না, মন্তব্য করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ভোট ছাড়াই ক্ষমতায় আসা যায় বা ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখা যায় বলে সরকার দাম বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা ভাবেনি। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-রপ্তানিতে এই দামবৃদ্ধি কীভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়টিও আমলে নেয়নি সরকার।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও কমে যাওয়ারই কথা ছিল। তা না করে সরকার উল্টো বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্যাসখাত লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। এটা অত্যন্ত অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য।
রিপন বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গত এক বছরের তুলনায় এক তৃতীয়াংশে নেমেছে এবং অব্যাহতভাবে তেলের দাম কমছে। কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় দেশের জনগণ কোনো সুফল পাচ্ছে না। আমরা সরকারের এই গণবিরোধী নীতির তীব্র সমালোচনা করছি।’
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তেলের দাম সমন্বয় না করার জন্য প্রতি বছর বিদ্যুৎ খাতে ২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন রিপন।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ এবং বিইআরসি ঘোষিত তেল-গ্যাসের বর্ধিত মূল্য বাতিল করে মানুষের দুর্ভোগ-কষ্টের প্রতি মানবিক হতে হবে। কারণ, এই দুর্ভোগ ও অর্থনৈতিক চাপ ঘরে ঘরে চুলা থেকে শুরু করে কৃষি-শিল্প-ব্যবসা-রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির নেতাদের মধ্যে আবদুল হালিম, আবদুস সালাম আজাদ, আবদুল লতিফ জনি, আসাদুল করিম শাহিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

