নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীসহ দেশের সবক’টি জেলায় সক্রিয় জাল স্ট্যাম্প বিক্রির চক্র। জাল স্ট্যাম্প শনাক্ত করার সহজ কোনো পদ্ধতি দেশে না থাকার সুযোগে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ভেন্ডাররাই জড়িয়ে পড়েছে জাল স্ট্যাম্প ব্যবসায়। ফলে আসল স্ট্যাম্প মনে করে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ সব চুক্তি লিপিবদ্ধ করছেন নকল স্ট্যাম্পেই। ফলে ইতোমধ্যে সম্পাদিত কোটি টাকার চুক্তিও রয়েছে ঝুঁকিতে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি সূত্র সম্প্রতি এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানিয়েছে, জাল স্ট্যাম্পের ব্যাপারে সাধারণত ক্রেতারা সতর্ক থাকেন না। সরকার মনোনীত লাইসেন্সধারী স্ট্যাম্প ভেন্ডারদের কাছ থেকে স্ট্যাম্প কিনেই নিশ্চিত থাকেন ক্রেতারা। আর অসাধু ভেন্ডাররা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেদারসে বিক্রি করছে নকল বা জাল স্ট্যাম্প। এর ফলে সরকার যেমন কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে তেমনি ঝুঁকিতে পড়ছে কোটি কোটি টাকার চুক্তি।
এদিকে সাধারণভাবে স্ট্যাম্প আসল না নকল তা চেনাও কষ্টসাধ্য বলে জানিয়েছে সিআইডি। এমনকি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষেও জাল স্ট্যাম্প শনাক্ত করা অনেকটা দুঃসাধ্য। এই সুযোগে বছরের পর বছর জাল স্ট্যাম্প তৈরি করে সারা দেশে সরবরাহ করছে সক্রিয় চক্রগুলো। এতে লোকজনের অজান্তেই লাখ লাখ গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি লিপিবদ্ধ হচ্ছে জাল বা নকল স্ট্যাম্পে।
জাল স্ট্যাম্পে চুক্তি করার ফলে আইনত ওই চুক্তির কোনো বৈধতা থাকছে না বলে সিআইডির সূত্রটি দাবি করে বলছে, যেখানে চুক্তিটাই হচ্ছে জাল স্ট্যাম্পে, সেখানে আইনত ওই চুক্তির কোনো ভিত্তি থাকছে না। জাল স্ট্যাম্পে প্রতিনিয়তই এমন চুক্তি হচ্ছে সারা দেশে। ফলে লাখ লাখ চুক্তির আইনগত বৈধতা নিয়ে যে কোনো সময় প্রশ্ন উঠতে পারে।
এদিকে বিভিন্ন ধরনের জাল স্ট্যাম্প তৈরি করে সারা দেশের ভেন্ডারদের কাছে সরবরাহ করছে এমন একটি চক্রের মূলহোতা বুলবুল ইসলামকে গত শুক্রবার রাজধানীর দারুস সালাম এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি পুলিশ।
বুলবুল ও তার ভাই সৌরভের বাসায় অভিযান চালিয়ে পৌনে ১৮ কোটি টাকার জাল স্ট্যাম্পও উদ্ধার করে সিআইডি। উদ্ধার স্ট্যাম্পের মধ্যে রয়েছে, জুডিশিয়াল, নন-জুডিশিয়াল ও রেভিনিউ স্ট্যাম্প।
গ্রেপ্তারের পর বুলবুলকে চার দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে সিআইডি। বুলবুল সিআইডিকে জানিয়েছেন, জাল স্ট্যাম্প বিক্রির ব্যবসাটি তাদের পারিবারিক ব্যবসা। তার বাবাও দীর্ঘদিন জাল স্ট্যাম্পের ব্যবসা করেছেন। এখন এই ব্যবসার হাল ধরেছেন তিনি ও তার ভাই সৌরভ। সৌরভ পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে এ বিষয়ে আরো অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।
ঢাকার বিভিন্ন প্রেসের সঙ্গে তাদের চুক্তি রয়েছে বলেও বুলবুল সিআইডিকে জানিয়েছে। চুক্তি অনুসারে গোপনে তাদের জাল স্ট্যাম্প তৈরি করে তাদের সরবরাহ করে। এরপর তারাই সারা দেশের লাইসেন্সপ্রাপ্ত অসাধু ভেন্ডারদের কাছে সরবরাহ করে থাকে।
সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে বুলবুল আরামবাগের আজিজ প্রিন্টার্স (৮ নম্বর আরামবাগ) নামে একটি প্রেস থেকে জাল স্ট্যাম্প তৈরি করেছে বলেও জানিয়েছে। যেসব প্রেস থেকে জাল স্ট্যাম্প তৈরি করা হয়, সেসব প্রেসের অনেক কর্মচারীও জানে না যে প্রেসে জাল স্ট্যাম্প তৈরি হয়। কারণ জাল স্ট্যাম্প তৈরি করা এবং সরবরাহ করা হয় অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে।
জাল স্ট্যাম্প তৈরি এবং সরবরাহ করছে এসব চক্রকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে জানিয়ে সিআইডির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘সারাদেশেই জাল স্ট্যাম্প বিক্রির চক্র সক্রিয় রয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন প্রেসে জাল স্ট্যাম্প তৈরি করার পর সারা দেশে অসাধু ভেন্ডারদের কাছে তা পৌঁছে যায়।’
তিনি বলেন, ‘জাল স্ট্যাম্প চেনার তেমন কোনো সহজ উপায় নেই জানিয়ে তিনি বলেন, সাধারণভাবে বোঝা খুবই মুশকিল কোনটা আসল আর কোনটা নকল স্ট্যাম্প। তবে সিআইডিতে জাল স্ট্যাম্প, জাল দলিল, হাতের লেখা পরীক্ষা করা হয়।’
সিআইডির হাতে গ্রেপ্তার বুলবুলের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রিমান্ডে অনেক তথ্য দিয়েছে সে। এগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’

