পাঞ্জেরী ডেস্ক : কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। পানির স্রোতের তীব্রতা বেশি হওয়ায় ভেঙে যাচ্ছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ। অনেকস্থানে উঁচু সড়কের উপর দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে পানির স্রোত এতে ভেঙে যাচ্ছে সড়ক। ভেঙে পড়ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে যাচ্ছে। এতে সর্বস্ব হারাতে হচ্ছে কৃষককে। তাই ভেঙে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ দ্রুত পুনঃনির্মাণের দাবি জানিয়েছেন এসব এলাকার পানিবন্দী বাসিন্দারা। অন্যথায় বন্যার পানিতে জীবনযাত্রা যেমন বিপর্যস্ত হবে তেমনি ফসলের ব্যপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।
আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
লালমনিরহাট: মঙ্গলবার থেকে টানা বৃষ্টিতে লালমনিরহাট-রংপুর-মহাসড়কের স্বপ্নের তিস্তা সেতুর কাছে সদর উপজেলার তিস্তা এলাকায় সড়কে ব্যাপক ধ্বস নেমেছে। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
এদিকে অবিরাম বর্ষণে ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটের তিস্তা নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলগুলো বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে নদী তীরবর্তী এলাকার অন্তত ৮০ হাজার মানুষ।
সরেজমিনে সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, তিস্তা সড়ক সেতু থেকে মাত্র ২৫/৩০ গজ দূরে রাস্তার মাটির ধ্বস নেমে বিরাট গর্তের সৃষ্টি হয়েছে এবং পাকা রাস্তার পিচ পর্যন্ত ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোপূর্বে একই জায়গায় ধ্বস নামলে সড়ক বিভাগ মাটি দিয়ে বন্ধ করলেও সামান্য বৃষ্টিতেই মাটি সরে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পুরা রাস্তা ভেঙে গিয়ে রংপুর-লালমনিরহাট ও লালমনিরহাট জেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
লালমনিরহাট সড়ক ও জনপদ বিভাগের হামিদুল হক জানান, টানা বর্ষণের ফলে নদী তীরবর্তী অংশের সেতুর কাছে সামান্য অংশ ধ্বসে গেছে। তবে তা মেরামতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে বাইশপুকুর এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করে তিস্তা নদীর ডান চ্যানেলটি বন্ধ করেন দিয়েছে স্থানীয় জনগণ। এতে ওই চ্যানেল দিয়ে তিস্তার পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফুলে-ফেঁপে উঠছে তিস্তা নদী। ফলে তিস্তার স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রহস্ত হওয়ায় ব্যারেজের উজানে ডুবে গেছে ৪৫টি চর। এদিকে শনিবার দুপুরেও তিস্তার পানি বিপদসীমার ২ সেমি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
শেরপুর: সোমেশ্বরি নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে ঝিনাইগাতী-ভটপুর এলজিইডি’র পাকা সড়কের প্রায় ৩০ ফুট ভেঙে গেছে। ফলে ওই সড়কে সব রকম যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে পাহাড়ি ঢলে ঝিনাইগাতী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ।
স্থানীয়রা জানায়, গত দুইদিন উজানে ভারী বর্ষণের ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসে ঢল। এতে সোমেশ্বরি নদীতে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়। এছাড়াও মহারশি নদীতে পাহাড়ি ঢলের পানির স্রোতে রামেরকুড়া, দিঘীর পাড় পূর্বপাড়া ও পশ্চিমপাড়া এবং বনগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে আশপাশের ৭টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিতে তলিয়ে গেছে অসংখ্য পুকুর, সবজি ক্ষেত ও কৃষকদের বীজতলা।
প্লাবিত এলাকার অনেক স্থানেই রাস্তাঘাট ভেঙে স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ওইসব এলাকার লোকজনকে নৌকায় যাতায়াত করতে হচ্ছে।
এসব এলাকার মানুষ ভেঙে যাওয়া বাঁধ দ্রুত পুনরায় নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় তারা ব্যপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
বগুড়া: বগুড়ার সারিয়কান্দিতে যমুনা নদীর তীর নির্মাণাধীন সংরক্ষণ বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। শনিবার দুপুর পর্যন্ত বাঁধটি ৬০ মিটার ধ্বসে যাওয়ায় লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। তবে এতে করে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। এদিকে উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে সারিয়াকান্দি পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার ৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে, বাঁধ ধ্বসে সারিয়াকান্দিসহ কয়েকটি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর বিভিন্ন মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হলেও বাস্তব চিত্র এতো ভয়াবহ নয় বলে দাবি করেছেন সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাকিল মাহমুদ।
তিনি জানান, নির্মাণাধীন বাঁধ ভাঙার ফলে উপজেলার কামালপুর ও চন্দনবাইশা ইউনিয়নের হাওড়া খালি, গোদাখালি, দড়িপাড়া, সুতানাড়া, বিবিপাড়া, চন্দনবাইশা, নিজ চন্দনবাইশা, নৌখিলা স্কুল পাড়া, ঘুঘুমারি, শেখপাড়া, পন্ডিতপাড়া, বিঘপাড়া, আদর্শ গ্রাম আংশিক প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় দুর্গত মানুষের জন্য এখনো কোনো সরকারি বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। তবে, বরাদ্দের জন্য জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের নিকট আবেদন করা হয়েছে বলে সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান।
সুনামগঞ্জ: টানা বৃষ্টিপাত আর পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলার নিন্মাঞ্চল। পানিবন্দী হয়ে পরেছেন সদর উপজেলার নতুন বাজারের ব্যবসায়ীরা। বৃহস্পতিবার রাতে পানিতে তলিয়ে গেছে বাজারটি। ফলে ব্যবসায়ীরা অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন তাদের মালামাল।
এদিকে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে পাহাড়ি ঢলে সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমার ৫৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২২৫ মিলিমিটার। সুরমা নদীর পানি ইতিমধ্যে জেলার বেশিরভাগ হাওড়ে ঢুকতে শুরু করেছে। প্লাবিত হয়েছে প্রায় ৫০টি গ্রাম। পানি বন্দি হয়ে পরেছেন নীচু এলাকার লোকজন।
জেলার দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর, ছাতক ও সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে পানি বন্দি অবস্থায় রয়েছেন প্রায় ৬ হাজার লোক। এছাড়া বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।
এছাড়া জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। উপজেলার সদর ইউনিয়নসহ ৬ ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উত্তর সুরমার গুরুত্বপুর্ণ সড়ক তলিয়ে গিয়ে বর্তমানে ৬ ইউনিয়নের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জেলার বন্যা পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছি, দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনার সভা করেছি এবং সব ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিয়েছি। এখনো এটাকে বন্যা বলা যাবেনা। কারণ, বৃষ্টির ফলে পানি বাড়ছে এবং বৃষ্টি কমে গেলে পানির উচ্চতা কমছে, যদি পানির উচ্চতা আরও বেড়ে যায় তাহলে আমরা ত্রাণ সহায়তা এবং পানিবন্দী মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেবো।’
ময়মনসিংহ: শনিবার ভোর থেকে অবিরাম ভারী বর্ষণে ময়মনসিংহ শহরের নতুন বাজার রেলক্রসিংয়ের কাছে মাকরজানি খালের পানি বেড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে রেললাইন ডুবে যাওয়ায় দেওয়ানগঞ্জগামী তিস্তা এক্সপ্রেস আটকা পড়ে এক ট্রেন ঘণ্টা বন্ধ ছিল। অতিমাত্রার বৃষ্টিতে পুরো শহর প্লাবিত হওয়ায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আজ (শনিবার) অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করেছে কৃর্তপক্ষ। প্রবল বর্ষণের ফলে শহরের সাহেব কোয়ার্টার এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
এছাড়া ভোর থেকে অবিরাম ভারী বর্ষণে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক গাঙ্গিনারপার, স্টেশনরোড, দূর্গাবাড়ী, নতুন বাজার, কাঁচিঝুলি ও চরপাড়াসহ অলিগলির সকল রাস্তা ডুবে যায়। অধিকাংশ দোকানপাট ও বাড়িঘর বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দূর্ভোগে পড়েছে শহরবাসী।

