আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রা অনেক সহজ করে দিয়েছে। প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বে মানব জীবনে যেমন সুবিধা এনে দিয়েছে, তেমনি প্রকৃতি থেকে দূরেও সরিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষ অনেক দূরারোগ্য ব্যধির সমাধান পেয়েছে। কিন্তু এরপরেও এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পেয়ে বসেছে মানসিক চাপ, বিষন্নতা এবং একাকীত্ব । হতাশা এবং উদ্ধেগ যেন জীবনেরই অংশ হয়ে দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আশার আলো হয়ে উঠেছে ‘হর্টিকালচারাল থেরাপি’ বা বাগানভিত্তিক থেরাপি। গবেষনা শেষে এমনই স্বস্তির বাণী শোনালেন ঢাকা আহসানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের সিনিয়র সাইকোলজিস্ট রাখী গাঙ্গুলী। রাখী গাঙ্গুলী বলেন, ‘হর্টিকালচারাল থেরাপি’ বা বাগানভিত্তিক থেরাপি যা মানসিক সুস্থতা অর্জনের একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী পদ্ধতি হিসেবে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। হর্টিকালচারাল থেরাপি হলো এমন একটি থেরাপিউটিক পদ্ধতি যেখানে গাছ লাগানো, গাছের পরিচর্যা করা, বাগান করা কিংবা প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর মাধ্যমে মানুষের মানসিক, আবেগীয় ও সামাজিক সুস্থতা উন্নত করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, গাছপালার সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ততা মানুষের স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে, মনোযোগ বৃদ্ধি করে এবং ইতিবাচক আবেগ জাগিয়ে তোলে। বিশেষ করে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, বার্নআউট, বয়স্কদের একাকীত্ব এবং শিশুদের আচরণগত সমস্যার ক্ষেত্রে এর ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। একটি ছোট্ট গাছে নতুন পাতা গজানো, একটি ফুলের ফুটে ওঠা কিংবা নিজের হাতে লাগানো একটি চারা বড় হতে দেখা মানুষের মধ্যে আশা, দায়িত্ববোধ এবং সাফল্যের অনুভূতি তৈরি করে। প্রকৃতির এই ধীর ও স্বাভাবিক পরিবর্তন আমাদেরও ধৈর্যশীল হতে শেখায়। একজন মনোবিজ্ঞানী হিসেবে রাখী গাঙ্গুলি পরামর্শ দিয়ে বলেন, মানসিক সুস্থতা রক্ষায় আমরা অনেক সময় বড় সমাধান খুঁজি, অথচ ছোট ছোট অভ্যাসই অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে। প্রতিদিন অন্তত ১০-১৫ মিনিট গাছের পরিচর্যা করুন। বাসা বা অফিসে একটি ছোট ইনডোর প্ল্যান্ট রাখুন এবং সেটির যত্ন নিন। শিশুদের গাছ লাগানো ও পরিচর্যার কাজে উৎসাহিত করুন। এটি তাদের দায়িত্ববোধ ও আবেগীয় বিকাশে সহায়ক। প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য বাগান করা একটি চমৎকার অর্থবহ কার্যক্রম হতে পারে, যা একাকীত্ব কমাতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ অনুভব করলে কিছু সময় প্রকৃতির মাঝে হাঁটুন বা গাছপালার পাশে বসে সচেতনভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করুন। গাছের যত্ন নেওয়া মানে শুধুমাত্র একটি জীবন্ত সত্তার যত্ন নেওয়া নয়; এটি নিজের মন ও আবেগের প্রতিও যত্নশীল হওয়ার একটি উপায়। মানসিক স্বাস্থ্য শুধু রোগের অনুপস্থিতি নয়, বরং জীবনের সঙ্গে একটি ইতিবাচক ও অর্থবহ সংযোগের নাম। হর্টিকালচারাল থেরাপি আমাদের সেই সংযোগ পুনর্গঠনে সাহায্য করতে পারে। একটি ছোট্ট টবের গাছও কখনো কখনো একজন মানুষের জন্য আশার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া মানে শুধু সবুজকে খুঁজে পাওয়া নয়, বরং নিজের ভেতরের শান্তিকেও খুঁজে পাওয়া।

