অগ্রহায়ণ মাস এলেই গাইবান্ধার গ্রাম-গঞ্জে শুরু হয় এক অনাবিল আনন্দের হাওয়া নবান্ন উৎসবে মুখরিত হয়ে ওঠে কৃষিজীবী মানুষের জীবন। বাংলার শত শত বছরের লোকাচার বহন করে আনা এই নবান্ন যেন শুধু নতুন ধান ওঠার খুশি নয় বরং মানুষের হৃদয়ের উৎসব, পরিবার-পরিজনের মিলনমেলা আর গ্রামবাংলার চিরাচরিত সম্প্রীতির রঙছটা।
নবান্ন শব্দের অর্থই নতুন অন্ন। যখন মাঠজুড়ে সোনালি ধানের ঢেউ দুলতে থাকে, কৃষকের গোলায় ওঠে নতুন আমন ধান ঠিক তখনই শুরু হয় এই উৎসব। নতুন ধানের গন্ধে যেন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে মাটির টান, সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি আর পরিবারের সবাইকে নিয়ে উদযাপনের হাসিমুখ। গাইবান্ধার ৭টি উপজেলার কৃষকরা যারা আগে ধান রোপণ করেন বা গ্রাম্য ভাষায় যাদের বলা হয় আগুর ধানের চাষী তারাই সবার আগে শুরু করেন নবান্নের আয়োজন। নতুন চালের আটা থেকে পিঠা, পায়েস, পোলাও, খিচুড়ি সব কিছুই যেন উৎসবের রঙে রাঙানো। নতুন ধান ঘরে ওঠানো মানেই ব্যস্ততার শুরু। বাড়ির মহিলারা ঢেঁকিতে ধান ভাঙেন, নতুন চালের গুঁড়োর সঙ্গে নতুন গুড়, দুধ, শীতের ফল আর অল্প আদা মিশিয়ে তৈরি করেন নৈবেদ্য। প্রথমে তা নিবেদন করা হয়, বাড়ির বয়ো বৃদ্ধ ও সিনিয়র সিটি জেন থেকে শুরু করে। আঙিনায় আলপনায় আঁকা হয় ধানের শীষ, নতুন সূর্য আর ঘরোয়া সৌভাগ্যের নকশা। গাইবান্ধায় নবান্নের সরব আনন্দ গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্লাপুর, গোবিন্দগঞ্জ, ধাপেরহাট, ভাতগ্রাম, বকশিগঞ্জ ও মীরপুর এলাকায় এখন চলছে নতুন ধান কাটার উৎসব। কোথাও চলছে পুকুর ছেকে মাছ ধরার আয়োজন টাকি, কই, সিংগি, মাগুরের তাজা স্বাদে মুখর ঘরের রান্নাঘর। ধাপেরহাটের ৭০ বছরের প্রবীণ কৃষক বকশি মিয়া হাসিমুখে জানালেন নতুন ধান কাটছি এক সপ্তাহ হল, আজ বেটি-জামাই, নাতি-নাতনিদের, ডাকি খাওয়ামু। জাতে পাইজন ধান, চিকন চাউল, আলু ভর্তা, আর পুকুরের সিংগি-মাগুর মাছ রান্না হইব। তেল, ভাজা পিঠা খামু ধুম ধামের সহিত। যেন ঈদের আনন্দ নবান্নে! তার ৩ ছেলে, তিন মেয়ে, নাতি-নাতনি মিলিয়ে ১১ জনের ঘরে আজ উৎসবের ধুমধাম হাসি, খাওয়া-দাওয়া, গান আর গ্রামের পুরোনো আড্ডার রেশ। হাজার বছরের এই লোক উৎসবের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর সব ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ। নতুন ধানের খুশিতে গ্রামের সবাই একই আঙিনায় বসে, একই পাত থেকে পিঠাপোড়া ভাগ করে খায়। কোনো ভেদাভেদ নেই শুধু আনন্দের ভাগ। কবি জীবনানন্দ দাশ যেন তাই বলেছিলেন হয়তো ভোরের কাক হয়ে আমি ফিরতাম, নবান্নের দেশে নবান্নকে ঘিরে গাইবান্ধার বিভিন্ন স্থানে বসে গ্রামীণ মেলা। এখানে পাওয়া যায় আঞ্চলিক গান: জারি-সারি, মুর্শিদি, লালন, বিচার গান, গ্রামের হস্তশিল্প নতুন চালের পিঠেপুলি, পায়েস শিশুদের জন্য নাগরদোলা, সার্কাস, বায়োস্কোপ স্থানীয় ছেলেদের নাচ-গান ও দলীয় পরিবেশনা নতুন ধানের গন্ধে গ্রাম জেগে ওঠে। ধানের গোলা ভরে ওঠে আশায় মুখে মুখে শোনা যায় সেই হাজার বছরের আনন্দের ডাক এসো নবান্ন, এসো নতুন অন্নের খুশি নবান্ন শুধু একটি উৎসব নয় এটি কৃষকের পরিশ্রমের ফসল, গ্রামের মানুষের মিলনমেলা,মাটির গন্ধে ভরা এক জন্মান্তরের গল্প।

