ঢাকাSunday , 27 September 2020
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাঁশ উন্নয়ন প্রকল্পের টাকায় সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্র!

Link Copied!

রাঙামাটি প্রতিনিধি : আত্মগোপনে পাহাড়ের বিছিন্নতাবাধী ও অস্ত্রধারী জেএসএস ক্যাডার টন্টু মনি চাকমা। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বাঁশ উন্নয়ন প্রকল্পের উপকারভোগীর তালিকায় সরব উপস্থিতি তার। শুধু টন্টু মনি চাকমাই নয়, জেএসএস, পিসিপি ও ইউপিডিএফসহ আরও বেশকিছু বিছিন্নতাবাধী অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপের ক্যাডারদের পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির আত্ম-উন্নয়নের প্রকল্পের উপকারভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার তথ্য মিলছে সংস্থাটির কাগজে-কলমে। এসব নিয়ে সংস্থাটির প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কেউ মুখ না খুললেও সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বোর্ডের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থে অস্ত্র কেনার চিত্র। সংশ্লিষ্টরা জানান, সন্ত্রাসী টন্টু চাকমা রাঙামাটির বাগাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নে বাসিন্দা। তবে তিনি বসতি গড়েছেন রাঙামাটি জেলা সদরের কলেজ গেইট এলাকায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ২০১৬ সালে বাঁশ বাগান প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার পরই এই প্রকল্প থেকে টন্টু একাই বাগিয়েছেন ২৫ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ২৬ উপজেলায় কৃষকদের সাবলম্বী করতে উন্নত জাতের বাঁশের চারার প্রকল্প খাতা কলমে বাস্তবায়নের গতি থাকলেও প্রকল্পের অস্তিত্ব নেই। প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৬ সালে। এরমধ্যে ৪ গত হলেও প্রকল্পের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারির দেখা পাননি পাহাড়ের স্থানীয় প্রতিনিধি এবং সেখানকার এলাকার বাসিন্দারা। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রকল্প পরিচালক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, প্রকল্পের কাজ কিভাবে বাস্তবায়ন করবে! কুন্ডুষদের (পাহাড়ের বিভিন্ন সন্ত্রাসীদের) চাঁদা না দিলে এখানে থাকাও অসম্ভব। কোন প্রকল্পে কর্মকর্তা কখন কে কোথায় যায়, এরা সব খবর রাখে। সুযোগ পেলেই অপহরণ করে বা জিম্মি করে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে নেয়। এসব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলেও কোনো লাভ নেই। জানালে আরও বিপদ বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্প অনুমোদন পেতে উপরের লেভেলে খরচ। প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার সংস্থার সংশ্লিষ্টদের কমিশন। আর বাকি যা থাকে প্রকল্প কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন-ভাড়া আর কুন্ডুষদের চাঁদা দিতে দিতেই শেষ।
অভিযোগ রয়েছে, পাহাড়ের প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ঊঠা বুনো বাঁশের বাগানকে প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত দেখিয়েই শতভাগ বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে এই বাঁশবাগান প্রকল্পটি। আর এরমধ্যে বয় দেখানো হয়েছে প্রকল্পের পুরো বরাদ্দ। এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি প্রকল্প পরিচালক। বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যানের দাবী দৃশ্যমান হতে সময় লাগবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নিয়ন বোর্ডের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য মতে. দুর্গম পাহাড়ে বসবাসরত অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় আনতে উন্নতমানের বাঁশ চাষ নামের একটি প্রকল্প চলছে তিন পার্বত্য জেলায়। এই প্রকল্পের আওতায় প্রতি এক একর জমি আয়তনের ১৩ হাজার আলাদা বাগান গড়ে তুলবে প্রকল্প প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি বাগানের মালিক হবে একটি করে কৃষক পরিবার। এ হিসেবে অন্তত ১৩ হাজার পরিবার এ প্রকল্পের সুবিধাভোগী হবেন। একই সাথে স্থানীয়ভাবে উদ্যেক্তা তৈরি করে ২৬০টি বাঁশ র্নিভর ক্ষুদ্র কুটির শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারিত আছে প্রকল্পটিতে। প্রকল্পের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৩ হাজার নতুন বাঁশ বাগানের পাশাপাশি উপকার ভোগীদের মাঝে ২৮ লাখ ৬০ হাজারটি বরাক, বারি, মিতিঙ্গা, মুলি, ডলু, ওরা জাতের বাঁশের চারা বিতরণের কথা ছিলো। ৫ বছর প্রকল্পর ৪ বছর গত হয়েছে গেলো ৩ মাস আগে, কিন্তু এখনো দৃশ্যমান কিছুই হয়নি কোথাও। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রকল্পটি গ্রহণের প্রেক্ষাপট হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে অনগ্রসর ও দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। দেশের মোট আয়তনের দশ শতাংশ এলাকা হচ্ছে এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। এরমধ্যে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা। এই তিন জেলার ৯০% শতাংশ এলাকা হচ্ছে পাহাড় ও বনাঞ্চল দ্বারা পরিবেষ্টিত। অত্র এলাকা জনগন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এলাকায় বেষ্টিত বনাঞ্চলের বাঁশ ও কাঠের উপর র্নিভরশীল। পার্বত্য এলাকার কাচালং, রাইখ্যং, সাংগু ও মাতামুহুরী ইত্যাদি নদীবিস্তৃৃত এলাকায় অধিকাংশ বাঁশ উৎপাদন হয়। এই এলাকায় মুলি বাঁশের উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। তবে ভূমি দখল, নির্বিচারে বন উজাড়, ভূমির ব্যবহারের ধরণ পরিবর্তন, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ভূমি ব্যবস্থাপনা, প্রতি বছর স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে চাষ পদ্ধতির ফলে বন উজাড় এইসব কারণে প্রতি বছর ২.৬ শতাংশ হারে বাঁশ উৎপাদন কমে গেছে। ২০০৬ সাল থেকে সাম্প্রতিককালের বাঁশের ফুল হওয়ার কারণে বাঁশের উৎপাদন অনেক কমে যাচ্ছে। স্বাধীনতার প্রায় দুই দশকের ঊর্ধ্ব সময় ধরে অত্রাঞ্চলে যে অস্থির পরিবেশ ছিল তা ১৯৯৭ ইং সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে অবসান হয়। পার্বত্য চুক্তি পরবর্তী সময়ে আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন উন্নয়নে এখানকার সাধারণ জনগণের কল্যানে বিভিন্ন প্রকল্প ও কার্যক্রম গ্রহণ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অনগ্রসর জনগোষ্ঠির আয়বর্ধনমূলক কর্মসূচি হিসাবে উন্নত জাতের বাঁশ উৎপাদন’ শীর্ষক প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়।
প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য একটি এলাকা রাঙামাটির কাউখালি উপজেলা। এখানে বেশ কিছু বড় বড় বাঁশ বাগানের দেখা মেলে, কিন্তু বাগানের মালিকরা জানান বংশ পরম্পরায় এসব বাগানের মালিক হয়েছেন তারা। এর সঙ্গে কোন প্রকল্পের সম্পর্ক নেই। এছাড়া উন্নয়ন বোর্ডে কোনো কর্মকর্তাকেও তারা কখনো দেখেন নি এলাকায়। স্থানীয়রা বলছেন, এসব এলাকায় নিজে নিজেই বাঁশ বাগান গড়ে উঠে, কোনো প্রকল্প নয় এগুলো। আবার কেউ কেউ বলছেন, তারা নিজেরাই তাদের জমিতে ব্যক্তি উদ্যোগে বাঁশ বাগান গড়ে তুলেছেন, সরকারি কোনো সহায়তায় নয়।
কাউখালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শামসুদ্দোহা চৌধুরী জানান, ৪ বছর ধরে তার উপজেলায় বাঁশের এই প্রকল্প চলছে এটা তিনি এই প্রথম সাংবাদিকদের কাছেই শুনেছেন। এমনকি তার অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরাও এমন প্রকল্পের বিষয়ে কিছুই জানে না।
এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে গেলে প্রকল্প পরিচালক হারুন উর রশিদকে তার কার্যালয়ে পাওয়া যায় নি। পরে মুঠোফোনে বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় গণমাধ্যম কর্মীরা।
তবে সদ্য যোগদান করা বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল আলম নিজামী জানান, প্রকল্প পরিচালক তাকে জানিয়েছেন লাগানো বাঁশের চারাগুলো এখনো বড় হয়নি, তাই আরো কিছুদিন না গেলে তা দৃশ্যমান হবে না।
তিনি জানান, প্রকল্পটি তো মাত্র শুরু হলো, তা দৃশ্যমান হতে সময় লাগবে। তিনি দাবি করেন, কাজ না করে বা প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে কোনো ধরনের উল্টাপাল্টা কাজ হয় না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, তিন পার্বত্য জেলার অধিকাংশ এলাকাই পাহাড় ও বনাঞ্চল দ্বারা বেষ্টিত। এখানকার কাচালং, রাইখং, সাঙ্গু, মাতামুহুরি নদীসহ পাহাড়ি নদীগুলোর চারপাশে প্রচুর বাঁশের উৎপাদন হয় আবহমানকাল ধরে। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা এসব বাঁশ বাগানকে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে লুটে নেয়া হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।