লক্ষ্মীপুর সংবাদদাতা : ঝুঁকিপূর্ণ তবু রশি টেনেই হাজার হাজার মানুষ পার হচ্ছেন প্রতিদিন। সেতু না থাকায় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার কালিরচর গ্রামের রহমত খালী খালটি স্থানীয় বাসিন্দাদের এভাবেই পারাপার হতে হয়।
আসলে রহমত খালী খালটিকে ছোট-খাটো নদী বলা চলে। কালিরচর গুচ্ছগ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রহমত খালী খাল তীব্র ভাঙনের ফলে নদীর আকার ধারণ করেছে। খালটির দুই পাশে লম্বা বাঁশের খুটির সঙ্গে বাঁধা রয়েছে একটি রশি। সেই রশি টেনে টেনে পারাপার হচ্ছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ রোগী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, কৃষক ও দিনমজুরসহ প্রায় ৮টি গ্রামের বাসিন্দারা।
অনেক সময়ই নৌকা থেকে খালে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটার নজির রয়েছে। মেঘনা নদীর সঙ্গে খালটির সংযোগ থাকায় বর্ষাকালে জোয়ারের সময় খালটিতে কচুরিপাতা জমে যায়। ফলে কেউ সাঁতার দিয়ে কেউবা কষ্ট করে কচুরিপাতা সরিয়ে রশি টেনে টেনে নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণ খাল পার হচ্ছেন। অথচ সেতুটি নির্মাণ হলে ভোগান্তি লাঘবের পাশাপাশি যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচিত হতো বলে ধারণা স্থানীয়দের।
তবে স্থানীয় চেয়ারম্যান বলছেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার অবহিত করেও একটি সেতু বরাদ্ধ পাওয়া যাচ্ছে না।
খালটির দু পাড়ে অবস্থিত গ্রামগুলোতে প্রচুর পরিমাণে সবজির চাষ হয়ে থাকে। কিন্তু সেতু না থাকায় সবজি সঠিক সময়ে বাজারে নেওয়া সম্ভব হয় না চাষিদের পক্ষে। ফলে অল্প দামে খাল পাড়ে পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে সেতু না থাকায় খাল পাড়ে দীর্ঘসময় অপেক্ষার প্রহরও গুনতে হচ্ছে কখনো কখনো। যার কারণে সঠিক সময়ে গন্তব্য স্থানে পৌঁছানো ব্যহত হচ্ছে।
টুমচর আসাদ একাডেমির অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আছমা আক্তার জানায়, খালটি পারাপারের জন্য পাড়ে তাকে অনেক সময়ই দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাই প্রায়ই ঠিক সময়ে স্কুলে যাওয়া হয় না। অন্যদিকে খালে কচুরিপাতা জমে থাকার কারণে যেদিন নৌকা চলে না, সেদিন আর স্কুলে যাওয়া হয় না।
অন্য এক কলেজ শিক্ষার্থী আল ফয়েজ হোসেন রাকিব বলেন, ‘খাল পারাপারের সময় কয়েকদিন নৌকা থেকে পড়ে গিয়েছি, এতে জামা-কাপড়সহ বই-কাগজ সব ভিজে গিয়েছে। আমাদের এত কষ্ট দেখেও কেউ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। খালের দুই পাড়ের বাসিন্দারা বিত্তশালী না হওয়ায় নিজেদের উদ্যোগেও সেতুর বিকল্প কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না।’
পল্লী চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম জানান, সেতু না থাকায় খাল পারাপারে নানা সমস্যায় পড়তে হয়, তাই সঠিক সময়ে অসুস্থ রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানও করতে পারি না। তাই সেতুর অভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে এ অঞ্চলের বাসিন্দারা।
কমলনগর উপজেলার চরমার্টিন এলাকার বাসিন্দা নুর ইসলামকে দেখা গেল তিনি খাল পাড়ে দীর্ঘসময় দাড়িয়ে রয়েছেন অসুস্থ নাতি জাহিদকে নিয়ে। গন্তব্য লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ডাক্তার দেখাবেন। তার সাথে কথা হলে তিনি জানান, জেলা শহরে যাওয়ার সহজ পথ এটি, তাই এ পথেই যাতায়াত করেন । সবসময় খালটি পার হওয়ায় জন্য দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনেক সময় নৌকা পেলেও লোকজন বেশির কারণে নৌকায় উঠতে পারেন না। যার জন্য গন্তব্যস্থানে যেতে পারেন না ঠিক সময়ে। খালটির উপর দ্রুত একটি সেতু নির্মাণেরও দাবি জানান তিনি।
খালপাড়ে পুরুষদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় আছমা, রহিমা, শিউলি, ফাতেমা ও ময়না আক্তার নামে কয়েকজন নারীকে। তারা জানান, তারা সবাই একটি এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের টাকার কিস্তি পরিশোধ করতে যাচ্ছেন। তারা জানান, সেতু না থাকায় অনেক সময় ঝড়বৃষ্টিতে পারাপারে দূর্ভোগে পড়তে হয় তাদের।
নৌকার মাঝি জামাল মিয়া বলেন, ‘রশি টেনে টেনে খাল পার করতে খুব কষ্ট হয়। স্থানীয়দের কষ্টের কথা চিন্তা করেই এ কাজ করি। বর্ষাকালে খালে অনেক পানি ও ঢেউ থাকে, তখন রশি টানতে খুব কষ্ট হয়। এখানে খাল পারাপারে নির্দিষ্ট কোন ভাড়া নেই, লোকজন যা দেয় তাই নেই। তবে কচুরিপানা খালে ভরে গেলে নৌকা চালানো বন্ধ থাকে। কারণ কচুরিপানার মধ্যে রশি টানা খুবই কষ্টের।
স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সৈয়দ নুরুল আমিন লোলা বলেন, ‘রহমত খালী খালের উপর একটি সেতুর অভাবে এখানকার মানুষের দূর্ভোগের কথা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কয়েকবারই অবহিত করেছি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ভালো ফল পাইনি। দ্রুত একটি সেতু নির্মাণ করে দিলে এ অঞ্চলের মানুষ বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি চির কৃতজ্ঞ থাকবে।’
সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাজাহান আলী বলেন, ‘সেতু সঙ্কটের কারণে মানুষের দুর্ভোগের কথা জানা নেই। তবে কেউ লিখিতভাবে জানালে, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করবেন এবং পারাপারে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’

