নিজস্ব প্রতিবেদক : হঠাৎ করে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, ‘এই অভিযানের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের চেষ্টা চলছে। চলছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। এর পেছনে সরকারের দূরভিসন্ধি রয়েছে। এই অভিযানে প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের জন্য বিচারবিভাগীয় তদন্ত করতে হবে।’
বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন বন্ধ এবং মাহমুদুর রহমান ও শওকত মাহমুদসহ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা সন্ত্রাসের প্রতিবাদে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) একাংশ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
মওদুদ বলেন, ‘গত নয় বছরে বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার লাভ করেছে। মাদকের সাথে সরকারের সবাই জড়িত। এই সরকারই মাদকের সুযোগ করে দিয়েছে। আজকে তরুণদের মাদকের মাধ্যমে চেতনা থেকে দূরে রেখেছে সরকার।’
‘সরকার এতদিন কোথায় ছিল? হঠাৎ করে কেন মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করল? আসলে এর মাধ্যমে সরকার মানুষ হত্যার লাইসেন্স দিয়ে দিছে। সংবিধানের কোথায় আছে যে বিচারবহির্ভূত মানুষ হত্যা করা যাবে? আসলে দেশে আইন নেই। এজন্যই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে। কারণ এই সরকার আইনের শাসনে, জনগণের মতামতকে বিশ্বাস করে না।’
সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানে এখন পর্যন্ত যারা ক্রসফায়ারে মারা গেছে তাদের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মাদকের সাথে জড়িত নয়। ৭৯ জনের যে তালিকা করা হয়েছিল তাদের তো কেউ ধরা পড়েনি। অন্যদিকে কক্সবাজারের সাংসদ বদিকে বিদেশ যেতে সহায়তা করা হলো।’
বিএনপির মাদক ব্যবসায়ীদের খোঁজা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মওদুদ আহমদ বলেন, ‘তাহলে এতদিন যাদের ধরলেন আর মারলেন তারা কি আওয়ামী লীগের লোক? আসলে আমরা যে আশঙ্কা করেছিলাম এই অভিযানের বিরুদ্ধে দুরভিসন্ধি রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা হচ্ছে। আমাদের অনেক নেতাকর্মীর তালিকা করা হয়েছে। আমি বলব- এসব অবিলম্বে বন্ধ করুন। প্রকৃতপক্ষে যারা মাদকব্যবসায়ী তাদের শীর্ষ নেতাদের ধরুন।’
মাদকবিরোধী অভিযানে নিহতদের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানে প্রত্যেক হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের একজন প্রাক্তন বিচারক দিয়ে এই কমিটি করতে হবে।’
বর্তমান সরকারের আমলে নির্যাতন-নিপীড়ন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে- এমন দাবি করে মওদুদ বলেন, ‘কারণ এই সরকারের কোনো জবাবদিহিতা নেই। এই সরকার একদলীয় এবং ভোটারবিহীন অবৈধ সরকার। এজন্যই সাংবাদিকদের ওপর বেশি নির্যাতন। কারণ তারা জনগণের মনের কথাগুলো লেখে এবং কিছুটা হলেও বলে। আমি বলব, এসব নির্যাতন বন্ধ করতে হলে আমাদেরকে কঠিন আন্দোলন করতে হবে। আন্দোলনের মাধ্যমেই সভ্যতা ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। আজকে সরকার বলছে উন্নয়শীল দেশের কথা। কিন্তু সভ্যতা, মূল্যবোধ, গণতন্ত্র ও সুশাসন না থাকলে উন্নয়শীল বলাটা অর্থহীন।’
মাসদার হোসেন মামলার কার্যকারিতা নেই দাবি করে এই প্রবীণ আইনজীবী বলেন, ‘বর্তমান সরকার মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে বন্দি করেছে। উচ্চ আদালত জামিন দিলেও নিম্ন আদালত জামিন দিচ্ছে না। তারা সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ সত্যিকারার্থে আর নেই। মাসদার হোসেন মামলার কার্যকারিতাও নেই।’
মওদুদ বলেন, ‘আপনারা খালেদা জিয়ার জামিন বিলম্বিত করতে পারেন। কিন্তু তিনি মুক্তি পাবেন। আমাদের দলের নেতৃত্ব দেবেন। বিএনপি বেগম জিয়ার নেতৃত্বেই আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে এবং বাংলাদেশে আগামী দিনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে ইনশাআল্লাহ। বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। আমরা প্রত্যাশা করি আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে। বিশেষ করে গ্রামের ভোটারেরা ভোটকেন্দ্রে যাবেন নিঃসঙ্কোচে। কোনো সমস্যা থাকবে না। এর বাইরে কোনো নির্বাচন জনগণ মানবে না, হতেও দেবে না।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ বলেন, ‘আজকে একটি দল বাংলাদেশের মালিকানা দাবি করছে। বর্তমান সরকার অনির্বাচিত। তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়। অথচন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আজকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি হলে আবারো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার হবে। আমাদেরকে জনগণের মুক্তির জন্য গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করতে হবে। আইন করে মুক্ত চিন্তা ও বাকস্বাধীনতা বন্ধ করা যাবে না।’
সভাপতির বক্তব্যে রুহুল আমিন গাজী আগামী ৩০ জুনের মধ্যে বন্ধ সব মিডিয়া খুলে দেয়া, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহার, গোয়েন্দা খবরদারি বন্ধ এবং নিবর্তনমূলক আইন বন্ধের দাবি জানান। তা না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
বিএফইউজে সভাপতি রুহুল আমিন গাজীর সভাপতিতে ও ডিইউজের যুগ্ম সম্পাদক এরফানুল হক নাহিদের পরিচালনায় সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তৃতা দেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, বিএফইউজের মহাসচিব এম আব্দুল্লাহ, সহ-সভাপতি আহমদ মতিউর রহমান, ডিইউজে সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, সিনিয়র সহ-সভাপতি বাছির জামাল, ডিইউজের প্রচার সম্পাদক দেওয়ান মাসুদা সুলতানা, সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম, বিএফইউজের প্রচার সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ প্রমুখ।

