নিজস্ব প্রতিবেদক : জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ চারজনের ৭ বছরের কারাদণ্ড চায় দুর্নীতি দমন কমিশন।
মঙ্গলবার পুরান ঢাকার বকশীবাজারের বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামানের আদালতে প্রসিকিউটর মোশাররফ হোসেন কাজল দুদকের পক্ষে যুক্তিতর্কের শুনানিতে এ দাবি করেন।
মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে বকশীবাজারের অস্থায়ী ওই আদালতে পৌঁছান বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
এরপর বেলা ১২টা ১০ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। দুদকের পক্ষে মোশাররফ হোসেন কাজল যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু করেন। মামলার এজাহার পড়ার মধ্য দিয়ে যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু করেন তিনি।
যুক্তিতর্কে মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, খালেদা জিয়া ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার নিজের ৬ নম্বর শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ির নাম ব্যবহার করে শহীদ জিয়াউর রহমান চ্যারিটেবল ট্রাস্ট নামে গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ট্রাস্টটি রেজিস্ট্রি করেন। উক্ত দলিলে তার কোনো সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করেছেন তার উল্লেখ নেই। ট্রাস্ট সম্পর্কে অন্য কোনো ব্যক্তির কিছু জানার সুযোগ ছিল না। তিনি ট্রাস্টের কাজে তার রাজনৈতিক সচিব আবুল হারিছ চৌধুরী এবং তার এপিএস জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও অন্যদের সহযোগিতায় সোনালী ব্যাংক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় শাখায় লেনদেন করেন।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদার বলে ক্ষমতার অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে সংগৃহীত ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা তার রাজনৈতিক সচিবের সহযোগিতায় সংগ্রহ করেন। খালেদা জিয়া উক্ত টাকার বৈধ উৎসের বিষয়ে জানতে না চেয়ে বরং উহার বৈধতার প্রচেষ্টায় মেট্রোমেকার্স অ্যান্ড ডেভেলপার লিমিটেডের নাম ব্যবহারের অপচেষ্টা করেছেন।
দুদকের এ আইনজীবী বলেন, টাকার উৎস যে অবৈধ খালেদা জিয়া তা জানতেন। কারণ, খালেদা জিয়া উক্ত ট্রাস্টের প্রথম ম্যানেজিং ট্রাস্টি ছিলেন। তার অগোচরে ট্রাস্টের অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা জমা হওয়ার কথা না। খালেদা জিয়ার কার্যকলাপের কারণে বিএনপির দলীয় ফান্ড থেকে ৬ কোটি ১৮ লাখ ৮৯ হাজার ৫২৯ টাকা পাওয়ার পরও তিনি জেনে-শুনে ৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক প্রদান করেন। অর্থাৎ দলীয় ফান্ডের অতিরিক্ত টাকা অবৈধভাবে সংগৃহীতভাবে জমা ছিল। তা খালেদা জিয়ার জানা ছিল। খালেদা জিয়া তার পদমর্যাদা ব্যবহার করে তার রাজনৈতিক সচিব ও অন্যদের সহায়তায় অবৈধ টাকা সংগ্রহ ও খরচ করেন। তিনি স্পষ্ট জানতেন, ওই টাকার উৎস অবৈধ। সে কারণেই মেট্রোমেকার্স অ্যান্ড ডেভেলপারের টাকা হিসেবে উক্ত অংকের টাকাকে বৈধ করার অপচেষ্টা করেছেন।
মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, খালেদা জিয়া ট্রাস্টের নামীয় উক্ত ব্যাংক শাখার হিসেবে দুটি চেকে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ২৭ লাখ টাকা প্রদান করেন। ব্যাংক থেকে দুটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমিদাতা সুরাইয়া খানের নামে স্ট্যান্ডার্ড চার্টাড ব্যাংকের দুটি হিসেবে স্থানান্তর করেন এবং তা জমা করেন।
তিনি বলেন, চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে ক্রয়কৃত জমির দলিল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দলিলটিতে মোট সম্পদের মূল্য উল্লেখ রয়েছে ৬ কোটি ৫২ লাখ ৭ হাজার টাকা। কিন্তু দলিলে উল্লেখিত টাকা ছাড়াও অপর একটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে ১ কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির দলিলদাতাকে প্রদান দেখিয়ে লেনদেন করেছেন। অর্থাৎ তিনি অবৈধ উৎস থেকে প্রাপ্ত টাকা সুরাইয়া খানকে প্রদান দেখিয়ে লেনলেন করেছেন।
তিনি আরো বলেন, বিজ্ঞ আদালত একটি মামলা (অরফানেজ) রায়ের জন্য দিন ধার্য করেছেন। ওই মামলা নিয়ে টকশোতে বিভিন্ন ব্যক্তি যারা কখনো আদালতে আসেননি তারা মামলাকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করছেন। আমরা আদালতের কাছে প্রকেটশন চাই। ২০০৪ সালের আজকের আসামি (খালেদা জিয়া) এই আইন করেছিলেন। আজ সে আইনে তার বিচার হচ্ছে। তখন আইনমন্ত্রী ছিলেন মওদুদ আহমেদ। তারও এই আইনে বিচার হচ্ছে। আশা করি, তিনি (খালেদা জিয়া) ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী হলে মওদুদ সাহেবের পরামর্শ আর নিবেন না। তিনি অন্যান্য গুণী মানুষের পরামর্শ নিবেন।
তিনি অভিযোগ করেন, এই আদালতে ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমি ধর্মকে ব্যবহার করতে চাই না। আমি সংবিধান পকেটে নিয়ে ঘুরি। ওই বক্তব্যের পর খালেদা জিয়াসহ আইনজীবীরা হেসে ওঠেন।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়া তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই অর্থ সংগ্রহ করেছেন। তিনি ট্রাস্ট দলিলে এবং হিসাবে নিজের নামের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শব্দ ব্যবহার করেননি। আমরা দুদকের পক্ষে আদালতে ৩২ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে আসামিদের বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছি। তাই ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় আসামিদের সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড প্রদানের দাবি করছি। যাতে ভবিষতে ক্ষমতাবানরা এ ধরনের অপরাধ করতে সাহস না করেন।
দুদকের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ হলে বিচারক খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের জিজ্ঞাসা করেন, তারা কতজন যুক্তি উপস্থাপন করবেন।
ওই সময় প্রাক্তন এ প্রধানমন্ত্রীর আইনজীবী আব্দুর রেজ্জাক খান কলেন, আমিসহ অনেকই করবেন। তবে আমরা অন্যান্য আসামিদের পক্ষে করার পর করব। এরপর আসামি জিয়াউল হক মুন্নার পক্ষে আইনজীবী আমিনুল ইসলাম যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন।
তিনি যুক্তি উপস্থাপনে বলেন, বর্তমান সময়ে দলীয়করণ ও মামলা দায়েরের একটি মহোৎসব চলছে। আজ যিনি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি তিন বারের সফল প্রধানমন্ত্রী। আজ দেশে তার বিরুদ্ধে বিচারাধীন দুই মামলা ঘিরে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। সবখানেই এই মামলা ঘিরে আলোচনা। মামলা দুটি সাধারণ মানুষ প্রহসনের হাস্যকর মামলা হিসেবে নিয়েছে। আর এই সময় আপনি (বিচারক) এই মামলা পরিচালনা করছেন। এর আগে আপনি বিডিআর মামলায় রায় দিয়েছেন। যেখানে আপনি ২৬৫ জন আসামিকে খালাস দিয়েছেন। একটি চ্যানেলে টকশোতে দেখলাম যে, এক ব্যক্তি তাকে আপনার (বিচারক) ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলছেন, বিচারক ড. আখতারুজ্জামানকে পৃথিবী দিয়েও কেনা যাবে না। তখন আমি তাকে ফোন করে বলতে চেয়েছিলাম, কেনা যাবে না, কিন্তু তিনি কি দেশে থাকতে পারবেন?
তিনি আরো বলেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থেকে যদি বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়েল ট্রাস্ট করতে পারেন এবং তা যদি অপরাধ না হয়, তাহলে খালেদা জিয়া করলে অপরাধ হবে কেন? প্রধানমন্ত্রীর কি ব্যক্তিগত জীবন নেই? পাবলিক সারভেন্ট কী, তা দুদকের প্রসিকিউটর জানেন না? দুদকের প্রসিকিউটর বলেছেন যে, শতভাগ মামলা প্রমাণ করতে পেরেছেন। আমরা বলব, তারা একভাগও প্রমাণ করতে পারে নাই।
এরপর তিনি যুক্তি উপস্থাপন মুলতবি চাইলে বিচারক তা মঞ্জুর করেন। মামলাটিতে বুধবারও যুক্তি উপস্থাপনের দিন ধার্য আছে।
এদিকে একই আদালতে বিচারাধীন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাটি আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের জন্য ধার্য রয়েছে। ওই মামলায় ৬ আসামির মধ্যে খালেদা জিয়াসহ দুজনের যাবজ্জীবন এবং বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ চারজনের ৭ বছরের কারাদণ্ড দাবি করেছে দুদক।
এদিকে খালেদা জিয়ার আদালতে আসাকে কেন্দ্র করে সিনিয়র নেতারা আদালতে হাজির হন। তাদের মধ্যে ছিলেন- মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা আব্বাস, আমান উল্লাহ আমান, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, জয়নুল আবেদীন ফারুক, শিমুল বিশ্বাস, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রমুখ।
আইনজীবীদের মধ্যে ছিলেন- আব্দুর রেজ্জাক খান, জমির উদ্দিন সরকার, এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন, নিতাই রায় চৌধুরী, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, সানাউল্লাহ মিয়া, জাকির হোসেন ভূঁইয়া, হেলাল উদ্দিন, নুরুজ্জামান তপন, হান্নান ভূঁইয়া, জিয়া উদ্দিন জিয়া প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ৮ আগস্ট খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাটি দায়ের করে দুদক। এ মামলায় ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক।
মামলাটিতে বিএনপি নেতা সচিব হারিছ চৌধুরী এবং তার তৎকালীন একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান আসামি।
মামলাটিতে খালেদা জিয়াসহ অপর আসামিদের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তৎকালীন বিচারক বাসুদেব রায় অভিযোগ গঠন করেন।

