নিজস্ব প্রতিবেদক : ছোটবেলা থেকেই মে দিবসের কথা জেনেছি, কিন্তু বড় হয়ে আর মে দিবসের কোনও অস্তিত্ব নিজের জীবনে পাইনি এবং সেটা নিয়ে কোনও আক্ষেপ নেই। কারণ, আমি জানি, চিকিৎসা কোনও সাধারণ পেশা নয়, একে বলা হয় মহৎ পেশা। তাই কখনই মনে হয় না মে দিবস মানেই ছুটির দিন, বলছিলেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার দেওয়ান সাবরিনা মাসুক।
সাবরিনা আরও বলেন, মেডিক্যাল কলেজের পড়াশোনা শেষ করে যখন ইন্টার্নশিপে ঢুকেছি তখন থেকেই পহেলা মে-তে হাসপাতালে এসেছি, রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছি। মাথায় কখনোই আসেনি আজ মে দিবস, আজ ছুটির দিন। ছুটির দিন ভাবা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, মে দিবসের বৈচিত্র্য আমাদের কাছে নেই। চিকিৎসকদের জায়গা কখনও ফাঁকা রাখা যায় না, একজন চিকিৎসক ডিউটিতে না থাকলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে—এ বিষয়টি আমাদের মাথায় গেঁথে গিয়েছে। যার কারণে কখনোই মনে হয় না, মে দিবস মানেই ছুটির দিন।
১লা মে মহান মে দিবস। শ্রমিকে অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে পৃথিবীর দেশে দেশে মে দিবস পালিত হয়ে আসছে। আজ পৃথিবীর ৬০টি দেশে দিনটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ ছুটি থাকলেও জনস্বার্থমূলক বিশেষায়িত পেশায় কর্মরত যারা যেমন চিকিৎসক, পুলিশ, নিরাপত্তা কর্মী, সাংবাদিক তাদের ২৪ ঘণ্টাই দায়িত্ব পালন করতে হয় বলে এই দিনে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয় পালাক্রমে। অর্থাৎ পুরো অফিসের সব কর্মীর একসঙ্গে মে দিবসের ছুটি উপভোগ করা সম্ভব হয় না, আসলে বছরের কোনও সাধারণ ছুটিই তারা একসঙ্গে পান না, একটি অংশকে দায়িত্বে রেখে অবশিষ্টরা ছুটি কাটান। তাই এসব পেশার প্রায় বেশিরভাগ কর্মীকেই এদিনও অফিসে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
এদিকে, ‘শ্রম পরিস্থিতি-২০১৬: শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ লেবার ইন্সটিটিউট (বিলস) জানিয়েছে, হাসপাতালের শ্রমিকদের ৭২ শতাংশ সরকারি ছুটিতে কাজ করেন আর ২২ শতাংশের নেই সাপ্তাহিক ছুটি। আবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পরিবহন শ্রমিকদের ৯০ শতাংশ, সরকারি ছুটির দিনে ৯৮ শতাংশ। এছাড়াও মে দিবসের ছুটি পান না মোটের ওপর ৮৪ শতাংশ শ্রমিক।হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নিরাপত্তাকর্মী, পরিবহনকর্মী, হোটেল/রেস্তোরাঁ শ্রমিক এবং রি-রোলিং মিলের শ্রমিকদের ওপরে এই গবেষণা পরিচালনা করে বিলস।
এদিকে, মে দিবসেও ব্যক্তিগত গাড়িচালকদের ছুটির অবসর নেই। তেমনি একজন গাড়িচালক আজিজ আহমেদ বলেন, ‘আমার মালিক যেহেতু এই ছুটির দিনে ঘুরতে যান ফলে আমার ছুটি থাকে না। গাড়ি নিয়ে বের হতে হয়।’
ছুটি প্রসঙ্গে তিনি আরও জানান, ‘এক ঈদে ছুটি পাই, সাপ্তাহিক কোনও ছুটি নfই। কোনওদিন স্যার বা ম্যাডাম বাইরে না গেলে সেইদিন ছুটি পাই, তাও হঠাৎ হঠাৎ।’
মে দিবসে ছুটি না পাওয়া নিয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাংবাদিক বলেন, ‘ছুটি না দিয়ে মন্তব্য দিয়ে কী হবে, মে দিবসে শ্রমিকদের ছুটি না থাকা নিয়ে আমরা নিউজ করবো, তাহলে আমার মে দিবস কোথায়?’
এদিকে, বিমানবন্দরে যারা নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন তারাও বছরের অন্য দিনের মতোই পহেলা মেতে কাজ করে যান। ‘২৪ ঘণ্টার সার্ভিস, তাই চিন্তা করার সুযোগ নেই আজ মে দিবস কিনা,’ শুক্রবার বলছিলেন, বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার তানজিনা আক্তার।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এক স্যার কয়েকদিন আগে এক বক্তব্যে বলেছিলেন, মানুষ যখন ঈদের নামাজ পড়েন তখন আমরা ডিউটিতে থাকি, যেন বাকিরা নামাজ পড়ে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন।স্যারের কথা স্মরণ করেই বলতে চাই, পুরো পৃথিবীতে এমন অনেক দিন আছে যেদিন সবাই ছুটি পেলেও আমাদের ছুটি নেই। মে দিবস সারাবিশ্বেই পালন করা হয়, মানুষ ছুটি পায়।কিন্তু আমাদের এ ধরনের কোনও সুযোগ নেই। বছরের বাকি ৩৬৪ দিনের মতোই মে দিবসও একটি কর্মদিবস আমাদের জীবনে।’
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তানভীর আহমেদ বলেন, ‘আমাদের পেশাটাই এমন যে হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিত থাকতে হয়। বন্ধের দিনে লিমিটেড সার্ভিস হলেও কাউকে না কাউকে হাসপাতালে যেতেই হবে, কারণ আমাদের জব ইর্মারজেন্সি সার্ভিস হিসেবেই বিবেচিত। তবে মন খারাপ করে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর যখন কোনও রোগী হেসে কথা বলে তখন মন ভালো হয়ে যায়-এটাই সার্থকতা।’
সরকারের এসেনসিয়াল সার্ভিসের মধ্যে পুলিশ, চিকিৎসক এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য কোনও কর্মঘণ্টা বেঁধে দেওয়া নেই। এই তিন পেশার মানুষকে যেকোনও সময় প্রস্তুত থাকতে হয় জনসাধারণকে সেবা দেওয়ার জন্য, মে দিবসও তার ব্যতিক্রম নয় বলেন, মেট্রোপলিটন পুলিশের রামপুরা ট্রাফিক জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. জাহাঙ্গীর আলম।
তিনি বলেন, আগামীকাল কোনও দুর্ঘটনা ঘটবে না সে কথা কেউ বলতে পারে না, হয়তো অন্যদিনের চেয়ে ব্যস্ততা একটু কম থাকবে। কিন্তু, কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে পুলিশ এবং সাংবাদিকরাই ঘটনাস্থলে যাবে, তারপর দুর্ঘটনায় আহতদের পাঠাবে চিকিৎসকদের কাছে। সুতরাং আমাদের কোনও ছুটি নেই। তিনি বলেন, সরকারি কাজের জন্য পরিবারকে সময় দিতে না পারায় সাময়িক খারাপ লাগলেও দেশের জন্য কাজ করায় তা পরে প্রশমিত হয়ে যায়।

