নিজস্ব প্রতিবেদক : শতভাগ পরিবেশ রক্ষার নিশ্চয়তার বিধান রেখেই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।
শুক্রবার আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রাক্তন পরিবেশমন্ত্রী হাছান মাহমুদ।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে গত ২৪ আগস্ট বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে যেসব অভিযোগ করেছেন, শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে তার জবাব দেয় আওয়ামী লীগ।
সংবাদ সম্মেলনে হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপির শাসনামলে ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত কয়লা খনি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত জনগণের ওপর গুলি চালিয়ে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছিল। এ ছাড়া ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলনরত ১৮ জনকে হত্যা করা হয়।
তিনি দাবি করেন, বিএনপি-জামাত জোট তাদের শাসনামলে (২০০১-২০০৬) ১ মেগাওয়াটও বিদ্যুৎ দিতে পারেনি। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতে ২১ হাজার কোটি টাকা খরচের নামে লোপাট করেছে। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ছাড়ার সময় তখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে সে সক্ষমতা কমে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে নেমেছিল। ২০০৯ সালের শুরুতে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। ৭ বছরের পথচলায় শেখ হাসিনার নিরলস পরিশ্রমের ফলে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। ২০০৯ সালে দেশের মাত্র ৪৭ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পেত। বর্তমানে দেশের প্রায় ৭৮ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে। ইনশাআল্লাহ, আগামী দুই বছরের মধ্যে সরকার শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে পারবে।
হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপি আন্দোলনের নামে, দিনের পর দিন অবৈধ হরতাল-অবরোধের নামে পেট্রোল বোমা দিয়ে মানুষ হত্যা করেছে। তাদের নৃশংসতা থেকে জীবজন্তু এমনকি গাছপালাও রেহাই পায়নি। অন্য কোনো ইস্যু না পেয়ে বিএনপি এখন অন্যের ইস্যুকে হাইজ্যাক করে রাজনীতিতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। বিএনপির এখন পরগাছার দল। পরগাছা যেমন অন্য গাছের ওপর নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে, বিএনপিও কোনো ইস্যু না পেয়ে অন্যের ইস্যু নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, ‘বেগম জিয়া মেট্রিক পাশ করতে না পারলেও উনি অত্যন্ত বিশেষজ্ঞের মতো রামপাল নিয়ে অসত্য, মনগড়া ও ভুল তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবন হতে ১৪ কিলোমিটার দূরে এবং ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এ প্রকল্পে কোনো কৃষি জমি অধিগৃহীত হয়নি, কোনো বসতবাড়ি উচ্ছেদের প্রয়োজন হয়নি।’
হাছান মাহমুদ আরো বলেন, ‘খালেদা জিয়া ফ্লাই অ্যাশের কথা বলেছেন, অথচ এ প্রকল্পের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ ফ্লাই অ্যাশ ইলেক্ট্রো স্ট্যাটিক প্রিসিপিটেটরের (ইএসপি) মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা অ্যাশ হপার হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এগুলো স্থানীয় সিমেন্ট এবং সিরামিক কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। সর্বাধুনিক পদ্ধতি এফজিডি ব্যবহারের মাধ্যমে ৯৬ শতাংশ সালফার-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং লো নক্স বার্নারের মাধ্যমে নাইট্রোজেন গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
পশুর নদীর পানি দূষিত হবে বলে বেগম জিয়া দাবি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে শুষ্ক মৌসুমে কেবলমাত্র ০.০৫ ভাগ হারে নদীর পানি ব্যবহৃত হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্লোজ সার্কিট কুলিং ওয়াটার থাকবে। ফলে পানি পরিশোধিত করে আবার নদীতে ফেরত পাঠানো হবে।’
তিনি জানান, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফ্লু গ্যাস টেম্পারেচার, নাইট্রোজেন, সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি পর্যবেক্ষণের জন্য রিয়েল টাইম কন্টিনিউয়াস এমিশন মনিটরিং সিস্টেম থাকবে।
হাছান মাহমুদ বলেন, ‘খালেদা জিয়া প্রকল্পের বাতাসের কারণে পরিবেশ বিনষ্ট হবে বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ২৭৫ মিটার উচ্চতার চিমনি ব্যবহার করা হবে, যা ৯০ তলা ভবনের চেয়ে বেশি উচ্চতার। তা ছাড়া প্রকল্পের বাতাস ৯ মাসই সুন্দরবনের বিপরীতে প্রবাহিত হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে শব্দদূষণ হবে না। কারণ, এ ধরনের আধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২০০ মিটার দূর থেকেই শব্দ শোনা যায় না। সেখানে ১৪ কিলোমিটার দূরে শব্দ যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই।’
কয়লা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কয়লা পানিতে পড়বে এবং তা থেকে পানি এবং পরিবেশের ক্ষতি হবে বলে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। প্রকৃতপক্ষে মাদার ভেসেল থেকে ঢাকনাযুক্ত লাইটার জাহাজে করে রামপালে কয়লা আনা হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে কয়লা নেওয়ার জন্য ঢাকনাযুক্ত বেল্ট ব্যবহার করা হবে।
হাছান মাহমুদ জানান, রামপাল প্রকল্প এলাকা ঘিরে ১০০ মিটার প্রশস্ত সবুজ বেষ্টনী গড়তে ইতিমধ্যে ৯ হাজার ৫০০ গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ সংখ্যা ৫ লাখে উন্নীত করা হবে।
তিনি বলেন, ‘বেগম জিয়া বলেছেন, পৃথিবীর কোথাও নাকি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় না। আসলে এটি বেগম জিয়ার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। যারা বেগম জিয়াকে পরামর্শ দেন, তাদের অনুরোধ করব, দয়া করে একটু পড়াশুনা করুন। বিশ্বে গড়ে ৪১ ভাগ বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপাদিত হয়। আমাদের দেশে যেখানে শতকরা ২ ভাগ বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপন্ন হয়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র মোট উৎপাদনের ৪৯ দশমিক ১ ভাগ, চীন ৭৮ দশমিক ৯ ভাগ, দক্ষিণ আফ্রিকা ৯৩ ভাগ, অস্ট্রেলিয়া ৭৮ ভাগ, জাপান ২৬.৮ ভাগ, ভারত ৬৮ ভাগ কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। বেগম জিয়ার আসলে জানা নেই যে, বর্তমানে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করেই কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। পৃথিবীর বিভিন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যেমন : জার্মানির হেলবর্ন হফেন প্রকল্প শহরের মধ্যে এবং নদীর তীরে, ভিয়েতনামের থং লং পাওয়ার প্রজেক্ট ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য হা লং বের ৬ কিলোমিটারের মধ্যে, মালয়েশিয়ার জিমাহ পাওয়ার প্রজেক্ট ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট লাগোয়া নির্মিত হচ্ছে। তাই বিএনপি চেয়ারপারসন আপনার প্রতি অনুরোধ, ভুল তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে দেশে গণ্ডগোল পাকানোর চেষ্টা করবেন না।
অতীতে দেশের মানুষ আপনাদের প্রতিরোধ করছে। এবারো যদি দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা করেন, তাহলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে আপনাদের প্রতিরোধ করবে ‘
রামপাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আপনারা দেশ নিয়ে, পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, ভালো কথা। কিন্তু কোনোকিছু নিয়ে বেশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভালো না। আপনাদের সুচিন্তিত পরামর্শ থাকলে সরকারকে বলুন। সরকার অবশ্যই আপনাদের মতামত ভেবে দেখবে। কিন্তু আপনাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাকে যেন কেউ দেশে গণ্ডগোল পাকানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে। যারা দেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে চায়, তাদেরকে সু্যোগ করে দেবেন না।’
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন- আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপ, ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, সদস্য আমিনুল ইসলাম, সুজিত রায় নন্দী প্রমুখ।

