
আওয়ামী লীগের নতুন অফিসের নকশা
নিজস্ব প্রতিবেদক : আওয়ামী লীগের নতুন অফিসের নকশাবহুতল ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বর্তমান স্থাপনা আগামী সপ্তাহ (১৭ জুলাই) থেকে ভাঙা শুরু হবে। এ লক্ষ্যে বর্তমান ভবনে অবস্থিত দলের ঢাকা মহানগরসহ সহযোগী সংগঠনের কার্যালয়গুলো স্থানান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দশতলা বিশিষ্ট নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হতে পারে বলে আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গত এপ্রিলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর ভবনে অবস্থিত দলের সব সহযোগী-অঙ্গ সংগঠনগুলোকে ৩০ মে’র মধ্যে অফিস সরানোর জন্য নির্দেশনা দেন। এর আলোকে দুই একটি সহযোগী সংগঠন অফিস ইতোমধ্যে স্থানান্তর করেছে। তবে সবাই না সরানোর কারণে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ রবিবার নতুন করে তাগাদা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে এক অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সহযোগী সংগঠনের নেতাদের উদ্দেশে আগামী ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে সব অফিস সরিয়ে নিতে নতুন করে নির্দেশ দেন তিনি। আগামী সপ্তাহে ভবনটি ভাঙার কাজ শুরু হবে বলেও এ সময় তিনি জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে আগামী ১৭ জুলাই বর্তমান স্থাপনা ভাঙা শুরু হবে। ভাঙার কাজ শেষ হলে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তারা নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু করে ২ বছরের মধ্যে শেষ করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।
অফিস স্থানান্তরের বিষয়ে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসনাত বলেন, তাদের অফিস সরানোর জন্য বলা হয়েছে। তারা আপাতত স্বল্প পরিসরে অফিসের কার্যক্রম চালিয়ে নিতে আশপাশে কোথাও জায়গা খুঁজছেন। সম্ভব হলে সহযোগী সংগঠনগুলো মিলে একটি জায়গা ঠিক করবেন। না হলে যার যার সুবিধামতো কোথাও অফিস নেবেন।
স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ জানান, আগামী ১৭ জুলাই এ ভবন ভাঙার কাজ শুরু হবে। আমরা এর আগে সুবিধাজনক কোথাও অফিস শিফট করব। যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদও একই কথা বলেন। তিনি জানান, সংগঠনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলাপ করে আমরা শিগগিরই অফিস স্থানান্তর করব।
এদিকে সহযোগী সংগঠনের মধ্যে যুব মহিলা লীগ ইতোমধ্যে তাদের অফিস স্থানান্তর করে ফেলেছে বলে নিশ্চিত করেছেন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপিকা অপু উকিল বলেন, আমরা বর্তমানে ধানমন্ডির দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় অফিস স্থানান্তর করে সেখানে বসে কার্যক্রম চালাচ্ছি। মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পিনু খানম বলেন, তাদের অভ্যন্তরীণ বৈঠকগুলো আগে থেকেই ধানমণ্ডির কার্যালয় বসে চালাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে তাদের আলমারিসহ যেসব জিনিসপত্র রয়েছে, সেগুলো তারা ভাঙা শুরুর আগেই সরিয়ে ফেলবেন।
যেসব সুবিধা থাকবে নতুন ভবনে
ঐতিহাসিক ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে অবস্থিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভেঙে সেখানে গড়ে তোলা হবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন বহুতল ভবন। ১০তলা এ ভবনে থাকবে ৬-৭তলা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কার্যালয়। থাকবে কনফারেন্স হল,সেমিনার রুম, ডিজিটাল লাইব্রেরি, ভিআইপি লাউঞ্জ, ক্যান্টিন ও সাংবাদিক লাউঞ্জ। থাকবে ডরমেটরি। আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের জন্য বেশ পরিসরে পৃথক কক্ষ ও সঙ্গে বেলকনি থাকছে বলে জানা গেছে। পুরো কার্যালয়টি করা হবে ওয়াইফাই জোন। দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৬ এপ্রিল নতুন কার্যালয়ের নতুন ভবনের নকশা অনুমোদন দিয়েছেন। ভবনটির নির্মাণের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে।
নতুন ভবনের সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, তারা দৃষ্টিনন্দন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত দলীয় কার্যালয় নির্মাণ করতে যাচ্ছেন। এর জন্য নকশাও ইতোমধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আধুনিক দশ তলা এই কার্যালয়ে বড় কনফারেন্স হলসহ লাইব্রেরি,সাংবাদিক লাউঞ্জ ও আইটি বিভাগ থাকবে বলেও তিনি জানান।
জানা গেছে, কোনও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ না দিয়ে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ভবনটি নির্মাণ করা হবে। কোনও ধরনের অনুদান না নিয়ে সম্পূর্ণ দলের ফান্ডে ভবন নির্মাণ করা হবে।
আওয়ামী লীগের পুরনো অফিস ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর চারতলা ভবনটি গত ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে লিজ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেটা সেই সময় শেষ করা যায়নি। পরে বর্তমান সরকারের আগের মেয়াদে ওই লিজ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আওয়ামী লীগ। পাশে আরও কিছু জায়গাও দলীয় ফান্ড থেকে ক্রয় করা হয়েছে। লিজ ও জমি ক্রয় প্রক্রিয়া শেষ হলে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকারি দল। পরে নকশা প্রস্তুত ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমোদনের পর এখন বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছেন তারা।
যেভাবে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আ. লীগ
বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আসার আগ পর্যন্ত স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী ৬৬ বছরের প্রাচীন দল আওয়ামী লীগকে অফিস বদল করতে হয়েছে বারবার। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আওয়ামী লীগের অফিস স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার। পুরান ঢাকার কে এম দাশ লেনের রোজ গার্ডেনে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠার পর পালাক্রমে নেতৃস্থানীয় নেতাদের বাসায় বসে দল পরিচালনার নীতি-কর্মসূচি গ্রহণ করা হতো। কোনও অফিস ছিল না। তবে ১৯৫৩ সাল থেকে ৯ কানকুন বাড়ি লেনে অস্থায়ী একটি অফিস ব্যবহার করা হতো। ১৯৫৬ সালে পুরান ঢাকার ৫৬ সিমসন রোডে দলের অফিস স্থাপন করা হয়। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার পর এর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৯১,নবাবপুর রোডে দলের অফিস নেন। এর কিছুদিন পর অস্থায়ীভাবে সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলের গলিতে কিছু দিন বসেন নেতারা। পরে পুরানা পল্টনে দু’টি স্থানে দীর্ঘদিন দলের অফিস ছিল। স্বাধীনতা-উত্তর ১২২,সার্কিট হাউস রোডে কিছুদিনের জন্য আওয়ামী লীগের অফিস ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আবারও পুরান ঢাকার নবাবপুরে অফিস স্থানান্তরিত হয়। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের হাল ধরার পর ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর বর্তমান অফিসটি ভাড়া নেওয়া হয়। এ ভবনের দোতলায় তখন রেস্টুরেন্ট ছিল। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর ওই রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দিয়ে সেখানে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ও আরেক পাশে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় অফিস করা হয়। ভবনটিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় শুধু নয়,স্বেচ্ছসেবক লীগ, আওয়ামী যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় অফিস রয়েছে।

