নিজস্ব প্রতিবেদক : সোমবার ভোর ঠিক ৫টা ৫ মিনিটে অনুভূত ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি বা আসবাবপত্রে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও রাজধানীতে একজনসহ সারাদেশে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্য দুজনের একজন রাজশাহীর এবং একজন লালমনিরহাটের। তিনজনের মৃত্যুই ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে হার্ট অ্যাটাকে।
সোমবার ভোরে ভূমিকম্পে একযোগে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও ভুটান। এ ঘটনায় হুড়োহুড়ি করে বাসা-বাড়ি, ছাত্র হোস্টেল থেকে বের হতে গিয়ে সারাদেশে আহত হয়েছেন প্রায় শতাধিক। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালেই ভর্তি হয়েছেন ৪০।
সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে অসুস্থ হয়ে রাজধানীর জুরাইনে আতিকুর রহমান (২৫) নামে এক যুবক মারা গেছেন। ভূমিকম্পের সময় ভয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত ঢামেকে আনা হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আতিকুর রহমান ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ম্যানেজমেন্টের শেষবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি কুষ্টিয়ার মিরপুরের মঈনুদ্দিনের ছেলে। থাকতেন রাজধানীর জুরাইনের একটি মেস বাসায়।
ঠিক একই কারণে রাজশাহীতেও মারা গেছেন একজন। রাজশাহী প্রতিনিধি জানান, ভূমিকম্প আতঙ্কে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রধান বাবুর্চি খলিলুর রহমান (৬০) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তিনি পরিবার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মেহেরচণ্ডী এলাকায় থাকতেন। তার গ্রামের বাসা কুমিল্লা জেলায়। ভূমিকম্পের সময় তিনি মেহেরচণ্ডীর বাসা থেকে ভয়ে বাইরে চলে আসেন। বাইরে আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
লালমনিরহাটের পাটগ্রামেও নূর ইসলাম কদু (৫০) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত নূর ইসলাম পাটগ্রাম উপজেলার ঘোনাবাড়ী কদুর বাজার এলাকার মৃত নজর উদ্দিনের ছেলে নূর ইসলাম কদু। তিনি ভূমিকম্পের সময় ঘুম থেকে উঠে আতঙ্কে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। এ সময় তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
এদিকে ঢামেক সূত্র জানা গেছে, ঢামেকে ভর্তি হওয়া আহতদের মধ্যে অন্তত ১৮ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী। এরমধ্যে বেশিরভাগই হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে এবং ভবন থেকে লাফিয়ে আহত হয়েছেন। ঢাবির জহুরুল হক হলের চতুর্থ তলা থেকে লাফিয়ে গুরুতর আহত ইকবাল নামের এক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়াও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
ভূমিকম্পে সিলেট নগরীতে একটি ভবনের সীমানা প্রাচীর ধসে একই পরিবারের চারজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়াও নগরীর বিভিন্ন বাসা থেকে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে আরো ২৮ জন আহত হয়েছেন বলে সিলেট প্রতিনিধি জানিয়েছেন।
সিলেটে ১০ তলা ভবনের সীমানা প্রাচীর ধসে পড়ে একই পরিবারের চারজন আহত হন। আহতরা হলেন, ফরিদুল ইসলাম, সাজেদুল ইসলাম, শিল্পী বেগম ও রোকসানা আক্তার। তাদের সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ওসমানী হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক দেবাশীষ সিনহা জানিয়েছেন, নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ভূমিকম্পে আহত ৩২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ভোরে ভূমিকম্পের পর শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে আসতে শুরু করেন স্থানীয়রা। তাদের সবাই হুড়োহুড়ি করে ভবন থেকে নিচে নামতে গিয়ে গিয়ে আহত হয়েছেন বলে জানান চিকিৎসক দেবাশীষ। আহতদের বেশিরভাগই পড়ে গিয়ে বা পদদলন হয়েছেন।
ভূমিকম্পে ভবন ধসের তেমন কোনো খবর পাওয়া না গেলেও রাজধানীর বংশালে একটি ছয়তলা ভবন হেলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে এবং শাঁখারীবাজারের একটি বাসায় ফাটল দেখা দিয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী উপ-পরিচালক আবদুল হালিম জানান, বংশালে দুটি ভবনের মাঝে চার ইঞ্চির মতো ফাঁকা ছিল। ভূমিকম্পের ফলে একটি অংশ পাশের ভবনে লেগে গেছে। তবে এতে বড় কোনো ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে না। তবে তারপরও তাদের প্রকৌশলীরা এসে পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন বলেও জানান।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (জলবায়ু) আব্দুর রহমান বলেন, ‘ভারতের মণিপুরে এ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল। আর রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৭।’ তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, ভূমিকম্পের মাত্র ছিল ৬ দশমিক ৮। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভারত-মিয়ানমারের সীমান্ত জেলা মণিপুরের ইম্ফলে। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ছিল ৩৫১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে।
প্রাথমিক খবরে ভূমিকম্পের সময় ইম্ফলে একজনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন আরো ৫০ জনের বেশি মানুষ। ধসে যাওয়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে পড়ে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। এছাড়া ইম্ফলের একটি জনপ্রিয় মার্কেটসহ বেশ কিছু ভবনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ভূমিকম্পের পর সেখানকার বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

