
নিহত মো.নুরুল আমিন
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : রাজনীতির সাথে জড়িত না থাকলেও সাতকানিয়ায় আওয়ামী লীগের দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের দুপক্ষের সংঘর্ষে গুলিতে নুরুল আমিন (৪৫) নামে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুর পর তাকে ‘নিজেদের নেতা’ দাবি করলেও মৃত্যুর তিন দিনেও পরিবারে পাশে নেই বিএনপি। আর এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হলে তিন দিনেও আটক নেই কোনো আসামি।
শুক্রবার গভীর রাতে নিহতের স্ত্রী কামরুন নাহার বাদী হয়ে এজহার নামীয় ৯ জনসহ অজ্ঞাত আরো ১৫/২০ জনকে আসামি করে সাতকানিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিয়ষটি নিশ্চিত করে সাতকানিয়া থানার ওসি মাহমুদুল হাই বলেন, ‘নিহত নুরুল আমিনের স্ত্রী কামরুন নাহার বাদী হয়ে ৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ১৫/২০ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। তবে এখনো পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।’ আসামিদের নাম প্রকাশ না করলেও তাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে।
এদিকে ভোটের দিন গুলিতে নুরুল আমিন নিহত হওয়ার পরপরই তাকে নিজেদের নেতা দাবি করে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিলেও মৃত্যুর তার পরিবারের পাশে নেই বিএনপি। বিএনপি চেয়াপার্সনের উপদেষ্ঠা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, দলের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আকবর খোন্দকার, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি শেখ মহিউদ্দিন নিহত নুরুল আমিনকে নিজ দলের নেতা দাবি করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তবে কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত না হলেও তার স্বামীকে নিয়ে বিএনপির রাজনীতি নিয়ে অসন্তুষ্ট নুরুল আমিনের স্ত্রী কামরুন নাহার।
জানতে চাইলে সাতকানিয়ার বাসিন্দা ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি অধ্যাপক শেখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘নিহত নুরুল আমিন বিএনপি নেতা না হলেও একনিষ্ট কর্মী। শুধু সে নয়, তার পুরো পরিবারই আমাদের দলের কর্মী সমর্থক। কেন্দ্রিয় নোতারা শিগগিরই তার বাড়িতে যাবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। তবে এখনো আমরা কেউ যাইনি।’
এদিকে পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি রাজনীতির নোংরা খেলার বলি হয়ে নিহত হওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্ধকার দেখছেন নিহতের স্ত্রী কামরুন্নাহার। তিনি এখন চিন্তিত কীভাবে চার ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ভরণ-পোষণ চালাবেন এই ভেবে। বিএনপির কোনো পর্যায়ের নেতা নিহত নুরুল আমিনের পরিবারের কাছে না গেলেও স্থানীয় সরকার দলীয় সাংসদ ড. আবু রেজা নদভী, নব নির্বাচিত পৌর মেয়র মোহাম্মদ জোবায়ের, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তার পরিবারের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও একাধিক মামলার আসামি জিয়াউর রহমানের গুলিতেই নিহত হন ব্যবসায়ী নুরুল আমিন। সে মোজাম্মেল হক নামে এক কাউন্সিলর প্রার্থীর ভাই। তার বিরুদ্ধে সাতকানিয়া থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। মোজাম্মেল তার ভাই স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত।
নিহত নুরুল আমিন সাতকানিয়া উপজেলার গোয়াজর পাড়া এলাকার আবদুর রহিমের ছেলে। তার রয়েছে এক ছেলে ও তিন মেয়ে। এরা হচ্ছে- মোহাম্মদ সাকিব, জেসিকা, তাসি ও তানিসা।
নিহত নুরুল আমিনের স্ত্রী কামরুন্নাহার কবলেছেন, ‘আমার সব কিছু শেষ। আমার এ সংসার কে দেখাশুনা করবে। কে চালাবে আমার ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার খরচ। কে জোগাবে অন্ন। আমার একটা মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। আর কয়েক বছর পর বিয়ে দিতে হবে। এখন আমার কী হবে।’ তিনি তার স্বামীর হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
এদিকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সাতকানিয়ার গোয়াজর পাড়া ও আশেকের পাড়া এলাকায় সন্ত্রীদের মধ্যে জিয়াউর রহমান, মাঈনুদ্দিন, এমরান, রাসেল ও রিদোয়ানসহ আরও কয়েক সন্ত্রাসী রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্র। আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মোজাম্মেল হক ভোলার সমর্থকরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আরেক আওয়ামী সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল হালিমের সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। ভোটের দিন সাতকানিয়া কলেজ হোস্টেলের দক্ষিণ পাশ দিয়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী এসে অপর দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প ও সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়।
এ সময় নুরুল আমিনকে খুব কাছ থেকে গুলি করেন কাউন্সিলর প্রার্থী মোজাম্মেল হক ভোলার বড় ভাই জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের গুলি নুরুল আমিনের বুকের সামনে দিয়ে ঢুকে পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। এতে তিনি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মোজাম্মেল হকের সমর্থকদের গুলিতেই নুরুল আমিন নিহত হন বলে স্বীকার করেছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) কাজী আবদুল আওয়াল। তিনি বলেন, এঘটনায় যাদের আসামি করা হয়েছে তারা সকলেই মোজাম্মেলের পরিবারের লোকজন ও সমর্থক এবংয় তারা সকলেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।

