নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘আপনাদের আস্থাই আমাদের অনুপ্রেরণা’ এই শ্লোগানকে ধারণ করে বাংলাদেশ রেলওয়েতে পূর্বের তুলনায় অনেকটাই গতি ফিরে এসেছে বলে দাবি করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। তারা বলেছে, বর্তমান সময়ে রেলওয়েকে সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ, পরিবেশ বান্ধব এবং সাশ্রয়ী গণপরিবহন হিসেবে পরিণত করতে ২০১১ সালের ৪ ডিসেম্বর সরকার স্বতন্ত্র রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করে।
গত মহাজোট সরকারের মেয়াদেই মোট ১৮,৩১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৮টি নতুন প্রকল্প এবং ৫,৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। যা স্বাধীনতার পর রেলওয়ের জন্য সর্বাধিক ব্যয়বরাদ্দ। রেল কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলেছেন, রেলওয়ের প্রতি অবহেলা ও প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ না করার কারণেই রেললাইন এবং রোলিং স্টক কোড ও ম্যানুয়াল অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব না হওয়ায় সেবার মান বাড়ানো যায় নি।
রেল বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী কাঙ্খিত সেবা দিতে হলে রেলওয়ের অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও রোলিং স্টক প্রয়োজন অনুযায়ী আরও অনেক সংগ্রহ করতে হবে। বিশেষ করে রাজস্ব বাজেটে রেল লাইন ও রোলিং স্টকের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
যাত্রী সুবিধা বৃদ্ধি, রেল লাইন, সেতু, স্টেশন বিল্ডিং, ওয়ার্কসপ, লোকোমোটিভ, যাত্রীবাহী কোচ এবং পণ্যবাহী ওয়াগনসহ যাবতীয় স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে মাত্র ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে। অথচ সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ গুণ বরাদ্দ প্রয়োজন।
অবশ্য বর্তমান সরকার ক্রমান্বয়ে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। রেলওয়ের উন্নয়ন বরাদ্দও গত ৫ অর্থ বছরে পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হয়েছে। রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ২০০৮-০৯ সালে বরাদ্দ ছিল ৫১২.৭৫ কোটি টাকা, ২০১৩-১৪ সালে বরাদ্দ হয়েছে ৩৬১১ কোটি টাকা। এ অবস্থা উত্তরোত্তর আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করছে রেল কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক ও রেল বিশেষজ্ঞ মো. আবু তাহের বলেন, ‘বর্তমান সরকার শুরু থেকেই রেলওয়ে সেক্টরে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করে রেলপথ সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে এডিবি, জাইকা, ইডিসিএফ (দক্ষিণ কোরিয়া) ও ভারতসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাসমূহের সহযোগিতায় রেলওয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করার ফলে রেলওয়ের গতি ফিরে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী সরকারে যারাই আসবেন তারা যদি উন্নয়নের এ ধারাকে অব্যাহত রাখেন এবং সড়ক, নৌ ও বিমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রেলওয়ের ভাড়া প্রতিবছর কমপক্ষে ৫% বৃদ্ধি করা, প্রয়োজনীয় অর্থ বিনিয়োগ করা, প্রয়োজনীয় রেল লাইন সম্প্রসারণ করা, রেল কোচ ও মালবাহী ওয়াগন সংগ্রহ করা হয় তাহলে আমি নিশ্চিত যে, রেলওয়েতে যাত্রী সংখ্যা আরও অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে।’
২০১১-১২ অর্থ বছরে রেলওয়ের সর্বমোট আয় ও ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৬০৩ কোটি এবং ১৫৬৭ কোটি টাকা। আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ৯৬৩ কোটি টাকা।
২০১২ সালের ১ অক্টোবর ভাড়া বৃদ্ধির ফলে প্রতি বছরে প্রায় ২৮০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় হচ্ছে। তারপরেও প্রায় ৬৮৪ কোটি টাকার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের অপর এক কর্মকর্তা জানান, অর্থ বরাদ্দ আর বেশি বেশি প্রকল্প গ্রহণ করলেই রেলের উন্নয়ন হবে না। এ জন্য রেলওয়ের কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা, নিষ্টা ও সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। রেল কর্মকর্তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা না থাকলে রেলের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তবে রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, ‘বিগত বিএনপি সরকারের আমলে রেলকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। কোনো পরিকল্পনাও নেয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেলকে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেলকে গুরুত্ব দেন। তারই নির্দেশনায় রেলকে গণমুখী করতে বর্তমান সরকারের সময়ে ৪৮টি প্রকল্প আমরা হাতে নিয়েছি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রেলের এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘রেলওয়ে মূলত সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। রেল যোগাযোগের মাধ্যমে জনগণকে সেবা দেয়াই আমাদের লক্ষ্য।’
রেলওয়ের সাফল্যের বিবরণ অনেক যা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করেন মন্ত্রী। এই সাফল্য জনগণের কাছে তুলে ধরতেই এখন থেকে প্রতি বছর রেল মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করা হবে বলে মন্ত্রী জানান। তারই অংশ হিসেবে আগামী ৪ ডিসেম্বর (শুক্রবার) রেলপথ মন্ত্রণালয়ে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এ দিনকে ‘ফোকাস’ করে ব্যানার, ফেস্টুন দিয়ে রেলভনকে বর্ণিল সাজে সজ্জিত করা হবে। এ লক্ষ্যে রেল ভবনকে ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। এছাড়া ওইদিন সকালে কমলাপুর রেলস্টেশনে রেলওয়ের সেবা সপ্তাহ পালন, বিকেল ৩টায় কেক কাটা, আলোচনা সভা, অতিথি আপ্যায়ন, স্মরণিকা প্রকাশ, ব্যানার, সাজ-সজ্জার কর্মসুচি নেয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যেই এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে সচিব থেকে শুরু করে রেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে রেল ভবনে এখন সাজ সাজ রব পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
জানা গেছে, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ ২০১১ সালে ৪ঠা ডিসেম্বর এস আর নং৩৬১- আইন/২০১১ মূলে রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করে। সে অনুযায়ী আগামী ৪ ডিসেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয় ৪র্থ বছর পূর্ণ করে ৫ম বছরে পদার্পণ করবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে গৃহীত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে রয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফিরোজ সালাউদ্দীন, অতিরিক্ত সচিব শশী কুমার সিংহ, কমল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন।
এছাড়া আরও ৫টি উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব উপ-কমিটির মধ্যে রয়েছে ১. অতিথিদের তালিকা প্রণয়ন, আমন্ত্রণপত্র তৈরি ও বিতরণ কমিটি, ২. অনুষ্ঠান পরিচালনা কমিটি, ৩. আপ্যায়ণ কমিটি, ৪. ব্রশিউর, ব্যানার ও সাজ-সজ্জা কমিটি এবং ৫. মিডিয়া ও প্রচার কমিটি।
এসব কমিটিতে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ( প্রশাসন), যুগ্ম সচিব (ভূমি), যুগ্ম সচিব ( উন্নয়ন), যুগ্ম সচিব (আইন), উপসচিব (প্রশাসন), উপ-সচিব (অডিট), অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এমএন্ডসিপি) সিনিয়র সহকারী সচিব (প্রশাসন-২), সিনিয়র সহকারী সচিব (প্রশাসন-১), পরিচালক (প্রকৌশল), পরিচালক (সংস্থাপন), যুগ্ম পরিচালক (অপারেশন), সিনিয়র তথ্য অফিসার ও মহাপরিচালকের একান্ত সচিবকে রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার রেল ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, এসব কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর নানা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অফিস সময়ের বাইরেও তাদের অতিরিক্ত কাজ করতে দেখা গেছে।

