নিজস্ব প্রতিবেদক : একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকরের প্রতিবাদে দেশব্যাপী জামায়াতের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চললেও জনজীবন অনেকটাই স্বাভাবিক। তবে সকাল থেকে রাজধানীর সড়কগুলোতে অন্যদিনের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা কিছুটা কম।
নাশকতার আশঙ্কায় কঠোর অবস্থানে রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এখনও পর্যন্ত কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সংবাদ না এলেও আতঙ্কে আছেন সাধারণ মানুষ।
গত শনিবার মধ্যরাতে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের পর হরতালসহ দুই দিনের কর্মসূচির ডাক দেয় জামায়াত। এরমধ্যে রোববার গায়েবানা জানাজা ও দোয়া কর্মসূচিও পালন করে তারা।
কুয়াশার কারণে সোমবার ভোর থেকে যান চলাচল কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মমুখি মানুষ ঘর ছেড়েছেন, বেরিয়েছেন রাস্তায়। হরতালে কেউ জানিয়েছেন আতঙ্কের কথা, কেউ বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।
হরতাল ডেকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা উধাও হলেও রাজপথে রয়েছে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা। হরতালবিরোধী মিছিল করতে দেখা গেছে নগরীর বিভিন্ন স্থানে।
সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রেসক্লাব, গাবতলী, মিরপুর, কল্যাণপুর, শ্যামলী এসব জায়গায় হরতাল সমর্থনে পিকেটিং করতে দেখা যায়নি। তবে এসব এলাকার মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়েছে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা। হরতালের বিপক্ষে স্লোগান দিয়েছেন অনেকে।
তবে হরতাল নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক। অনেকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, হরতালে দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকেই। অফিসে যেতে কষ্ট হয়। তা ছাড়া একধরনের আতঙ্ক তো থাকেই। তারা চান না কোনো রাজনৈতিক দল আর হরতাল দিক।
আসাদগেটে কথা হয় সুমন ব্যাপারীর সাথে, যিনি সেখানে হরতালবিরোধী আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। সুমন বলেন, ‘হরতাল বলতে কিছু নেই। যানচলাচল স্বাভাবিক। সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে।’
এদিকে হরতালে রাস্তায় যানবাহন তুলনামূলক কম থাকায় গাড়ি পেতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে অফিসগামী যাত্রীদের। নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।
একই এলাকায় কথা হয় অফিসগামী শামীমের সাথে। তিনি যাবেন যাত্রাবাড়ি। বলেন, ‘মানুষ ভয়ে বাসা থেকে বের হচ্ছে না। গাড়ি চলছে। কিন্তু গাড়িতে উঠলে ভয় লাগছে। কারণ পূর্বের অভিজ্ঞতা আছে যে জামায়াতের হরতালে পেট্রোল বোমা ছোড়া হয়। এমন হরতাল না দেয়াই ভালো।’
হরতালকে কেন্দ্র করে রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ, বিজিবি। সকাল থেকেই বিভিন্ন স্থানে পুলিশ, র্যাবের ভ্যান টহল দিতে দেখা গেছে।
খামারবাড়ি মোড়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা জানান, ভোর ৪টা থেকে সেখানে অবস্থান করছেন তারা। তবে হরতাল সমর্থনে কাউকে দেখেননি। কিন্তু হরতালবিরোধী ১৫-২০টি মোটরসাইকেল দেখেছেন তারা।
আসাদগেটে এডিসিএল বাসের কাউন্টার ম্যানেজার জীবন চৌধুরী বলেন, ‘কোম্পানির গাড়ি চলছে কিন্তু যাত্রী নেই। আতঙ্কের কারণে যাত্রীরা বাইরে আসছে না। প্রতিদিনের চেয়ে টিকিট বিক্রি হচ্ছে কম।’
হরতালে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় যাদের দিনের আয়ে দিন চলে। শ্রমজীবী মানুষ তাই হরতাল চান না।
রিকশাচালক মোমিন। আড়ং থেকে ফার্মগেট, মিরপুর রুটে চলে তার রিকশা। তিনি বলেন, ‘হরতালে যাত্রী নেই। হরতাল দিলেই আমাদের জন্য সমস্যা হয়। যাত্রী থাকে না। ইনকাম হয় না। ইনকাম না থাকলে খামু কী।’
নগরীর প্রতিটি মোড়ে পুলিশ সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। বিজিবিও রয়েছে নিরাপত্তার দায়িত্বে। যে কোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে থাকলেও আতঙ্ক দূর হচ্ছে না সাধারণ মানুষের মন থেকে। তারা বলছেন, অতীতের দিনগুলোর মতো ‘নৈরাজ্যকর’ হরতাল হয়ত নেই, তবে আতঙ্ক আছে।

