কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : জেলার ফুলবাড়ী উপজেলা সদরে অবস্থিত বিলুপ্ত দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের বাসিন্দা জয়নাল আবেদিনের (৪৫) পরিবারে এখন বিচ্ছেদের সুর। ভারতে যাওয়ার দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে তার পরিবারে কান্নার রোল। এতদিন চাপা কান্না থাকলেও এখন তা যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।
বিচ্ছেদের বেদনায় সবাই ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন। জয়নাল তার পরিবারের বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও চার সন্তানকে ছেড়ে (বাংলাদেশ) একাই ভারতে যাচ্ছেন। আগামী মঙ্গলবার (২৪ নভেম্বর) দাসিয়ারছড়া থেকে ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণকারী ৩০ পরিবারের ১৫০ জনের সঙ্গে জয়নাল ভারতে যাবেন।
যৌথ গণনায় জয়নালের পরিবারের সবাই বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়ার জন্য রাজি না হলেও জয়নাল একাই ভারতে যাওয়ার অপশন দেন। পরিবারের সবার ধারণা ছিল কিছুদিন গেলে স্ত্রী সন্তান,মা এবং ভিটার টানে জয়নাল তার মত পরিবর্তন করবেন। কিন্তু পরিবারসহ পাড়া প্রতিবেশীর অনুরোধ, মা ও সন্তানের প্রতি ভালোবাসা তার মনে সামান্য করুণার উদ্রেক করেনি। বরং তার মতামতের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় পরিবারের সকলকে পথে বসাতে বাস্তভিটার শেষ আশ্রয় টুকুও বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছেন জয়নাল। দাসিয়ারছড়ার বোর্ডেরহাট এলাকার চেয়ারম্যানটারীতে জয়নালের বাড়ি।
সরেজমিনে জয়নালের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়,বাড়ির দক্ষিণের ঘরের দরজায় মাথায় হাত দিয়ে মা জামেলা বেওয়া(৬৭) কাঁদছেন। পাশে বসে বিষন্ন মনে মাথা নিচু করে আছেন স্ত্রী আকলিমা বেগম(৪০)। এ সময় গঙ্গারহাট মোহাম্মদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ইয়াছমিন ও ছোট মেয়ে ছিট চন্দ্রখানা ব্র্যাক স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী জেনিফা আক্তার (৯) বাড়িতে ফেরে। জয়নালের কথা জানতে চাওয়ায় ভয়ে ও শঙ্কায় সবাই চুপ হয়ে যান।
এক পর্যায়ে মা জামেলা কাঁদতে শুরু করলে একে একে সবাই ডুকরে কাঁদা শুরু করেন। তাদের কান্নার শব্দে প্রতিবেশীরা এসে জমা হন। ভিড় বাড়ে। প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দেন। কিন্তু কোনো সান্ত্বনাতেই কান্না থামেনা। এক সময় জামেলা বেওয়া কান্না জরিত কণ্ঠে বলেন, ‘মোর একেটা (একটি) ব্যাটা, উইয়াক(ওকে) ভারত যাবার দিব্যার (দিব) নং (না)। মোর বুকের ধন। উয়ায় গেইলে (গেলে) মুই কাক (কাকে) নিয়া বাঁচিম (বাঁচবো) বাহে।’
স্ত্রী আকলিমা বেগম বলেন,‘জীবনটা এটি (এখানে) শ্যাষ (শেষ) করলং। এ্যালা (এখন) হামরা (আমরা) ক্যা (কেন) ভারত যামো (যাব)। এ্যাটে হামরা বেটির (মেয়ের) বিয়া দিছি, সাগাই সোদর (আত্মীয়স্বজন) সবায় (সব) কাচোত (কাছে)। ওমাক (জয়নালকে) বাংলাদেশে থাকার ব্যবস্থা করি দেও (দেন)।
ছোট মেয়ে জেনিফা বলেন,‘সবার বাবা থাকবে। আমার বাবা থাকবেনা। এখন থেকেও নেই। কষ্টে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। স্কুলে সবার বাবা যাবে আমার বাবা যাবেনা। ভাবতে খুব খারাপ লাগে। বাবাকে এখানে থাকতে বলছি, কিন্তু থাকবেন না।’
প্রতিবেশী আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভারতে যাচ্ছি। কিন্তু জয়নাল তার মা, স্ত্রী ও সন্তান ফেলে যাচ্ছে। এটা অমানবিক। তাকে ও তার স্ত্রীকে বোঝানো হয়েছে। কেউই বোঝার চেষ্টা করেনা। পরে কষ্ট পাবে।’
জয়নালের চাচা আবেদ আলী (৭০) বলেন, ‘ভাইসতাক(ভাতিজা) বুজাবার(বোঝাতে)পাইরলং( পারলাম) না বাহে। উয়ার পরিবার দুই দ্যাশত (দেশে) ভাগ হয়া (হচ্ছে) যাবার নাইগছে, হামারও আমরা কষ্ট হবার নাইগছে।’
চাচী সুফিয়া বেগম ও খোতেজা বেগম বলেন,‘কদ্দিন এক সঙ্গে থাকলং। মাও, বউ-ছোয়াক থুইয়া জয়নালই বা থাকবে ক্যামন করি?’
এদিকে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ১৩ শতক ভিটেমাটির মধ্যে ছিটমহলের প্রাক জরিপে নিজ নামে পাওয়া ৯ শতক জমি বিক্রি করতে তোরজোড় শুরু করেছেন জয়নাল।
পরিবার ছেড়ে ভারতে যাওয়ার প্রসঙ্গে জয়নাল বলেন,‘আমি ভারতের ছিটের নাগরিক। সুযোগ পেয়েছি তাই ভারত যাবো। কোটি টাকা দিলেও আমি বাংলাদেশে থাকবো না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এদেশে থাকলে তার কোনো উন্নতি হবেনা। ভারতে গেলে কাজ মিলবে।’
জমি বিক্রি করলে স্ত্রী-সন্তানরা থাকবে কোথায়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘আমার কিছু করার নেই। তাদের বলেছি আমার সঙ্গে যেতে। তারা যাবেনা। যেখানে ইচ্ছে সেখানে থাকবে।’
এ বিষয়ে ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন মাহমুদ বলেন,‘ প্রত্যেক নাগরিকের নিজস্ব স্বাধীনতা আছে। অনেকে দেশে থাকা বা না থাকার ব্যাপারে অপশন চেঞ্জ করার জন্য আবেদন করেছে। তার সিদ্ধান্ত নেবে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।’
উল্লেখ্য, গত ৩১ জুলাই মধ্যরাতে কুড়িগ্রামের অভ্যন্তরে ১২টিসহ দুই দেশের ১৬২টি ছিটমহল স্বাধীন ভূ-খণ্ডের পায়। এর আগে গত ৬-১৬ জুলাই ছিটমহলগুলোতে বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ গণনা এবং নাগরিকত্ব নির্ধারণে মতামত গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে দাশিয়ারছড়ার ২৮১ জন এবং ভূরুঙ্গামারীর ২৪ জনসহ ৩০৫ জন ভারতের নাগরিকত্বের অপশন দেয়।
অন্যদিকে ১২টি ছিটমহলের ৭ হাজার ৮২৭ জন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। ট্রাভেল পাস গ্রহণ করার পর গত অক্টোবর মাসে দাসিয়ারছড়ার প্রথমে ৫৬ জন ও পরে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ৩১ জন নাগরিক তাদের মত পাল্টিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগ করে দেশে(বাংলাদেশে) থাকতে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বাংলাদেশস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার বরাবর আবেদন করেন। নির্দেশনা রয়েছে কাউকে ভারতে যেতে বাধ্য করা হবে না। এ অর্থে ভারতের ট্রাভেল পাসধারীরা যেতে না চাইলে বাংলাদেশে থেকে যেতে পারবেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত ১৯৭৪ সালের সীমান্ত চুক্তি এবং ২০১১ সালের এ সংক্রান্ত প্রটোকল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার আলোকে ভারতীয় নাগরিকত্ব বহাল রাখার পক্ষে ছিটমহলবাসীকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত সীমান্ত চেকপোস্ট অতিক্রম করে ভারতে যেতে হবে।
বাংলাদেশের ভিতরে ১১১টি ছিটমহলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে ভারত যেতে নিবন্ধন করেন ৯৭৯ জন। অপরদিকে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশি ৫১টি ছিটমহলের প্রায় ১৪ হাজার নাগরিকের কেউই বাংলাদেশে আসতে আগ্রহ দেখাননি।

