ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি :পরপর দুই মেয়াদে টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্বে। গাছাড়া ভাব, উদাসীনতা আর নিষ্ক্রিয়তার কারণে ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগ ও চারটি সহযোগী ও একটি ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে।
দলীয় গঠনতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নেতাদের পদ আঁকড়ে থাকার প্রবণতার কারণে অনেক আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া কমিটি দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই চলছে এসব সংগঠন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পর পর এসব সংগঠনের সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও কোনো মনোযোগ নেই সেদিকে নেতাকর্মীদের।
বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিতে ব্যস্ত থাকায় বিতর্কিত কাজে জড়াচ্ছেন জেলার শীর্ষ ও মধ্যম সারির বেশ কিছু নেতা। টেন্ডার, চাঁদাবাজি ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ উঠছে কতিপয় নেতার বিরুদ্ধে। কবে নাগাদ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া কমিটি পুনর্গঠন করা হবে কিংবা আদৌ নতুন কমিটি গঠন হবে কিনা তা অনিশ্চিত।
দীর্ঘদিন ধরে চারটি সহযোগী ও একটি ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে ঠাকুরগাঁওয়ে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক কর্মকান্ড। সহযোগী সংগঠন জেলা মহিলা আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের তিন মাসের আহ্বায়ক কমিটি ইতোমধ্যে পার করেছে নয় বছর। আর যুবলীগ, কৃষক লীগ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন শ্রমিক লীগের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে সাত বছর আগে।
এ দিকে গেল বছরের অক্টোবরে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন করা হলেও এখনও পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি দায়িত্বশীল নেতারা। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ আর কোন্দলে অনেকটাই বিপর্যস্ত ও দুর্বলও হয়ে পড়েছে একাধিক সংগঠন। নির্ধারিত মেয়াদান্তে নিয়মিত সম্মেলন ও কমিটি গঠন এবং কার্যক্রম না থাকায় সাধারণ নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন।
অন্যদিকে, পরপর দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কারণে নেতাদের মধ্যে নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে। নেতৃত্বে গাছাড়া ভাব আর উদাসীনতার কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে কয়েকটি সংগঠনের কার্যক্রম। এর ওপর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতার পরিচয়ে অনেকেই চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাসসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ায় সংগঠন গোছানো কিংবা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাদের মনও নেই। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অপকর্মের অভিযোগ সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে অনেকাংশেই। এরপরও এসবে মূল দলের তেমন নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ চোখে পড়ছে না।
তবে তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করছেন, পদ আঁকড়ে ধরে থাকা নেতাদের কারণেই কমিটি পুনর্গঠন করা হচ্ছে না। তাদের কারণেই নতুন নেতারা পদ পাচ্ছে না। এতে নতুন নেতৃত্ব তৈরি নিয়েও সঙ্কট দেখা যাচ্ছে।
দলীয় সূত্রমতে, ২০০৬ সালে মো. কামরুজ্জামানকে আহ্বায়ক ও জাবেদ শিকদারকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ২১ সদস্যের জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটি গঠন করা হয়। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আহ্বায়ক কমিটি পৌর ও উপজেলা কমিটি পুনর্গঠন করে তিনমাসের মধ্যে সম্মেলন করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়ার কথা। কিন্তু আহ্বায়ক কমিটি নয় বছরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বর্ধিত সভা নিয়ে দুটি পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েন স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা। পরে দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি মামলা হয়। এখন সদর উপজেলা ও পৌরসভায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুটি কমিটি আছে। এ কারণে জেলা পর্যায়ে সংগঠনটির কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাবেদ শিকদার অভিযোগ করে বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হলে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয়। বর্তমান কমিটি নয় বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও কেন্দ্রীয় কমিটির কাছ থেকে মেয়াদ বাড়িয়ে নেননি জেলা আহ্বায়ক। ফলে এ কমিটি অবৈধ।
তবে আহ্বায়ক মো. কামরুজ্জামান বলেন, জেলার প্রতিটি উপজেলায় সংগঠনটির কমিটি আছে। তবে এখন সম্মেলন করা প্রয়োজন।
২০০৬ সালে দ্রৌপদী আগরওয়ালাকে আহ্বায়ক করে জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়। পরে সম্মেলন করে নতুন কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তাস্তরের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। পৌর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহনাজ আকতার বলেন, দীর্ঘদিন আহ্বায়ক কমিটির হাতে দায়িত্ব থাকায় সংগঠনের কর্মকাণ্ড মুখ থুবড়ে পড়েছে।
যুবলীগ রাজপথে কিছুটা আলোচনায় থাকলেও সক্রিয় হওয়ার বদলে তাদের বিরুদ্ধেও পদ-পদবি, তদবির ও টেন্ডারবাজির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
২০০৬ সালের দিকে ঠাকুরগাঁও জেলা যুবলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বর্তমান সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অরুনাংশু দত্ত টিটোকে সভাপতি আর আব্দুল মজিজ আপেলকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে জেলা যুবলীগের আর সম্মেলন হয়নি। বর্তমানে সভাপতির পদ শূন্য রয়েছে। জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ আপেল জানান, ঠাকুরগাঁওয়ের যুবলীগই একমাত্র রাজপথের লড়াকু সৈনিক। কেন্দ্রীয় যুবলীগ চাইলে শিগগিরই জেলা যুবলীগের সম্মেলন করা হবে।
২০০৫ সালে জেলা কৃষক লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়। এতে মো. সাইফুল্লাহ সভাপতি ও আলাউদ্দিন সরকার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আলাউদ্দিন সরকার বলেন, জেলা কৃষকলীগের কার্যক্রম স্থবির— এ কথা বলা ঠিক হবে না। তৃণমূলের সম্মেলন শেষ করে শিগগিরই জেলার সম্মেলন করা হবে।
জেলা শ্রমিক লীগের সম্মেলন কত সালে অনুষ্ঠিত হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেন নি সংগঠনের সভাপতি মো. খায়রুল ইসলাম। তিনি বলেন, জেলা কমিটির সম্মেলনটি ২০০৪ বা ২০০৫ সালে হয়েছিল। সে সম্মেলনে তিনি সভাপতি ও আনোয়ারুল হক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। খায়রুল আরও বলেন, কেন্দ্র এত দিন সম্মেলন করতে বলেনি। আর তারাও সম্মেলন করার প্রয়োজন মনে করেননি। কেন্দ্র চাইলে নতুন কমিটি করা হবে।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দবিরুল ইসলাম এমপি বলেন, দলের তৃণমূল সম্মেলনগুলোর পাশাপাশি সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোরও সম্মেলন দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেবেন তারা। এর মধ্য দিয়ে দলের পাশাপাশি সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোকেও শক্তিশালী করা যাবে বলে মনে করেন তিনি।

