নিজস্ব প্রতিবেদক : বিদেশে অর্থ পাচারের ঘটনা এখন নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালেও পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নিয়মিত তৎপরতা নেই। কয়েকটি বিশেষ মামলায় বেশ উদ্যোগী দেখা গেলেও তাদের সামগ্রিক তৎপরতায় দেখা দিয়েছে ধীরগতি। অভিযোগ ওঠেছে সংস্থাটির ক্ষমতা ও কার্যপরিধি অনুপাতে এ ক্ষেত্রে তাদের পদক্ষেপ খুবই নগন্য। যদিও দুদক এর জন্য দায়ী করেছে আইনী ঝামেলাকে।
জিএফআই নামক একটি আন্তজার্তিক সংস্থার জরিপ অনুযায়ী-২০১১ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয় ৪ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। ২০১২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৭৩২ কোটি টাকায়। আর চলতি বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক তদন্তে শুধু ১২টি সংশ্লিষ্টাতায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে।
এ সব টাকা পাচারের সঙ্গে জড়িত আছেন দেশের রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী। কিন্তু এসব তথ্য-উপাত্তের বিপরীতে বিভিন্ন সময়ে কিছু মামলা ও চার্জশিট দেয়া হলেও টাকার ফেরত আনার পক্রিয়াটি চলছে কচ্ছপ গতিতে। ২০০৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাচারকৃত টাকা ফেরত আনতে মাত্র ৩৩টি মিউচুয়্যাল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠিয়েছে দুদক। আর এর মধ্যে শুধু একজনের পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছে দেশের দুর্নীতি দমনের কাজে নিয়োজিত এই সংস্থাটি।
রাষ্ট্রপতিকে দেয়া দুদকের বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৪ তে দেখা যায়, ২০১৪ সালে ২২৬টি অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০১৩ সালে ১৮২টি অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করে তারা। আর ২০১২ সালে ১১০টি এবং ২০১১ সালে ৭৯টি অভিযোগে অনুসন্ধান চালায় সংস্থাটি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ২০১২ সালে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ১৭৮ কোটি ডলার বা ১৩ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা অবৈধ পথে বিভিন্ন দেশে চলে গেছে। আর ২০১১ সালে পাচার হয় অন্তত ৬০ কোটি ডলার, যা টাকার অঙ্কে চার হাজার ৬৩০ কোটি। একইভাবে ২০১০ সালে পাচার হয়েছে ৬৭ কোটি ২০ লাখ ডলার, আর ২০০৯ সালে পাচার হয়েছে ১০৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বরে জিএফআই এর ‘ইলিসিট ফাইন্যান্সিয়াল ফ্লোজ ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি বিশ্বব্যাপী প্রকাশ করা হয়।
এছাড়া জিএফআই এর নতুন প্রাক্কলন অনুসারে এক দশকে অর্থাৎ ২০০৩-২০১২ বাংলাদেশ থেকে অন্তত এক হাজার ৩১৬ কোটি ডলার বা এক লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। তার মানে এই সময়কালে গড়ে প্রতিবছর পাচার হয়েছে ১৩১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এই দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে ২০০৬ সালে, যার পরিমাণ ২৬৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার। টাকার অঙ্কে ২০ হাজার ৫৭৬ কোটি। তারপর ২০০৭ সালে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ২৪৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা ১৮ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
অপরে দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক তদন্তে চলতি বছরেই ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনার সঙ্গে ১২টি ব্যাংকের সম্পৃক্ততা পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাচার করা এসব টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কয়েকটি ব্যাংককে নির্দেশও দেয়া হয়েছে। আমদানিমূল্য পরিশোধের পরও পণ্য দেশে না এনে, রফতানির মূল্য বিদেশে রেখে দিয়ে এবং বিদেশে বিভিন্ন ভুয়া কাজের অজুহাতে তহবিল স্থানান্তরের মাধ্যমে এসব টাকা পাচার হয়েছে। একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ ব্যাংক কর্মকর্তার সহায়তায় ব্যবসায়ী নামধারী একটি সংঘবদ্ধ চক্র এসব টাকা পাচার করছে বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ দুদকের তফসিলভুক্ত হওয়ায় মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব হচ্ছে দুদকের। আর মানিলন্ডারিংয়ের প্রথম অর্থেই বলা আছে ‘অর্থ বা সম্পত্তি পাচার’। অর্থ পাচারের অভিযোগের সপক্ষে তথ্য-প্রমাণের জন্য দুদক বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের ওপর নির্ভরশীল। তবে দুদকের সংশোধিত আইন-২০১৩ অনুযায়ী যে কোনো প্রতিষ্ঠান যে কোনো ধরনের তথ্য দুদককে দিতে বাধ্য। তবুও এই সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে অর্থ পাচারের অনেক অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব হয় না বলে জানা গেছে।
এ ছাড়াও বিশ্বব্যাপী অর্থপাচার কমাতে ইউনাইটেড ন্যাশনস কনভেনশন এ্যাগইনস্ট করাপশন (আনকাক) এর সদস্য হিসেবে ২০০৮ সালে স্বাক্ষর করে দুদক। আর সেই সুবাদে অন্য দেশ থেকে পাচারকৃত টাকা ফেরত আনা বা অর্থজালিয়াতি সংক্রান্ত তথ্য জানতে মিউচুয়্যাল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠাতে পারে দুদক। কিন্তু দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের পর থেকে এর পর্যন্ত পাচারকৃত টাকা ফেরত আনতে মোট ৩৩টি এমএলএআর পাঠিয়েছে সংস্থাটি। এই ৩৩টির মধ্যে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর পাচারকৃত টাকা ফেরত আনতে পেরেছে দুদক। এ ৩৩টির এমএলএআরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাঠানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, এরপর মালয়শিয়া এবং সুইজারল্যান্ডসহ ১৪টি দেশে। বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে এসব এমএলএআর পাঠানো হয়।
বিভিন্ন সময়ে যাদের অর্থপাচার সংক্রান্ত তথ্য জানতে এমএলএআর পাঠানো হয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- সাবেক আইনমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা, বিএনপির নেতা আলী আসগার লবী এবং তারেক রহমানকে বেকসুর খালাসের আদেশ দেয়া সদ্য অবসরে প্রাপ্ত বিচারক মোতাহার হোসেন।
তবে টাকার পাচারের ব্যাপারে কোনো ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অভিযোগ না পাওয়ায় কোনো পদক্ষেপ নেয়া যায় না বলে জানান দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জমান। তিনি বলেন, ‘টাকা পাচার সংক্রান্ত অনেক খবর ও প্রতিবেদন দেখি। কিন্তু কোথায়ও স্পষ্টভাবে কে বা কারা অর্থপাচার করছে সেগুলো বলা হয়না। যার ফলে আমরা অনুসন্ধান কাজও চালাতে পারি না।’
তিনি এমএলএআর পাঠানোর ধীর গতি সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা যে কয়টি ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাই কেবল তাদের ব্যাপারে জানতেই এমএলএআর পাঠাই। তবে এই এমএলএআর পাঠানোর পক্রিয়ায় আমাদের দেশে জুডিশিয়াল পক্রিয়ায় খুব ঝামেলা আছে। প্রথমে কোর্ট থেকে অনুমতি চাওয়ার জন্য রায় দিতে হয়। রায় দিলে তবে আমরা অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে এমএলএআর পাঠাই। এসবের কারণেই এমএলএআর পাঠাতে অনেক সময় লাগে। তাই এ প্রক্রিয়ায় টাকা ফেরত আনতে দেরি হয়।’
এক প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমরা কোকোর পাচারকৃত টাকা ফেরত আনতেই সক্ষম হয়েছি। তাছাড়া আর কারও টাকা ফেরত আনা যায় নি। তবে এ পর্যন্ত ৩৩টি এমএলএআর পাঠানো হয়েছে। আমরা তো এমএলএআর পাঠাই কিন্তু কোর্টে গিয়ে আটকে যায়। তাহলে আমরা কি করবো। তবে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই আসুক না কেন, দ্রুত ব্যাবস্থা নেয়া হবে।’
এদিকে গত ১১ জুন রাষ্ট্রপতিকে দেয়া দুদকের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়- ২০১২ সালে কমিশন ৬৮টি নতুন এবং ৩৪টি অনিষ্পন্ন অনুসন্ধানের কাজ করে। এর মধ্যে ২৯টি তদন্তের কাজ সম্পন্ন হয়, যার মধ্যে ২৫টিতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০১২ সালে কমিশন প্রাপ্ত অভিযোগের ২৮ দশমিক ৪ শতাংশের তদন্ত শেষ করতে সমর্থ হয়। একইভাবে ২০১১ সালে কমিশন ৯টি অভিযোগের তদন্ত সম্পন্ন করে এবং আদালতে আটটি অভিযোগপত্র দাখিল করে। সে বছর ২২ শতাংশ অভিযোগের তদন্ত শেষ করতে সমর্থ হয় কমিশন। ২০১৩ সালে কমিশন অর্থ পাচারের ৪৭টি মামলা তদন্ত করে ৩৯টিতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। সে বছর মোট অভিযোগের ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ তদন্ত করতে সমর্থ হয় সংস্থাটি।
আর ২০১৪ সালে কমিশন অর্থ পাচারের ৮৯টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করে। এসব অভিযোগের মধ্যে ২০টিতে মামলা করা হয়। আগের বছরের ১৩৭টি অনুসন্ধান অনিষ্পন্ন ছিল। গত বছর দুদক নিষ্পন্ন করেছে ৬০টি অনুসন্ধান। আগের বছরের অনিষ্পন্ন অনুসন্ধানসহ বছর শেষে কমিশনের মোট অনুসন্ধানের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২৬। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ৪০টি অভিযোগ নথিভুক্তির সুপারিশ করা হয়।

