খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি : ভোর থেকেই আকাশে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। বিদ্যালয়ের ঈদের ছুটিও এখনো শেষ হয়নি। তাই স্কুল পাড়ায় তেমন কোনো ভিড় নেই। সকাল ৯টার থেকে হঠাৎ বিদ্যালয়ের সামনে রিকশা, অটোরিকশা থেকে কয়েকজন তরুণ-তরুণী নামতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে পাবলিক লাইব্রেরির মূলফটকে জটলা হয়ে গেল। হওয়ারই কথা। কারণ ওইদিন (২০ জুলাই) ছিল খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাতঃ শাখার ২০১১ সালের এসএসসি ব্যাচের পুনর্মিলনী।
সবার চোখে মুখে আনন্দের উচ্ছ্বাস। বিদ্যালয় ছেড়ে যাওয়ার পর অনেকের এটাই ছিল প্রথম সাক্ষাত প্রিয় সহপাঠীর সঙ্গে। উচ্চশিক্ষার জন্য অনেকে জেলা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন বিদ্যাপীঠে অধ্যায়ন করছে। ঈদের বন্ধে বাড়ি এসে কিংবা পুনর্মিলনীতে যোগ দিতে অনেকে এসেছে খাগড়াছড়িতে। যেই আসে তাকে একই প্রশ্ন করা হচ্ছে সবার কাছ থেকে,‘বন্ধু খবর কী বল’? কুশল বিনিময় পর্ব শেষে প্রিয় প্রাঙ্গণ খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ফটকে দাঁড়িয়ে ফটোসেশন। তারপর চাঁদের গাড়ি চেপে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের উদ্দেশে রওনা। গাড়ি সোজা নেমে গেল পর্যটন কেন্দ্রের ওয়াচ-টাওয়ারের সেখানে।
সবাই গিয়ে স্থান নিল ওয়াচ টাওয়ারের নিচের তলায়। বৃত্তাকার করে সবাই বসে শুরু করে দিল ঝম্পেশ আড্ডা। কেউ কেউ ব্যস্ত প্রিয় সহপাঠীকে নিয়ে ফটো সেশনে কিংবা সেলফি নিতে। দুপুরের খাবারের আগে সবাই চলে গেল আলুটিলার রহস্যময় সুড়ঙ্গে অ্যাডভেঞ্চারে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে দল বেঁধে একে একে সবাই প্রবেশ করল সুড়ঙ্গের রহস্য উন্মোচন করতে।
প্রায় আধা কিলোমিটারের সুড়ঙ্গ পথ অতিক্রম করে সবাই আবারও চলে গেল ওয়াচ-টাওয়ারের নিচতলায়। দুপুরের খাবারের পরপর শুরু হল মূল আনুষ্ঠানিকতার। ক্লাশের ফাঁকের আড্ডার মতো জমে উঠল আড্ডা। ছোট ছোট কাগজের টুকরোই ‘গান, আবৃত্তি, স্কুল জীবনের কোনো স্মৃতি সংক্ষেপে বলা,পছন্দের কাউকে মনের কথা বলা, কৌতুক বলা’ এর মতো পর্বের নাম লেখা ছিল। যার হাতে যেটা উঠেছে তাকে সেটা করতে হয়েছে। ফাঁকে ফাঁকে চলছে ছয় তারের (গিটার) সাথে গান।
পুনর্মিলনীতে অংশগ্রহণ করা একজন পাইপ্রেমা মার্মা। পড়ালেখা করে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পুনর্মিলনীর সর্ম্পকে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে সেই এককথায় বলেন, ‘শুধুমাত্র পুনর্মিলনী হবে শুনে আমি খাগড়াছড়িতে এসেছি। অনেক বছর পর বন্ধুদের একত্রিত হওয়ার কথা শুনে লোভ সামলাতে পারিনি।’
ইশরাত জাহান মীম নামে আরেকজন বলেন, ‘ঝড়-বৃষ্টি মাথা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছি। শুধুমাত্র পুনর্মিলনীর জন্য। অনেকের আসার ইচ্ছে ছিল কিন্তু নানা কারণে আসতে পারেনি।’ ভবিষ্যতে এমন প্রোগ্রাম করলে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে অনেকে।
যার একান্ত প্রচেষ্ঠায় এমন একটি অনুষ্ঠান হয়েছে সেই শংকর জয় ত্রিপুরা বলেন, ‘অনেকদিন পর স্বস্তিবোধ করছি। আনুমানিক চার মাস সময় ধরে অনুষ্ঠানটি করার জন্য পরিকল্পনা করে আসছিলাম। প্রথমে বৈসাবি উৎসবের সময় অনুষ্ঠানটি করতে চাইলেও অনেকের ছুটি না থাকায় তখন করা সম্ভব হয়নি। তাই ঈদের ছুটিতে করলাম। ভেবে ছিলাম অনেকে থাকবে কিন্তু পাইনি তাদের। তাই অনেক পাওয়ার মধ্যেও কিছুটা শূন্যতা ছিল।’
কীভাবে বন্ধুদের খবর দিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এক্ষেত্রে বেশি সহায়তা করেছে। ফেইসবুকে, মুঠোফোনে সবাইকে অনুষ্ঠান সর্ম্পকে জানানো হয়েছে। এছাড়া আমার বন্ধু আফনান রবির ভূমিকাও অনেক।’
সময় তার আপন গতিতে পুরিয়ে এলো। আড্ডার সমাপ্তির সময় হয়ে এলো, কিন্তু মনে তো তখনো অনেক কথা জমানো ছিল। সময় হলো না প্রিয় বন্ধুটাকে বলার। সন্ধ্যার আগে আগে সবাই ফিরে এলো খাগড়াছড়ি শহরে। শুরু হলো বিদায় পর্বের। একে একে সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেল এবং কথা রেখে গেল বন্ধু আবার দেখা হবে। ভালো থাকিছ!

