নিজস্ব প্রতিবেদক : আসন্ন কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে ঘিরে দেশব্যাপী চলমান কার্যক্রমে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে ছাত্রলীগে। জেলা-উপজেলা ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত সম্মেলনগুলোতে প্রতিনিয়তই সৃষ্টি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে কোথাও কোথাও মারামারি, ধস্তাধস্তি, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় নেতাদের আদেশ-নির্দেশও মানছে না। এতে চরম বিব্রত ও অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি।
সূত্র মতে, দুই বছর মেয়াদের কমিটি নিয়ে চার বছর পার করায় কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের ওপর অনেকটা ক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তারা মনে করছেন এই মুহূর্তে কোনো প্রকার আদেশ-নির্দেশ দেয়ার এখতিয়ার নেই কেন্দ্রীয় কমিটির। সংগঠনে সব ধরনের বিশৃঙ্খলা, চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া, নেতাকর্মীদের নৈতিক স্খলন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার দায় নিতে হবে অন্যায্যভাবে চার বছর কাটিয়ে দেয়া কেন্দ্রীয় কমিটিকেই।
এদিকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যকার এ ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা সামাল দিতে রীতিমত পেরেশানিতে আছেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম।
আগামী ২৫ ও ২৬ জুলাই অনুষ্ঠ্যেয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষে সারা দেশে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। চলছে সব জেলা-উপজেলা ও ইউনিট পর্যায়ের সম্মেলন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা-উপজেলায় অনুষ্ঠিত এসব সম্মেলনে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে অহরহ। বিশেষ করে প্রভাবশালী মন্ত্রীসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতেই সভা-সমাবেশে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। জুনিয়র নেতাকর্মীদের হাতে সিনিয়র নেতাদের লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটছে হরহামেশা। চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় এসব দ্বন্দ্ব-সংঘাত কোনোমতেই মেটাতে পারছে না কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিরা। যেহেতু তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীরা এখন কেন্দ্রীয় কমিটিকে মানছে না সেহেতু জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সংঘটিত ঘটনার কোনো দায়ভারও নিতে নারাজ কেন্দ্রীয় কমিটি।
এরপরও কেন্দ্রীয় সম্মেলন সর্বোতভাবে সফল করার লক্ষে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের দ্বন্দ্বগুলোকে আমলে নিয়ে খুব কৌশলে এগুচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ। কিছু বখে যাওয়া নেতাকর্মীকে নামকাওয়াস্তে বহিস্কার করেও সংগঠনের শৃঙ্খলা ফেরাতে বার বার হোঁচট খাচ্ছেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।
গত ৭ জুন কমিটি গঠন নিয়ে বান্দরবানে ছাত্রলীগের সম্মেলনে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হয়। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর প্রধান অতিথি হিসেবে ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনের উদ্বোধন করেন ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ। সম্মেলনের এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতা আহসানুল আলম রুমুর সমর্থকরা লাঠিসোটা নিয়ে সম্মেলনে হামলা চালায়। এ হামলার ঘটনায় সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়। মঞ্চ থেকে দ্রুত নামতে গিয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিও আহত হন।
এর আগের দিন ৬ জুন পূর্ব বিরোধের জের ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সংঘর্ষে ৭ জন আহত হয়।
গত ২৮ মে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সম্মেলনে আচরণে বিরক্ত হন প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ। এক পর্যায়ে তিনি স্লোগানে বিরক্ত হন। এ সময় তিনি বলেন, ‘স্লোগান দিলে আর বক্তব্য দেবো না। আমরাও তো ছাত্রলীগ করেছি। এরকম অবস্থা তো দেখিনি।’
গত ৩০ মে অনুষ্ঠিত হয় মহানগর দক্ষিণের সম্মেলন। এ সম্মেলনেও একই অবস্থায় পড়েন সম্মেলনের প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য ওবায়েদুল কাদের। তার শত নিষেধ ও অনুরোধ স্বত্ত্বেও একের পর এক স্লোগান দিতে থাকে কর্মীরা।
তিনি বলেন, ‘স্লোগান দিলে আমি বক্তৃতা দেব না। এই চেহারার ছাত্রলীগকে আমি দেখতে চাই না। এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল ছাত্রলীগ নয়। আর মঞ্চে এত নেতা থাকলে কর্মী কোথায়? এই ছবি ও চেহারার পরিবর্তন করতে হবে। স্টেজে চেহারা দেখিয়ে নেতা হওয়া যায় না।’
নেতাকর্মীদের ওপর চটে গিয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘যাদের গ্রুপের স্লোগান হবে তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হবে।’ এরপর কিছুক্ষণ চুপ থেকেই আবার শুরু হয় স্লোগানের ফুলঝুরি।
গত ২৬ মে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতিকে লাঞ্ছিত করে ওই শাখার উপ-প্রচার সম্পাদক আনিসুর রহমান শিশির। পরে তাকে সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বহিস্কার করে কেন্দ্রীয় কমিটি।
গত ৩১ মে রুবেল নামের এক শিক্ষার্থী হল সভাপতিকে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলে উঠলে কথিত ‘বড় ভাইদেরকে’ না জানানোয় তাকে বেদম পেটানো হয়। এর কিছুদিন আগে এক কর্মীকে পেটানোয় রুবেলকেও হল থেকে বের করে দেন জিয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু সালমান প্রধান শাওন। রুবেল আবারও হলে উঠলে শাওনই তার বিভাগের বড় ভাইদের দিয়ে রুবেলকে মারধর করে বলে জানা গেছে।
এদিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে ছাত্রলীগ আয়োজিত এক সমাবেশে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদসহ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা, ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন সাবেক প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বর্তমান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতেই দফায় দফায় হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বারবার মাইকে শান্ত হওয়ার ঘোষণা দিয়েও ব্যর্থ হন। ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘আপনারা বিশৃঙ্খলা করবেন না। আপনারা যদি বিশৃঙ্খলা বন্ধ না করেন তাহলে রাজনৈতিকভাবে ও সাংগঠনিকভাবে এর জবাব দেয়া হবে।’
একইভাবে গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হল, সূর্যসেন হলসহ কয়েকটি শাখাকে সতর্ক করা হয়। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দুই মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাসহ ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা বেশ বিব্রতকর অবস্থা পড়েন। একই অবস্থা হয় ঝালকাঠিতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন করতে গিয়ে ঝালকাঠি জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সেবারও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ একই সতর্কতা দেন ঝালকাঠির নেতাদের।
গত ১৩ এপ্রিল পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে পটুয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় সিনিয়র সহ-সভাপতি রিফাত হাসান সজিব ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক রতন চন্দ্র দাসের ওপর হামলা করে জুনিয়র কর্মীরা।
সংগঠনে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলার বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, ‘ছাত্রলীগ একটি বড় সংগঠন। এই সংগঠনের মধ্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঘটনা ঘটতেই পারে। তবে যা ঘটেছে তা আমাদের সামনে ঘটেনি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগের সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। এ সম্মেলন হবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। আমরা সাধ্যমতো আমাদের দায়িত্ব পালন করছি। কে আমাদের নেতৃত্ব মানলো আর না মানলো তা দেখার সময় এখন নেই।’
একই বিষয়ে জানতে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের কাছে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘ ছাত্রলীগ অনেক বড় ছাত্র সংগঠন, তাই এখানে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটতেই পারে। বিভিন্ন জেলা, থানা ও ওয়ার্ড থেকে নেতাকর্মীরা আসে, সবাই সবাইকে চেনেন না। তাই ছোটখাট এসব ঘটনা ঘটে। তাছাড়া সবকিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে এই কমিটির প্রতি আস্থার বিষয়টি একটু কম। তবে সম্মেলনের প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে।’

