স্পোর্টস ডেস্ক : দম্ভ আর অহমিকায় তাদের পা মাটিতে পড়তো না। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ করে যখনই কোয়ার্টার বাংলাদেশ বনাম ভারত নির্ধারিত হয়ে গেলো, তখনই ভারতজুড়ে তর্জন-গর্জন। এমনকি ভারতীয় দলের কোন কোন ক্রিকেটারও বলে দিয়েছিলেন, ‘আমরা তো এখন সেমিফাইনাল নিয়েই চিন্তা করছি। কোয়ার্টারে তো ওদেরকে (বাংলাদেশকে) এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেবো।’
সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোতে ঝড় উঠে গিয়েছিল। ‘মওকা মওকা’ দিয়ে চূড়ান্তভাবে অপমান করার চেষ্টা করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মেলবোর্নে জন্ম দিলো ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনাটির। সে থেকে ভেতরে ভেতরে যে বাংলাদেশ একটা সুপ্ত আগ্নেয়গিরি হয়েছিল, তা সম্ভবত টেরই পায়নি ভারতীয়রা।
যখন টের পেলো, তখন আর করার কিছু নেই। শুধু দেখে যাওয়া ছাড়া। মিরপুরে ১৯ জুনই সুপ্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ খুলে গিয়েছিল। জ্বলন্ত লাভার উদ্গিরণ শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন থেকেই। আর তাতেই জ্বলে-পুড়ে ছাই-ভস্ম হতে শুরু করে ধোনি অ্যান্ড কোং।
২১জুন দ্বিতীয় ওয়ানডেতে এসে ভারতীয়দের আরও নাকানি-চুবানি খাইয়ে ছাড়ল বাংলাদেশ। টস জিতে রানের পাহাড় গড়ার যে মানস, তা তো পূরণ হয়ইনি, বরং উল্টো মুস্তাফিজুর রহমানের স্লোয়ার আর কার্টারে দিগভ্রান্ত হয়ে ৪৫ ওভারে ২০০ রানেই অলআউট ভারত। বাংলাদেশ ৩৮ ওভার খেলেই জয়ের বন্দরে নোঙ্গর ফেলে।
বাংলাদেশের এই জয়কে ভারতীয় মিডিয়াগুলো যেমন গৌরব হিসেবে অভিহিত করছে, তেমনি ভারতীয় দলেরও কাঁটাছেঁড়া চলেছে কঠোরভাবে। একই সঙ্গে ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ধোনির নেতৃত্ব ছাড়ার যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তা নিয়েও বেশ ফলাও করে সংবাদ প্রকাশ করেছে মিডিয়াগুলো।
কলকতা থেকে প্রকাশিত বাংলা দৈনিক এবেলার খেলার পাতার শিরোনাম ‘পদ্মাপারে সূর্যাস্ত। ভেতরে সংবাদের দুটি শিরোনাম করেছে এভাবে, ‘ ভারতীয় ক্রিকেটের ঐতিহ্য ভুলুন্ঠিত মিরপুরের মাটিতে’, ‘ভারতীয় ক্রিকেটের গর্ব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে ইতিহাস বাংলাদেশের’। সংবাদটির উপ-শিরোনাম করা হয়েছে, মিরপুরে ফের মুস্তাফিজ আতঙ্ক। সংবাদের শুরুটাও চমকপ্রদ। পত্রিকাটির রিপোর্টার সুমিত ঘোষ লিখেছেন, ‘একটা টিম উড়ছে, লাফাচ্ছে, চেঁচাচ্ছে, টগবগ করছে। আরেকটা কেমন নুইয়ে পড়া, ন্যাতানো আর দিশাহীন। কোনো শরীরিভাষা নেই। আগাগোড়া সে রকমই থাকল।’
সংবাদের ভেতরে আরেক জায়গায় লিখা হলো, ‘ভারতকে প্রথমবারেরমত হারিয়ে ঐতিহাসিক ওয়ানডে সিরিজই শুধু জিতে নিল না বাংলাদেশ, ক্রিকেট পৃথিবীতে দুটো দলের এতদিনকার অবস্থানেও রূপান্তর ঘটিয়ে দিল বোধহয়। আর ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচে চোখ বুঝে কেউ বলে দিতে পারবে ধোনিরায়ই ফেভারিট? বিশেষ করে যদি মাশরাফি মোর্তজাদের দেশে সেই ম্যাচ হয়?’
ম্যাচের পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্টটির শেষে বলা হলো, ‘প্রথম ম্যাচে ধাক্কা-বিতর্কের পর ধোনিকে স্কুল বালকের মতো বুদ্ধু বানিয়ে আউট করে হাততালি দিয়ে উঠেছেন মুস্তাফিজুর রহমান। ভারতীয় মিডিয়াম পেসারের বাউন্সার নিয়ে উপহাস করছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান। দগদগে ক্ষত তৈরী করে ভারতীয় ক্রিকেটকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে যাওয়ার মতো দৃশ্য। যার যোগ্য জবাব দিতে হলে তিনটি জিনিস চাই- পুরুষ্কার, সঠিক ক্রিকেটবোধ আর আত্মগর্ব। সেটা ভারতীয় ক্রিকেটে অবশিষ্ট আছে কি না পরীক্ষা নেবে আগামী দিন। তিনটেই যে গড়াগড়ি গেল রবিবারের মিরপুরে!’
কলকাতার আজকাল পত্রিকার শিরোনাম, ‘কাঁপিয়ে দিলেন সেই মুস্তাফিজুর।’ রিপোর্টার অগ্নিপান্ডে সংবাদের শুরুতেই স্লিপে দাঁড়িয়ে রায়না কর্তৃক মুশফিকের ক্যাচ মিসের কথা উল্লেখ করেন। পরে লেখেন, ‘তাঁর ক্যাচ ফসকে ম্যাচও ফসকে গেল৷ সিরিজও ফসকে গেল৷ সবই হারিয়ে গেল৷ গোটা দলটাই ডুবে গেল৷ পদ্মার বানভাসিতে ভেসেই গেল নামে-ভারে অনেক, অনেক এগিয়ে-থাকা দলটি৷ বাংলাদেশের মাটিতে তৈরি হল ইতিহাস৷ তিন ম্যাচের সিরিজে পর পর দুটো ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে ইতিহাস তৈরি করল মাশরাফে মোর্তাজার দল৷ পাকিস্তানের পর ভারত৷ স্বপ্নের দৌড়ে বাংলাদেশ৷ মাঠ থেকে গ্যালারি৷ গ্যালারি থেকে রাজপথ৷ সবই আবেগমথিত৷ সবই প্রতিশোধের আগুনে যেন ভস্মীভূত৷’
একই পত্রিকা ধোনির নেতৃত্ব ছাড়ার ইঙ্গিত এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে যে সিরিজ জয় বাংলাদেশের ফ্লুক ছিল না- মর্মে মাশরাফির সংবাদ সম্মেলনের নিউজটাও প্রকাশ করেছে।
আনন্দবাজার পত্রিকায় শিরোনাম, ‘বাংলাওয়াশের গর্জনের সামনে বিপন্ন ব্র্যান্ড ধোনি’। সংবাদের এক পর্যায়ে রাজর্সি গঙ্গোপাধ্যয় লিখেছেন, ‘হাজার-হাজার বোতল রাতের ঢাকা আকাশে ছুঁড়ে, বাঘের রঙে নিজেকে রাঙিয়ে, বুকে ডোরাকাটা দাগ এঁকে, ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলে রবিবাসরীয় মীরপুরে নতুন ক্রিকেট-সূর্য এনে ফেলল বাংলাদেশ। ভারতকে প্রথম বারের জন্য ওয়ানডে সিরিজে হারিয়ে দেশের ক্রিকেটকে এবার ইতিহাসের পাতায় তুলে ফেললেন মাশরফি মর্তুজার টিমের এগারো বাঙালি। তিন ম্যাচের সিরিজ রবিবারেই শেষ, অন্তিম ম্যাচ এখন মহেন্দ্র সিংহ ধোনিদের সম্মানরক্ষার প্রয়োজনেই পড়ে।’
ধোনির অধিনায়কত্ব ছাড়ার কথা লেখা হয়েছে, ‘জীবনে প্রথম অভিমানি হয়ে ধোনি বললেন, আমাকে সরিয়ে দিন।’
কলকাতার এই সময় পত্রিকায় প্রথম পাতার শিরোনাম, ‘বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে সাবালক সাকিবরা।’ সংবাদের শুরুটাও দারুন। রুপক বসু লিখেছেন, ‘ইতিহাসের হুঙ্কার কেমন হয় ? কেমন হয় পদ্মার প্লাবনের শব্দ? অমর একুশে কেমন করে গর্জে উঠেছিল বাংলাদেশ ? সবের যোগফল রবিবারে সন্ধেয় মীরপুরে শের-ই-বাংলার তিন তলার ছাদে দাঁড়িয়ে যেন কানে এল৷ কানে এল ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ ’ চিরন্তন ভালোবাসার ধ্বনি৷ কানে এল , ‘ধরে দিবানি ভারতকে ’, ‘পরের ম্যাচ জিতে এ বার বাংলাওয়াশ ’৷
হিন্দুস্তান টাইমসের মূল পত্রিকা শিরোনাম, ‘Rahman On Fire’| ‘ Rolled over by a Rookie, a perfect six seals the serise’। এনডিটিভি অনলাইন শিরোনাম করেছে, ‘ Mustafizur Rahman Destroys Indian Batting, Does an Encore of Fifers’। টাইমস অব ইন্ডিয়া শিরোনাম করেছে, ‘ Mustafizur leads Bangladesh to historic series win vs India’।

