নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের খিতাপচর এলাকায় ২৪ নম্বর রেল সেতু ভেঙে তেলবাহী ওয়াগনের ট্যাংকার খালে পড়ে তা ছড়িয়ে যাওয়ায় মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তিনটি ট্যাংকার থেকে খালে ছড়িয়ে পড়া ফার্নেস অয়েল জোয়ারের সময় বোয়ালখালী খালের উজানে প্রায় ১২ কিলোমিটার এবং ভাটায়ও প্রায় ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। এই ফার্নেস অয়েল বোয়ালখালী খাল হয়ে সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে মিশেছে।
এছাড়া খালের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ফসলী জমি, জলায়শয় ও পুকুরেও এই তেল ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে অনেক পুকুরের মাছ মারা যেতে শুরু করেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। খালের ছোট ছোট মাছ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীও মরে ভেসে উঠেছে বলে জানা যায়।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য নেয়া এই তেল বহনকারী ওয়াগন দুর্ঘটনার ফলে ভয়াবহ এই পরিবেশ বিপর্যয় হলেও এর দায় নিতে নারাজ কোনো পক্ষই। বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বলছে এখানে তাদের করার কিছুই নেই। সব দায়-দায়িত্ব তেল বহনকারী প্রতিষ্ঠান রেলওয়ের। অন্যদিকে রেলওয়ে বলছে, তেল ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে তাদেরও করার কিছু নেই, বিষয়টি দেখবে পরিবেশ অধিদপ্তর। আর সেই পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, দুর্ঘটনা যারা ঘটিয়েছে এর দায় তাদেরই, এখানে পরিবেশ অধিদপ্তরের করার কিছু নেই। প্রয়োজনে রেলওয়ের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ত্রিমুখি এই ঠেলাঠেলি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাসাদের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দিন খান বাদল। তার প্রশ্ন, তাহলে পরিবেশ বির্পযয়ের হাত থেকে উত্তরণে দায়িত্বটা নেবে কে?
শনিবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বোয়ালখালী সারোয়াতলী ইউনিয়নের খিতাপচর গ্রামের সাথে পটিয়ার ধলঘাট এলাকার সংযোগ স্থাপনকারী ২৪ নম্বর রেল সেতুটি ভেঙে ইঞ্জিনসহ তিনটি তেলভর্তি ট্যাংকার খালে পড়ে রয়েছে। এসব ট্যাংকার থেকে হাজার হাজার লিটার তেল পানিতে মিশে গেছে। এই তেল ১০ কিলোমিটার দূরে কর্ণফুলী নদীতেও গিয়ে মিশেছে বলে পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয়রা জানিয়েছে। এছাড়া খালের আশপাশের ১০-১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তেল আর পানি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। গাছ, ফসলী জমি, পুকুর-জলায়শয়েও ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন পুকুরের মাছ ইতোমধ্যে মরে ভেসে উঠতে শুরু করেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। এছাড়া খালের ছোট ছোট জলজ প্রাণীও মরে পানিতে ভাসছে। খালের পাশে অবস্থিত ফসলী জমিতে তেল ছড়িয়ে পড়ায় কৃষকরা সেখানে কাজ করতে পারছেননা বলে জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রাকিব হোসেন বলেন, ‘খালে ছড়িযে পড়া তেল জোয়ারের পানিতে ভেসে আমাদের পুকুরে ঢুকেছে। সেকারণে পুকুরের পানি নষ্ট হওয়ার সাথে সাথে আমাদের পুকুরের মাছও মরে ভেসে উঠছে।’
সোহল নামে একজন বলেন, ‘গতকাল সন্ধ্যার সময় খাল থেকে অনেকে মরা মাছ নিয়ে গেছে। খালের অনেকাংশে মরা মাছ ভেসে উঠছে। এখানকার গাছ ও ফসলী জমিতেও তেল ছড়িয়ে পড়েছে।’
প্রায় ৮০ হাজার লিটার ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়ে বোয়ালখালী খালসহ এরআশ পাশের মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনলেও তেল অপসারণে দায় নিতে চাচ্ছে না কোনো কর্তৃপক্ষই।
দোহাজারি পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের পরিচালক প্রকৌশলী আরিফুর রহমান বলেন, ‘এখানে আমাদের কিছু করার নেই। তেল বহনকারী প্রতিষ্ঠান রেলওয়ে আর পরিবেশ অধিদপ্তর বিষয়টি দেখবে।’
ঘটনাস্থলে থাকা রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রথমে অক্ষত অবস্থায় থাকা তেলভর্তি ট্যাংকার দুটি থেকে মেশিনের মাধ্যমে তেল ট্রান্সফার করা হচ্ছে। এরপর একটি অস্থায়ী রেল সেতু তৈরি করে ইঞ্জিনটি উদ্ধারের কাজ শুরু করবো। এটি তিনদিনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার পরই খালে পড়ে থাকা ট্যাংকার উত্তোলনের বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারবো।’ তেল ছড়িয়ে পড়ায় রেলওয়ের করণীয় কিছুই নেই দাবি করে বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তর দেখবে বলে তিনি জানান।
তবে ঘটনাস্থলে থাকা পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক মকবুল হোসেন বলেন, ‘পানিতে তেল ছড়িয়ে পড়লে তা অপসারণের কোনো ব্যবস্থা অমাদের নেই। এক্ষেত্রে সুন্দরবনের শেওলা নদীতে যেভবে স্থানীয়রা সনাতনী পদ্ধতিতে তেল অপসরাণ কর হয়েছে, পারলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সেটি করতে পারে। রেলওয়েসহ যারা তেল আনছে এর দায়িত্ব নিতে হবে তাদের।’
এক্ষেত্রে পরিবেশ বির্পযয়ের কারণে সংশ্লিষ্ট দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ারও হুমকি দেন পরিবেশ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।
তবে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মইনউদ্দিন খান বাদল দুর্ঘটনার একদিন পরেও তেল অপসারণে কোনো ব্যবস্থা কেন নেয়া হয়নি তা জানতে চান পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালকের কাছে। এসময় পরিচালক মকবুল হোসেন বলেন, ‘তেল অপসারণে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো যন্ত্রপাতি নেই। এছাড়া এ কাজটিও পরিবেশ অধিদপ্তরের আওতায় পড়ে না।’
এ কথা শুনে সাংসদ বাদল প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে এর দায়িত্বটা নেবে কে?’ এসময় তিনি পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সাথে কথা বলার জন্য মোবাইল ফোনে চেষ্টাও করেন।
এমপি বাদল উপস্থিত রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সনাতনী পদ্ধতিতে কলাপাতা ও খড় দিয়ে পানিতে বাধা দিয়ে তেল আটকানোর নির্দেশ দেন। একাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করার জন্য উপজেলা প্রশাসনকেও নির্দেশ দেন তিনি।
উল্লেখ্য, শুক্রবার দুপুর দেড়টার দিকে বোয়ালখালী ও পটিয়া সীমান্তে সারোয়াতলী ইউনিয়নের ২৪ নম্বর রেল সেতু ভেঙে ফার্নেস অয়েল বহনকারী একটি ওয়াগন খালে পড়ে যায়। এরমধ্যে ইঞ্জিনসহ তিনটি ট্যাংকার পানিতে পড়ে গেলে সেখান থেকে হাজার হাজার লিটার তেল খালে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় রেলওয়ের দুই প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত ও দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে।

