নিজস্ব প্রতিবেদক : সুন্দরবনের সন্নিকটে রাপমাপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষকে নিয়ে যৌথ আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে ভারতীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ও কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বাংলাদেশের তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে।
সূত্র জানায়, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশের ১৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে নরেন্দ্র মোদির কাছে আহ্বান জানিয়েছিলেন সুন্দরবন ধ্বংসকারী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প যেন বাতিল করা হয়। কিন্তু মোদি রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল নয় বরং নিয়ম মেনেই এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলেন।
বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে বিবৃতিদাতা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের। বিশ্বের বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, বাংলাদেশ ও ভারতের ‘ন্যাচারাল ওয়ান্ডারস’ খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে বাঁচাতে তাই তারা দুই দেশের মানুষকে নিয়ে যৌথ আন্দোলনের কথা ভাবছেন। কারণ সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয়, এটি ভারতেরও সম্পদ। অভিন্ন প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষায় তাই যৌথ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছেন বিশিষ্টজনেরা।
জানা গেছে, বাংলাদেশে সুন্দরবনের সন্নিকটে যে বিদ্যুৎ প্রকল্প ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে করতে যাচ্ছে, ভারতের কোম্পানি এনটিপিসি এ ধরনের কোনো প্রকল্প ভারতে করতে সক্ষম হয়নি। কেন না ভারতের ‘ইআইএ গাইড লাইন ২০১০’ অনুসারে বনাঞ্চলের ২৫ কি.মি এর মধ্যে কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যায় না। এমনকি ভারতের পরিবেশ আইন অনুসারে এনটিপিসি’র এ ধরনের একাধিক প্রকল্প বাতিল করতে হয়েছে। অথচ একই নিয়ম বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে না।
ভারতের নিজস্ব আইন ভঙ্গ করে ভারতীয় কোম্পানির বাংলাদেশে এমন তৎপরতা এবং সুন্দরবন ধ্বংসকারী পদক্ষেপের বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ সফররত ভঅরতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আর্কষণ করে বিবৃতি দেন এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, খুশী কবির, রাশেদা কে চৌধুরী, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার, প্রকৌশলী ইনাম উল হক, শামসুল হুদা, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, রুহিন হোসেন প্রিন্স, সাইফুল হক, ড. মো. শাহজাহান, অধ্যাপিকা এএন রাশেদা, প্রকৌশলী বিডি রহমতউল্লাহ, কামরুল ইসলাম চৌধুরী, ফরিদা আক্তার, ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম ও ডা. মো. আব্দুল মতিন।
তার বিবৃতিতে বলেছিলেন, এ ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ ধবংস করে তথাকথিত কোনো উন্নয়ন প্রকল্প জনকল্যাণ বয়ে আনে না। দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের সর্ম্পক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার পরিবর্তে দীর্ঘ মেয়াদী সংকটের সূত্রপাত করবে।
কিন্তু বিষয়টিকে কানেই তুললেন না দুই প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ে বক্তৃতাকালে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘নিয়ম মেনেই রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে জ্বালানি খাতে অংশীদারিত্ব আরো বাড়বে।’
ইতোমধ্যে দেশ ও বিদেশে বিশেষজ্ঞরা তথ্য উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে প্রতিদিন হাজার হাজার টন মারাত্মক ক্ষতকির গ্যাস, ছাই, কয়লা ধোঁয়া ও পানি নির্গত হবে যা সুন্দরবনকে বিপদাপন্ন করে তুলবে।
এমন কি সম্প্রতি এ অঞ্চলে তেলবাহী ও সার বোঝাই জাহাজ ডুবির ফলে সুন্দরবনের র্দীঘ মেয়াদী ক্ষতি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সারা বছর ধরে কয়লা বোঝাই জাহাজ চলাচলে দুর্ঘটনার বিরাট ঝুঁকি অনুমান করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরে এসে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যাপারে অনড় অবস্থান জানান দেয়ায় কিছুটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলছেন মোদির নিয়ম মেনে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার আশ্বাস প্রতারণামুলক।
এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং বিবৃতিদাতাদের অন্যতম রাশেদা কে চৌধুরী বলেন ‘আমরা রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে অনড়। শুধু আমি কেন প্রকৃতি আর সুন্দরের প্রতি যাদের ভালোবাসা আছে তারা সবাই বলবেন সুন্দরবন ধ্বংসকারী এ প্রকল্প বাতিলের কথা।’
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর নিয়ম মেনে প্রকল্প বাস্তবায়নের আশ্বাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে স্বার্থান্বেষী কোনো গবেষণার প্রেক্ষিতে নিয়ম মানার কথা বলা হচ্ছে কি না তা আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা আমরা চাই না এখানে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হোক। কারণ ইতোমধ্যে আমরা গবেষণায় দেখেছি রামপালে কেন্দ্রটি স্থাপিত হলে আমাদের গর্ব সুন্দরবনের স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হবেই।’
তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যে নিয়ম মানার আশ্বাস দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ প্রতারণামূলক একটি আশ্বাস। কারণ প্রথমেই যেখানে ভারতের আইন ভেঙ্গে সুন্দরবনের মাত্র ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে এমন প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানে তার নিয়ম মানার আশ্বাস একেবারেই অবান্তর।’
তিনি বলেন ‘এ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প অনেক পথ আছে। অন্য কোনো যায়গায় এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করলে আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না।’
যৌথ আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যাপারে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আমরা ভারতের জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ করছি এবং দু’দেশের মানুষ যৌথভাবে প্রকল্পটি বাতিলের আন্দোলন করবএবং আমাদের আন্দোলন চলবে।’
একইভাবে বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন বলেন ‘মোদির নিয়ম মানার আশ্বাসের কোন ভিত্তি নেই।’
তিনি বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদি কী করে বুঝবেন, যেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রীই বুঝতে চাচ্ছেন না মাত্র ৪ কি.মি. এর মধ্যে প্রল্পটি হলে বনাঞ্চলের কি পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে। উল্টো তিনি ১০ কি.মি. বনাঞ্চলকে বাফার জোন প্রমাণ করে ১৪ কি.মি. দুরত্ব দেখানোর চেষ্টা করছেন এবং প্রকল্প বাতিল ঘোষণা না করে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। আর ভারতের আইন অনুযায়ী এ প্রকল্পতো কল্পনাই করা যায় না।’
প্রকল্পটি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলেও জানান এ পরিবেশবিদ।

