নিজস্ব প্রতিবেদক : বিশ্বব্যাপী আলোচিত সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়েরকৃত তিন মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হচ্ছে আজ রোববার। দীর্ঘ ২৫ মাস তদন্তের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আদালতে এই চার্জশিট দাখিল করতে যাচ্ছে। সিআইডির তদন্তে এক হাজার ১৩৬ জনের প্রাণহানীর ঘটনায় ভবন মালিক, কারখানা মালিক, কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও অবহেলাই দায়ী বলে প্রমাণিত হয়েছে।
তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শ্রমিকদের জোরপূর্বক আটকে ‘হত্যা’ করা হয়। রানা প্লাজা ভবনটি নিমার্ণে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (বিল্ডিং কোড) মানা হয়নি। আর এ কারণেই ভবনটি ধসের ঘটনা ঘটে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হত্যা ও ইমারত নিমার্ণে ত্রুটির অভিযোগে দুই মামলায় ৪২ জন আসামির বিরুদ্ধে এই অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এতে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাকে প্রধান আসামি করে ৪১ জনের বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় হত্যার অভিযোগ এবং ১৮ জনের বিরুদ্ধে ইমারত নির্মাণ আইনের ১২ নম্বর ধারা এবং প্যানাল কোডের (দণ্ডবিধি) ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হচ্ছে। ১৭ জন আসামি দুই মামলায়ই আসামি হওয়ায় মোট আসামির সংখ্যা ৪২ জনই থাকছে।
দীর্ঘ তদন্তে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। তবে তদন্তে অভিযোগপত্র থেকে বাদ পড়ছেন সাভারের সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কবীর উদ্দিন সরদার। রানা প্লাজা ধসের আগে ভবনে ফাটল দেখার পরও কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে তার বিরুদ্ধে জোড়ালো অভিযোগ উঠেছিল। চার্জশিট থেকে আরো বাদ পড়ছেন একটি পোশাক কারখানার কর্মকর্তা ও স্পেনের নাগরিক ডেভিড মেয়র রেকো।
সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) বিজয় কৃষ্ণ কর বলেন, ‘আমরা প্রাণহানী ও ইমারত আইনের দুই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করছি। একজন নিহত শ্রমিকের স্ত্রীর দায়ের করার মামলার তদন্তও এরই সঙ্গে অর্ন্তভুক্ত করার আবেদন করা হবে।’
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসে পুলিশের হিসাবে এক হাজার ১৩৬ জন নিহত হন। আহত হন প্রায় দুই ৪৫৮ জন। নিখোঁজ রয়েছেন অনেক শ্রমিক। ঘটনার পর ২৫ এপ্রিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন বাদী হয়ে ১৯৫২ সালের ইমারত নির্মাণ আইনের ১২ ধারায় ১৩ জনের বিরুদ্ধে সাভার থানায় মামলা করেন।
একই দিন সাভার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওয়ালী আশরাফ বাদী হয়ে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩০৪/ক ধারায় একই থানায় রানাসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন। এরপর ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড দাবি করে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪/৫০৬ ধারায় ঢাকা মহানগর মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে অপর মামলাটি করেন পোশাকশ্রমিক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী শিউলি আক্তার।
আদালত তিনটি মামলার তদন্ত করতে সিআইডিকে আদেশ দেন। সিআইডির তদন্তে ইমারত আইনের ১২ ধারায় ঝূঁকিপূর্ণ নির্মাণের অবহেলার পাশাপাশি সম্মিলিতভাবে এই অপরাধ করায় দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে প্রাণহানীর ঘটনায় হত্যার অভিযোগ পাওয়ায় ৩০২, ৩২৫, ৩২৬ ও ৪২৭ ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এএসপি বিজয় কৃষ্ণ কর বলেন, ‘হৃদয় বিদারক এই প্রাণহানীর ঘটনায় শ্রমিকদের ভবনটিতে আটকে রেখে হত্যার অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই রানা প্লাজার মালিকসহ অনেকের বিরুদ্ধে আমরা চার্জশিট দিচ্ছি।’
ইউএনও ও কারখানার কর্মকর্তাকে বাদ দেয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘সাবেক ইউএনও-র বিরুদ্ধে স্বাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া একটি কারখানার এমডি বিদেশি নাগরিক ডেভিড মেয়র ঘটনার দিন ছিলেন না।’
চার্জশিটে থাকা ৪২ জনের মধ্যে সোহেল রানা, তার বাবা আবদুল খালেক, সোহেল রানার মা, রানার আশ্রয়দাতা আবুল হাসান, নিউ ওয়েব বটমস ও নিউ ওয়েব স্টাইল লিমিটেডের চেয়ারম্যান বজলুল সামাদ আদনান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান তাপস, ফ্যান্টমের পরিচালক আমিনুল ইসলাম, ইথার টেক্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান, কলকারখানা পরিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক ইউসুফ আলী, সহিদুল ইসলাম, ঢাকা বিভাগীয় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদপ্তরের যুগ্ম-পরিচালক এম জামশেদুর রহমান, বেলায়েত হোসেন ও রাজউকের সাভার সার্কেলের পরিদর্শক আওলাদ হোসেনের নাম নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর অভিযুক্ত ভবন মালিক রানা, তারা বাবা আব্দুল খালেক, সাভার পৌরসভার মেয়র রেফাত উল্লাহ, স্থানীয় কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী এবং প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী রকিবুল হাসানসহ মোট ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে মেয়র, কাউন্সিলর ও দুই প্রকৌশলী এবং রানার বাবাসহ আটজন জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। চার মালিকসহ বাকিরা এখনো জেল হাজতে। ২১ জন এখনো গ্রেপ্তার এড়িয়ে আছেন, যারা সবাই অভিযোগপত্রে আসামি হিসেবে শনাক্ত হতে যাচ্ছেন।

