দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত ঘাটতি কাটিয়ে বগুড়াকে দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করতে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ, প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার স্পোর্টস ভিলেজ, সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দসহ একাধিক বৃহৎ প্রকল্প। বৃহস্পতিবার সকালে বগুড়ার মম ইন কনভেনশন সেন্টারে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন আয়োজিত ‘বগুড়ার উন্নয়ন সম্ভাবনা, সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব পরিকল্পনার কথা জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বগুড়ার যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা, পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তিনি আরও জানান, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুযোগ সম্প্রসারণে বগুড়ায় বহুমাত্রিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। যানজট নিরসনে চার থেকে ছয় লেনের সড়ক বগুড়া শহরের যানজট কমানো ও নগরীর সৌন্দর্য বাড়াতে করতোয়া নদীর তীর ঘেঁষে চার লেনের সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শহরের প্রধান প্রধান মহাসড়ক চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ রয়েছে। নগরায়ণ ও যানজট নিরসনের প্রাথমিক কার্যক্রমের জন্য ইতোমধ্যে ৭০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
সিটি করপোরেশন ও উপজেলায় বড় বরাদ্দ
বগুড়ার নগর অবকাঠামো উন্নয়নে ১ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আরাফাত রহমান কোকো প্যারা স্পোর্টস ভিলেজ’ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৩টি উপজেলার টেকসই উন্নয়নে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং পৌরসভাগুলোর অবকাঠামো শক্তিশালী করতে আরও ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বগুড়া ওয়াসা ও বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডিএ) গঠনের প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নগর ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ, পরিকল্পিত সম্প্রসারণ ও নাগরিক সেবার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
শিল্পায়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষায় গুরুত্ব
বগুড়ায় শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিসিক শিল্প পার্কের কাজ দ্রুত শুরু হবে বলে জানান মীর শাহে আলম। একই সঙ্গে উপজেলার ডাকবাংলো ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, জেলার ১৩টি উপজেলায় ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি গবেষণা ও বহুমুখী উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কৃষি উদ্বৃত্তকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা
বগুড়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জেলাটি কৃষিতে উদ্বৃত্ত এবং এখানে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। অথচ গত ২০ বছরে অঞ্চলটি প্রত্যাশিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র সাত মাস। এরই মধ্যে বগুড়াকে আধুনিক ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে রূপান্তরের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
সুষম উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব
দেশের সব অঞ্চলে সমান গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে মীর শাহে আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে সমান গুরুত্ব দেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং গোপালগঞ্জের জন্য ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা তুলে ধরেন। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, উন্নয়ন কোনো নির্দিষ্ট জেলার জন্য নয়; বরং দেশের সব মানুষের জীবনমান উন্নত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। বগুড়ার উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে ভালো উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানানো এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর সম্পাদক লোটন একরামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য দেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুহিত তালুকদার, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, সিটি কর্পোরেশন প্রসাশক এম আর ইসলাম স্বাধীন, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এ্যাড মাহবুবর রহমান, বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান এবং পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ, বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি রেজাউল হাসান রানু সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদ প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাহবুবর রহমান হারেজ, বাংলাদেশ সাংবাদিক উন্নয়ন সংস্থার কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান মমিনুর রশীদ সাইন, ধুনট উপজেলা বিএনপির সভাপতি তৌহিদুল আলম মামুন, শাজাহানপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহীন, শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ্যাড আব্দুল ওহাব, ড্যাব সভাপতি ডাঃ আজফারুল হাবীব রোজ, ডাঃ শাহ মোহাম্মদ শাহজাহান আলী প্রমূখ। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বগুড়ার যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পায়ন, নগর ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন, অর্থায়ন, সময়সীমা ও অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

