ঢাকাTuesday , 31 March 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাজারে জ্বালানির ঘাটতির চেয়ে জ্বালানি মজুদের মানসিকতাই এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে – বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী 

Link Copied!

বিদ্যমান গ্যাস এবং জ্বালানির মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা বিষয়ে মহান জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এই কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির (বিশেষ করে গাল্ফ ও মধ্য এশিয়ার) মধ্যেও বাংলাদেশের গ্যাস ও জ্বালানি মজুদ সরবরাহের অগ্রিম প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনার বিষয়টি দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করা জরুরি। বিভিন্ন রকমের বিভ্রান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে যাতে কোন মহল উদ্বেগ উৎকণ্ঠা সৃষ্টি না করতে পারে সে জন্য এই বিবৃতি। মন্ত্রী সংসদকে জানান, আন্তর্জাতিক সংঘাত, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা,সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি ও জ্বালানি পরিবহনে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলেছে। এর অভিঘাত বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও এসে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ও তত্ত্বাবধানে আমরা সঠিক এবং সময়োপযোগী প্রস্তুতি নিয়েছি, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রেখেছি এবং জনগণের স্বস্তি নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন— এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই বরং আমরা গত বছরের তুলনায় সরবরাহ আরও বৃদ্ধি করেছি। গত বছর এই সময়ে আমাদের যে পরিমাণ জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছিল, এ বছর আমরা তার চেয়েও বেশি সরবরাহ নিশ্চিত করেছি। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে ১৭ ফেব্রুয়ারি। সেদিন দেশে জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের মজুদ ছিল ২ লক্ষ ৬ হাজার মেট্রিক টন। অদ্য ৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখ দেশে ডিজেলের মোট মজুদ ২ লক্ষ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৪১ দিনে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৪ লক্ষ ৮২ হাজার মেট্রিক টন। এত বিপুল বিক্রয়ের পরও মজুদ বৃদ্ধি পাওয়া প্রমাণ করে যে, সরকার আগাম প্রস্তুতি, ধারাবাহিক আমদানি এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থাকে দৃঢ়ভাবে অব্যাহত রেখেছে। এবারের ঈদ-উল-ফিতরকে সামনে রেখে মানুষের যাতায়াত যেন নির্বিঘ্ন হয়, পরিবহণ ব্যবস্থা যাতে সচল থাকে এবং কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত না হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য যাতে সচল থাকে সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মজুদ আরও বৃদ্ধির অগ্রিম ব্যবস্থা নিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ২০২৫ সালের মার্চ মাসের চাহিদাকে ভিত্তি ধরে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সরবরাহের ব্যবস্থা করেছি। অর্থাৎ সরকার সম্ভাব্য চাহিদার চেয়েও বেশি প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে যাতে বাজারে কোনো ধরনের সংকট বা কৃত্রিম চাপ তৈরি না হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রকৃত চাহিদা সেই অনুপাতে বাড়েনি। মন্ত্রী বলেন, ক্ষেত্র বিশেষে প্রতীয়মান হয়েছে যে, জনমনের মধ্যে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ক্রয়ে প্রবণতা বিদ্যমান এবং ‘প্যানিক বাইয়িং’ পরিস্থিতিকে অনর্থকভাবে জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করার কারণ রয়েছে। দেখা গেছে গত বছরের মার্চ মাসে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা ছিল প্রায় ১২,০০০ মেট্রিক টন এবং অকটেন-পেট্রোলের চাহিদা ছিল ১,২০০ থেকে ১,৪০০ মেট্রিক টনের মধ্যে। অথচ চলতি বছরের মার্চে ১ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত অকটেন বিক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮,৯৩৯ মেট্রিক টন, অর্থাৎ গড়ে প্রায় ১,২৫৮ মেট্রিক টন প্রতিদিন।এ থেকে স্পষ্ট হয় যে বাজারে জ্বালানি প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। মন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ‘আমাদের মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৩% ডিজেল, যার সরবরাহ স্বাভাবিক। অর্থাৎ, মোট ব্যবহৃত জ্বালানির মাত্র ৬.০৮% অকটেন ও ৬.৭৭% পেট্রোলের জন্য ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন জ্বালানি সরবরাহের সঠিক চিত্র প্রতিফলিত করে না। এখানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহের মাধ্যমে মজুদের প্রবণতা থাকায় এ সংকট কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়েছে। এ সংকট উত্তরণে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। ইতোমধ্যে, ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করে ১০৫৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। যাতে ৭৫ লক্ষ টাকার অর্থদন্ডসহ ১৬জনকে কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া, অভিযানের মাধ্যমে ১লক্ষ ৪০ হাজার লিটার ডিজেল, ২২ হাজার লিটার অকটেন, ৪৬ হাজার লিটার পেট্রোলসহ মোট ২ লক্ষ ০৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি যোগ করেন, সরকার ডিজেলের পাশাপাশি অকটেনের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী এপ্রিল মাসে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এছাড়া, দেশীয় উৎস থেকে আরও ৩০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, মাসে অকটেনের চাহিদা ৩৫ হাজার মেট্রিক টন হলেও সরকার যে মজুদের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তাতে প্রায় ২(দুই) মাসের চাহিদা পুরণ করা যাবে। ফলে অকটেনের জন্য ফিলিং স্টেশনসমূহে দীর্ঘ লাইন বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং সমস্যাটি মূলত আচরণ নির্ভর। মন্ত্রী ঢাকার তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন এর উদাহরণ টেনে বলেন, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে সেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ লিটার অকটেন বিক্রি হতো। অথচ ২০২৬ সালের মার্চে প্রতিদিন সেখানে গড় বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৬২০ লিটার। অর্থাৎ, বিক্রি প্রায় ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি জানান, ঢাকার আসাদ গেটে অবস্থিত সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশন, মহাখালীর গুলশান সার্ভিস স্টেশন, শাহবাগের মেঘনা মডেল পাম্প, নিকুঞ্জ মডেল সার্ভিস, নিকুঞ্জ ও মিরপুরের খালেক সার্ভিস স্টেশনের ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে সরবরাহকৃত জ্বালানি তেলের তুলনামূলক পর্যালোচনায় একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়। এই অস্বাভাবিক ব্যবধান একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেয় যে, বাজারে জ্বালানির ঘাটতির চেয়ে জ্বালানি মজুদের মানসিকতাই এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সরবরাহ ও প্রস্তুতি পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও মানুষ যদি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্রয় করে কিংবা ড্রাম ও জারে ভরে অবৈধ মজুদ শুরু করে, তবে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে বাধ্য। সুতরাং, আজকের এই পরিস্থিতিতে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের মধ্যে আস্থা ও সচেতনতা তৈরি করা। মন্ত্রী সংসদের মাধ্যমে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও সরকার জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করেনি। পৃথিবীর অনেক দেশে জ্বালানির দাম বারবার সমন্বয় করতে হয়েছে। এমনকি প্রতিবেশী অনেক দেশেও ২৫ শতাংশের বেশি মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে; সেখানে বাংলাদেশ সরকার জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে মূল্য স্থিতিশীল রেখেছে। কারণ, জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন, পরিবহন খরচ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। বাস্তব অবস্থা জাতির সামনে তুলে ধরতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ডিজেলের বিক্রয়মূল্য প্রতি লিটার ১০০ টাকা, অথচ আমাদের প্রকৃত ব্যয় প্রতি লিটার ১৯৮ টাকা। একইভাবে অকটেনের বিক্রয়মূল্য প্রতি লিটার ১২০ টাকা, প্রকৃত ব্যয় ১৫০ টাকা ৭২ পয়সা। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় দরের তুলনায় ১-২৯ মার্চ ২০২৬ সময়ের ডিজেলের গড় দর ৯৮% বৃদ্ধি পেয়েছে, অকটেনের বৃদ্ধি পেয়েছে ২৬%। অর্থাৎ, সরকার জনগণের স্বার্থে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি বহন করছে। এই দুটি জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে মার্চ-জুন প্রান্তিকে মোট ভর্তুকির প্রয়োজন হবে ডিজেলের ক্ষেত্রে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা এবং অকটেনের ক্ষেত্রে ৬ শত ৩৬ কোটি টাকা, মোট ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। এছাড়া, পেট্রোবাংলার মাধ্যমে এলএনজি আমদানির জন্য এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। মন্ত্রী বলেন, এই সরকার বিশ্বাস করে- রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো সংকটের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে জীবনযাত্রাকে সচল রাখতে। আমাদের পরিবহন, শিক্ষা কার্যক্রম, শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৃষি উৎপাদন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। আমরা এই গতি বজায় রাখতে চাই – আর এজন্যই জনগণের সহযোগিতা আজ অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়, এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। সবার সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই সে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। মন্ত্রী আরো বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় অসৎ ব্যবসায়ী্দের পাচারে জড়িত থাকায় খবর পাওয়া গেছে। সরকার ইতোমধ্যে তেলের অবৈধ মজুদ ও সীমান্ত এলাকায় তেল পাচারের তথ্য দাতাকে উপযুক্ত পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। মন্ত্রী তার বিবৃতিতে সকলের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, আমরা যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয় না করি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করি। তিনি বলেন, আমরা যেন অবৈধ সংযোগ ও অবৈধ মজুদ বন্ধে সোচ্চার হই; জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেই। সবার আগে বাংলাদেশ- এটাই হোক আমাদের ঐক্যবদ্ধ অঙ্গীকার।