ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে গত ২১ দিন ধরে অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন নেই। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে কুকুর, বিড়াল বা শিয়ালের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে শতাধিক রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসলেও, টিকা না থাকায় হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে তাদের। বিশেষ করে শিশুরা এবং দরিদ্র শ্রেণির রোগীরা পড়েছেন ভয়াবহ দুর্ভোগে। কেউ কেউ চড়া দামে বাইরে থেকে টিকা কিনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার অনেকেই সেই সামর্থ্য না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। বাঁচার টিকাটা যদি না পাই, তাহলে যাব কোথায়। বুধবার দুপুরে হাসপাতালের টিকাদান কেন্দ্রের বারান্দায় কোলে মেয়েকে বসিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন ইসরাত জাহান। নয় বছরের শিশু নুসরাতকে পায়ে কামড়েছে একটি বিড়াল। চোখের জল ধরে রেখে ইসরাত বললেন,“ডাক্তার বলেছেন দুটো টিকা লাগবে। একটা এআরভি, আরেকটা আরআইজি। কিনে আনতে বলেছে। দাম পড়ছে দেড় হাজার টাকা। গরিব মানুষ, এত টাকা কোথায় পাব?” একই রকম দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন দিনমজুর হাবিবুল ইসলাম। রক্তাক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, কুকুর কামড় দিয়েছে। হাসপাতালে এসেছি টিকা নিতে, কিন্তু টিকা নেই। বাইরে থেকে কিনতে বলেছে। দাম পড়ছে একেকটা ৫০০ টাকা। এত টাকার টিকা কিনে বাঁচা আমার পক্ষে সম্ভব না। টিকা না থাকায় প্রতিদিন বাড়ি ফিরে যাচ্ছে অনেক রোগী। হাসপাতাল সূত্র জানায়, জেলার পাঁচটি উপজেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন ৯০ থেকে ১০০ জন রোগী জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা নিতে আসেন ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালে। অথচ টিকা মজুত না থাকায় তাদের অধিকাংশকেই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। হাসপাতালের টিকাদান কেন্দ্রে দায়িত্বরত সিনিয়র স্টাফ নার্স লুবানা আক্তার জানান, প্রতিদিন রোগীরা আসেন, আমরা শুধু বলি টিকা নেই। কেউ কান্না করেন, কেউ রাগ করেন, কেউ আবার গালিগালাজও করেন। কিন্তু আমাদের হাতে কিছুই নেই। একজন জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জলাতঙ্ক টিকা না থাকা মানেই জনগণকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত প্রতিটি উপজেলায় আলাদা বরাদ্দ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে বর্ষাকালে কামড়ের ঘটনা বেশি হয়। টিকা সরবরাহ দ্রুত দরকার । হাসপাতালের ওষুধ ভাণ্ডারের স্টোর কিপার মাহবুব রশিদ জানান, গত মে মাসে আমরা কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে ৫ হাজার এআরভি ও ১ হাজার আরআইজি টিকার চাহিদা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু পেয়েছি মাত্র ৫০০ এআরভি। আর আরআইজি পাইনি একটাও। চার-পাঁচ মাস ধরে এভাবেই চলছে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মনজুরুল ইসলাম বলেন, ৮ জুন পর্যন্ত মজুত থাকা টিকা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর আর সরবরাহ আসেনি। নতুন করে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত টিকা এসে পৌঁছাবে। জরুরী স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া দরকার। স্বাস্থ্যসেবা বিশ্লেষকরা বলছেন, জলাতঙ্ক একটি ভয়াবহ রোগ। আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত প্রতিষেধক না নিলে মৃত্যু অনিবার্য। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে এই টিকা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার চিত্র ভিন্ন। ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট শুধুমাত্র রোগীদের নয়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অদক্ষতাকেও স্পষ্ট করে তুলছে। জরুরি ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপ এবং পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না বলে মনে করছেন সংশ্লি্টরা।

