নামতো দূরের কথা আগে কেউ কখনোই চিনতোই না এই বাড়ী। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই বাড়িটি পরিচিতি পায় ’শেখ বাড়ি’ হিসেবে। এই বাড়ি থেকেই খুলনা সহ দেশের সব শীর্ষ সন্ত্রাসী ,কিলার ও গডফাদাররা নিয়ন্ত্রিত হতো। খুলনার আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের সব কার্যক্রম চলতো এই বাড়ী থেকেই। সদ্য পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন ও তাঁর চার ভাইয়ের `গনভবন’ ছিলো এই শেখ বাড়ি । এক কথায় এই ‘শেখ বাড়ির আঙুলের ইশারায় চলতো দক্ষিণাঞ্চল। তবে খুলনাবাসী শেখ বাড়িকে অভিশপ্ত বাড়ি হিসেবেই চিনতো। কারণ এখানে অনেক নিরীহ মানুষের কলাকাটা হত। জমি দখল থেকে মাদক নিয়ন্ত্রণ সব কিছু পরিচালিত হত এই অভিশপ্ত শেখ বাড়ী থেকেই । কেউ শেখ বাড়ির অবাধ্য হলেই পুলিশ বা পালিত সন্ত্রাসীদের দিয়ে তাকে ধরে এনে টর্চার করা হতো।
গোপন সূত্রে জানা যায়, এই বাড়ির ভিতর ছোট ছোট কিছু কামরা ছিলো । যেখানে মানুষকে আটকে রেখে টর্চার করা হতো এবং এই গোপন ঘর গুলোতেই অবৈধ টাকার লেন দেন হতো। দেশের নাম করা নায়িকাদের এনে এই বাড়ীতে রাতভর ফুর্তি করতো শেখ হেলাল, শেখ রুবেল। খুলনা নগরের শেরে বাংলা সড়কের ময়লাপোতায় অবস্থিত এই অভিশপ্ত শেখ বাড়িটি। খুলনার মানুষের ভিতর এই বাড়িকে ঘিরে ছিল এক অজানা আতঙ্ক। তবে সবাই চুপ থাকতো , দেখেও না দেখার ভান করে চলতো। নিরব দর্শক ছিলো খুলনাবাসী।
এই বাড়ির মালিক সদ্য দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন ও তাঁর ৪ ভাই ,সংসদ সদস্য শেখ সালাহ উদ্দিন জুয়েল, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সোহেল, শেখ রুবেল ও শেখ বাবু। গভীর রাত পর্যন্ত এই বাড়িতে থাকতো খুলনার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের পদচারনা। ১৭ বছর ধরে খুলনায় ঠিকদারি কাজ, চাকরিতে নিয়োগ ও বদলি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রীড়াঙ্গনসহ সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ হতো এই শেখ বাড়ি থেকে। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলো এমনকি পেশাজীবী সংগঠনগুলো চলতো এই বাড়ির নির্দেশনায়। দলের কমিটি গুলো গঠন করে দিতেন তারাই। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জনসহ সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যারাই খুলনায় বদলি হয়ে আসতেন তাদেরকে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে সারা দিনের ধান্দার টাকা বুঝিয়ে দিয়ে আসতে হতো এই শেখ বাড়িতে ।
শেখ বাড়ির সামনের সড়ক দিয়ে যাতায়াতের সময় বাড়ির ভেতরে ও বাইরে সবসময় দেখা যেতো লোকে লোকারন্য । সাধারণ মানুষ কেউ এই বাড়ির গেটের মধ্যে ঢুকতে পারত না। প্রায় সময় ট্রাফিক জ্যাম লেগে থাকতো এই বাড়ির গেটের সামনে। মানুষ মনে মনে গালাগালি করলেও প্রকাশ্যে কেউ কখনো কিছু বলতো না। শেখ বাড়ির গেটের দারোয়ানও ছিল পাওয়ারফুল। সে বুক ফুলিয়ে বলতো আমি শেখ বাড়ির দারোয়ান। এই দারোয়ানের কাছেও মানুষ ধর্না দিতো বিভিন্ন কাজের জন্য। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে জমি থেকে পারিবারিক সমস্যার সমাধানও করে দিত সে। ১৭ বছর ধরে এই বাড়িটি খুলনার ‘ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দু’ হিসেবে পরিচিত ছিলো সবার কাছে।
গত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলনের ডাকে সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে খুলনার শেখ বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুপ্ত জনতা। ঐ দিন দুপুরে খুলনা শিববাড়ি থেকে আন্দোলনকারীরা একটি মিছিল নিয়ে শেখ বাড়ির সামনে গিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় ও ভবনের নিচতলায় আগুন ধরিয়ে দেয়। নিমিষেই শেখ বাড়ীটি পুড়ে ভাগাড়ে পরিনত হয় । ঐ দিন বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আবারও আন্দোলনকারীরা হামলা চালায়। পরে সন্ধ্যায় আরেক দফা হামলা চালিয়ে বাড়ির সব মালামাল নিয়ে যায় বিক্ষুব্ধ জনতা। কয়েক দফা হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দু অভিশপ্ত ‘শেখ বাড়িটি’ ধ্বংসস্তূপে পরিনত হয়। শেখ বাড়ি নগর বাসির কাছে এখন এক অভিশপ্ত বাড়ি হিসেবে পরিচিত। খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে শত শত মানুষ প্রতিদিন এখন এই বাড়িটি দেখতে আসেন। কেউ আগুনে পোড়া ধ্বংস হওয়া বাড়ির ছবি তুলছেন, কেউ আবার সেলফি তুলছেন। মোবাইলে ভিডিও করে রাখছেন অনেকেই।
রাবেয়া আক্তার টুম্পা নামের এক গৃহিনী তার পরিবার নিয়ে এসেছিলেন শেখ বাড়িটি দেখতে। তিনি দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, এই বাড়ীটির সামনে দিয়ে যেতে অনেক ভয় পেতাম। এই বাড়িটি নিয়ে মনের ভিতর সবসময় একটা কৌতুহল কাজ করতো। আজ পোড়া বাড়িটি দেখে কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।
তাসকিয়া আক্তার সম্পা নামক আরেক দর্শনার্থী দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, কখনো ভাবিনি এই বাড়ীর ভিতর ঢুকতে পারবো। শুনেছি এখানে অনেক অন্যায় কাজ হতো। তাই দেখতে এসেছি। পুরো বাড়ীটি পুরে ছারখার হয়ে গেছে। খুলনা বাসী আজ এই বাড়িটি দেখে আনন্দ পাচ্ছে। আমরা চাই শেখ বাড়িটির মতো আর যেন কোন বাড়ি খুলনায় গড়ে না ওঠে।
তারিক তাহরিম নামে এক ছাত্র এই প্রতিবেদককে বলেন, এই বাড়ির ইশারায় এক সময় খুলনার সবাই উঠতো আর বসতো। আজ তার কোনো অস্তিত্বই নেই। আজ খুলনাবাসী স্বাধীন। আর কেউ খুলনাবাসীর উপর অত্যাচার করবে না, ভেবে ভাল লাগছে। খুলনাবাসী আজ বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে।

