ঢাকাMonday , 7 September 2020
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সেপ্টেম্বর এলেই ফিরে আসে সালমান শাহ

Link Copied!

বিনোদন ডেস্ক : ‘ভালো আছি ভালো থেকো আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ গানটির সুর কানে আসলেই প্রত্যেকের চোখে ভেসে ওঠে সেই প্রিয় মানষটির মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
কেয়ামত থেকে কেয়ামত ছবির মাধ্যমে সিনেমা জগতে আবির্ভাব ঘটেছিল এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের। যিনি তার মনোমুগ্ধকর অভিনয় দেখিয়ে, অল্পসময়ে বাংলা সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের হৃদয়ে স্থান করে নিতে সক্ষম হন। একের পর এক সুপার হিট সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আর কেউ নন কোটি ভক্তের নায়ক সালমান শাহ।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের দুঃসময়ে সুদর্শন স্টাইলিস্ট আধুনিক মানসিকতার এই মহানায়কের আগমন ঘটে। বাংলা চলচ্চিত্রের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র সবাইকে কাঁদিয়ে আজকের এই দিনে না ফেরার দেশে চলে যান। আজ এই কিংবদন্তি অভিনেতাকে হারানোর ২৪ বছর। যদিও তার মৃত্যু নিয়ে এখনো রহস্য আছে।
সেপ্টেম্বর এলেই ফিরে আসে সালমান শাহ। বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে দুজন ফ্যাশন সচেতন নায়ক ছিলেন, প্রথমজন জাফর ইকবাল, দ্বিতীয় জন সালমান শাহ। দুজনই প্রয়াত; তবে জাফর ইকবালের ক্যারিয়ার যেখানে ১৮ বছরের, সেখানে সালমানের সাড়ে তিন বছর মাত্র।
শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন সিনেমায় প্রবেশের আগে মিডিয়ায় খুব বেশি পরিচিত মানুষ ছিলেন না। ’৮৫ সালে হানিফ সংকেতের নির্মিত একটি মিউজিক ভিডিওতে মাদকাসক্ত যুবকের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে মিডিয়ায় আসেন। ১৯৯০ সালের কিছু আগে আব্দুল্লাহ আল মামুনের ‘পাথর সময়’ নামের একটি নাটকে গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্রে অভিনয় করেন।
সেখান থেকে ’৯১ সালে কীভাবে সালমান শাহ হয়ে চলচ্চিত্রে এলেন সেই গল্পটা জানা নেই কারও। ইমন থেকে সালমান শাহ হওয়ার পেছনে সম্ভবত বলিউডের সালমান খান নামটি মোটিভেশন হিসেবে কাজ করেছিল। আমাদের দেশি পরিচালকদের বেশিরভাগই তখন হিন্দিতে প্রবলভাবে আসক্ত ছিলেন।
তার প্রথম সিনেমা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ও তো আদতে আমির খান-জুহি চাওলার একই নামের সিনেমার সিন বাই সিন অনুকরণ। তবু এদেশের দর্শক সিনেমাটি ভীষণভাবে গ্রহণ করেছিল। এ সিনেমায় তার সহশিল্পী মৌসুমী বরং তুলনায় বেশি পরিচিত ছিলেন। চলচ্চিত্রে আসার আগে একটি বিউটি কনটেস্টে বিজয়ী হয়েছিলেন, বেশকিছু বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েছিলেন।
প্রথম সিনেমা দিয়েই সালমান শাহ-মৌসুমী জুটি ইতিহাস নির্মাণের প্রতিশ্রুতি তৈরি করতে পেরেছিল। হয়তোবা রাজ্জাক-কবরী এরপর আরেকটি অবিসংবাদিত জুটি হতে পারতেন তারা। কিন্তু নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বে এই জুটি একত্রে সিনেমা করেছে মাত্র চারটি। এক্ষেত্রে উত্তম কুমারের থেকে শিক্ষা নেয়ার সুযোগ ছিল।
উত্তম কুমার-সুচিত্রা সেন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কালজয়ী জুটি এটা আমরা জানি, কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানি না একপর্যায়ে সুচিত্রা সেন এতটাই জেদি হয়ে উঠেছিলেন যে সিনেমার পোস্টারে উত্তমের নামের আগে তার নামটি দিতে প্রযোজককে চাপাচাপি করেন। আকাশচুম্বী জনপ্রিয় উত্তম কুমার নিজের রাগ দমন করে সুচিত্রার সেই আবদার মেনে নিয়েছিলেন। যে কারণে আজও উত্তম-সুচিত্রা মানে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’।
সালমান-মৌসুমীর দ্বন্দ্বটা কী নিয়ে তা জানা নেই; তবে এটুকু বলা যেতে পারে আরেকটু উদার হলে বাংলা সিনেমা উপকৃত হতো, নিজেদের ক্যারিয়ার আরও সুক্ষ হতো। নিজেদের ইমেজ দিয়ে স্বতন্ত্র ক্যারিয়ার গড়ার মিশনে মৌসুমী বেছে নেন ওমর সানীকে, সালমান শাহ শাবনূরকে। অথচ তখন পর্যন্ত ওমর সানী বা শাবনূর দুজনই ছিলেন স্ট্রাগলিং আর্টিস্ট।
সালমান-মৌসুমীর দ্বন্দ্বে সবচাইতে লাভবান হয়েছেন এই দুজনই। মৌসুমীর বিপরীতে সেট হওয়ার আগে ওমর সানীর ক্যারিয়ারের সাফল্য বলতে আনোয়ারাকন্যা ‘মুক্তি’র সঙ্গে ‘চাঁদের আলো’ সিনেমা। তৎকালীন ইন্ডাস্ট্রির ব্যস্ততম নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের ছোট ভাই চরিত্রে ‘এই নিয়ে সংসার’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন এবং আরও কিছু খুচরা সিনেমা হয়তোবা করেছিলেন যেগুলার কোনোটিই তাকে গ্রহণযোগ্য ইমেজ দিতে পারেনি।
মৌসুমীর ওপর ভর করে এমনকি তিনি সালমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন। পরিসংখ্যান দেখলে জানা যাবে, সালমান শাহ-শাবনূর এর চেয়ে মৌসুমী-ওমর সানী জুটির ব্যবসায়িকভাবে সফল সিনেমার সংখ্যা বেশি বা সমালোচকরা এটাও বলবেন, ‘বিক্ষোভ’ বাদে সালমানের অধিকাংশ সিনেমাই যেখানে প্রেমকাহিনিনির্ভর, সেখানে ওমর সানী অ্যাকশন, রোমান্টিক, কমেডি সবধরনের সিনেমায় অভিনয় করেছেন, সুতরাং নায়ক হিসেবে ওমর সানী বৈচিত্র্যময় বেশি।
কিন্তু সমালোচকরা এটা বিবেচনায় নেন না, মৌসুমী ফ্যাক্টর বাদে ওমর সানী কতটা বিবর্ণ। একই কথা প্রযোজ্য শাবনূরের ক্ষেত্রেও। মৌসুমীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের পর ইন্ডাস্ট্রিতে তখনকার জনপ্রিয় নায়িকা দীতি বা চম্পা বয়সে সালমানের সিনিয়র হওয়ায় অপশন ছিল শাবনাজ, শাহনাজ, লিমা প্রমুখ নায়িকা। এদের মধ্যে শাবনাজ বাদে কেউই প্রতিশ্রুতিশীল ছিলেন না, কিন্তু শাবনাজ তখন নাঈমের সঙ্গে জুটি গড়ার চেষ্টা করছেন এবং এই জুটি সিনেমা নিয়ে খুব বেশি প্যাশনেট ছিলেন না।
‘চাঁদনী রাতে’ এর মতো চরম ফ্লপ এক সিনেমার নায়িকা হুট করে সালমানের বিপরীতে চান্স পেয়ে যাবেন এবং প্রথম সিনেমা ‘তুমি আমার’ ১৯ কোটি টাকা ব্যবসা করবে (এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় ব্যবসা সফল সিনেমা), এতটা আকাশ কুসুম কল্পনার সাহস শাবনূরের থাকার কথা নয়। তবু সেই কল্পনা বাস্তব হয়েছিল, যে কারণে মৌসুমীর সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির ১ নম্বর নায়িকার আসন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছিল।
সালমানের মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার সংখ্যা ২৭, এর মধ্যে ১৪টি সিনেমার নায়িকাই শাবনূর। তিনটি সিনেমা করেছেন শাবনাজের সঙ্গে, দুটি লিমার সাথে। বাকিগুলো উঠতি ও অখ্যাত নায়িকার বিপরীতে, যদিও শাহনাজের সাথে করা ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ সিনেমাটা আলাদাভাবে নাম করেছিল এই সিনেমার একটা গানের কারণে।
‘চিঠি এলো জেলখানাতে অনেক দিনের পর, এই দুনিয়া ছাড়তে হবে এসেছে খবর’ শিরোনামের এই গানের দৃশ্যায়নে সালমান ছিলেন ফাঁসির আসামি, বাস্তবেও তার মৃত্যু হয়েছে ফাঁসিতে ঝুলে। ফলে এই সিনেমাটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ১৪টি সিনেমা শাবনূরের সাথে না করে যদি মৌসুমীর সাথে করতেন, নিশ্চিত করে বলা যায় সালমান-মৌসুমী জুটি ক্লাসিকের মর্যাদা আদায় করে নিতে পারত।
সালমানের মৃত্যুর পর সেই শোকে ৭ জন তরুণী আত্মহত্যা করেছিল। আর কোনো সুপারস্টারের মৃত্যুতে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না নিশ্চিত করে বলা যাবে না। ৯৬ সালে আমার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর, তাই তখনকার ইন্ডাস্ট্রিয়াল অনেক কিছুই আমি এই সময়ে বসে বুঝতে পারব না। তবু মাঝে মাঝে মনে হয় সালমানকে এত ওভাররেট করার পেছনে এই আত্মহত্যাগুলোর কোনো সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট আছে কিনা।
সালমান সুদর্শন, সালমান ফ্যাশন সচেতন, কিন্তু নায়কোচিত যে বলিষ্ঠ দেহসৌষ্ঠব সেটা কি তার ছিল, নাকি চকলেট হিরো হয়েই টিকে থাকতে হত তাকে। ওই ৭টি ঝরে যাওয়া প্রাণ তাকে কি একজন সম্ভাবনাময় নায়কের স্তর পেরিয়ে অমর নায়কের স্তরে উন্নীত করল। মিডিয়ায়ও সে সময় তুমূল মাতামাতি ছিল তার মৃত্যু নিয়ে, প্রায় প্রতিদিনই তার মতো দেখতে কোনো না কোনো তরুণের ছবি পত্রিকায় আসত, বলা হতো, এই হতে পারে পরবর্তী সালমান।
এমনকি সালমানের শেষ সিনেমা ‘বুকের ভেতর আগুন’ এ তার মুখ পুড়িয়ে দেয়ার পর কসমেটিক সার্জারি করে তার পরিবর্তে স্ক্রিনে এলো যে ফেরদৌস, তাকেও তো সালমানের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবেই চিন্তা করা হচ্ছিল। ‘প্রিয়জন’ সিনেমায় সালমানের চরিত্রে অভিনয় করা রিয়াজকেও রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে চেষ্টা করা হয়েছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে ফেরদৌসকে ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ করতে হয়েছে, রিয়াজকে করতে হয়েছে ‘মনের মাঝে তুমি’, কিন্তু আজ এতদিন পরেও এরা ছায়া হয়েই রয়ে গেছে।
সালমানকে কি সুপাস্টার বলা যায়? ঝোঁকের বশে বললে বলবো, অবশ্যই, কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে এই প্রশ্নের উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলা আমার পক্ষে কঠিন। একজন সুপারস্টারের স্ট্রাগল থাকে, স্টারডম কীভাবে ডিল করে সেটা বোঝার ব্যাপার থাকে, স্টারডম ফুরিয়ে এলে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায় সেটা দেখার থাকে, সবমিলিয়ে সুপারস্টার একটা দীর্ঘ জার্নি।
এদিক থেকে সুপারস্টার বলা যায় মান্নাকে। ৮৬ সালে সিনেমায় আসা মান্নার ৯৭ সাল পর্যন্ত ক্যারিয়ারে হিট সিনেমা বলতে ছিল শুধু ‘কাশেম মালার প্রেম’। দীর্ঘদিন তিনি ছিলেন চম্পা নির্ভর নায়ক। তৎকালীন স্টার ইলিয়াস কাঞ্চনের সাথে বিরোধে জড়িয়ে চম্পা ঝুঁকে পড়েন মান্নার দিকে, এই জুটি বেশ কয়েকটি সিনেমা করে, সেগুলোর সাফল্য যা সবই চম্পার কল্যাণে। টানা ১১ বছর মান্না অভিনীত বেশিরভাগ সিনেমাতেই তার রোল ছিল সেকেন্ড হিরোর।
এই দীর্ঘ স্ট্রাগল শেষে ব্রেক পাওয়া শুরু করেন গুলজার পরিচালিত ‘অনন্ত প্রেম’ সিনেমার মাধ্যমে। এরপর কাজী হায়াতের মাধ্যমে তার ক্যারিয়ার ঘুরে যায়। তেজী, শান্ত কেন মাস্তান, আম্মাজান, কষ্ট এর মতো ব্যবসাসফল সিনেমা করেছেন, মৃত্যুর দিনও শুটিং করেছেন, এবং ইন্ডাস্ট্রির ১ নম্বর নায়ক হিসেবে মারা গেছেন।
২২ বছরের ক্যারিয়ারে ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি কন্ট্রিবিউট করেছেন। আমি আমার পরিচিত কোনো ভার্সিটি পড়ুয়া তরুণ বা তরুণীর মুখে শুনিনি মান্না তার প্রিয় নায়ক, তবু বাংলা সিনেমাতে সুপারস্টার বললে মান্নাকে অস্বীকার করা যাবে না। গালিগালাজ, বাজে অভিনয়, ডিপজলের সাথে মিলে অশ্লীল সিনেমা প্রোমোট, অর্থাৎ তার স্টার থাকাকালে বাংলা সিনেমা পতনমুখীই হয়েছে কেবল, তবু কমার্শিয়াল আসপেক্ট চিন্তা করলে, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির গ্রোথ প্রশ্নে মান্নাকে উপেক্ষা করলে চলবে না, সম্ভবও নয়।
ঠিক এই জায়গাটাতে এসে হারিয়ে যাবেন সালমান। তার ক্যারিয়ার মাত্র ৩ বছরের, ছবির সংখ্যা ২৭টি, যার অর্ধেকের বেশি এক নায়িকার সাথে। অভিনীত চরিত্রগুলোও একই রকম, ভালো গল্পের সিনেমাতে খুব বেশি অভিনয় করেননি। টানা কয়েকটা সিনেমা ফ্লপ করলে সেখান থেকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতেন বা আদৌ পারতেন কিনা সেটা বুঝতে পারা যায়নি, কলেজ বয় ইমেজ চলে গেলে নিজেকে কীভাবে ফিট রাখতেন তা দেখার সুযোগ পাওয়া যায়নি, ইম্যাচিউরিটি ভুলে মৌসুমীর সাথে আবারো জুটি বাঁধতেন কিনা সেটা দেখা হয়নি। শেষের দিকের সিনেমাগুলোতে দেখা গেছে তার চুল পড়ে যাচ্ছে।
চুল পড়ে যাওয়ার পর এই সংকট কীভাবে সামাল দিতেন সেটা জানা হয়নি, শিল্পী সমিতির নির্বাচনে কী ভূমিকা নিতেন, বা উঠতি স্টারদের দমিয়ে রাখতে কী ধরনের কৌশল করতেন, শাবনূরকে ঘিরে যে স্ক্যান্ডাল ছড়িয়েছিল সেটার সমাধান বিয়েতে গড়াতো, নাকি নতুন কোনো শাবনুর চলে আসতো সেটা দেখা হয়নি। ৯৬ পরবর্তীতে কলকাতার ঋতুপর্ণা বাংলাদেশে এসে অশ্লীল সিনেমা করতে শুরু করলো যখন (রাঙা বউ’ নামে হুমায়ূন ফরিদী আর আমিন খানের সাথে একটি সিনেমা করেছিল ঋতুপর্ণা, যাকে অফিসিয়ালি বাংলাদেশের প্রথম অশ্লীল সিনেমা বলা হয়।
সেই নায়িকার সাথে তিনি সিনেমা করতেন কি না এ রকম অনেক কিছুই জানা যায়নি। মাত্র ৩ বছরের ক্যারিয়ারেই শুটিংয়ে দেরিতে আসা, শিডিউল ফাঁসিয়ে দেয়ার অভিযোগে এফডিসিতে তাকে সাসপেন্ড করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তার মানে, ইতোমধ্যে স্টারডমে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। নায়ক রাজ্জাক কয়েক বছর আগে প্রথম আলোতে মাদকবিরোধী একটা লেখা লিখেছিলেন, যেখানে তিনি প্রয়াত জাফর ইকবাল আর সোহেল চৌধুরীর সাথে তাকেও উল্লেখ করেছিলেন মাদকাসক্ত হিসেবে।
প্রতিদ্বন্দ্বী ওমর সানী একটা সময় মাদকাসক্ত হয়ে সিনেমা থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে যতদিনে ফেরত আসেন, ততদিনে নায়ক থেকে ভিলেন হয়ে গেছেন, ওজন ছাড়িয়ে গেছে ১১০ কেজি। কাজেই উশৃঙ্খলতার কারণে তাকেও একই পরিণতি বরণ করতে হতো কিনা, তা জানার আগেই তিনি ৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে যান। অনেকে বলেন তার মৃত্যু আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যা।
আমি সেই বিতর্কে যেতে চাই না, সালমান শাহ আর নেই এটাই সত্যি কথা। কীভাবে নেই হয়ে গেল সেটা বরং সিনেমার গল্প হয়ে থাকুক। সালমান বিয়ে করেছিলেন মাত্র ২১ বছর বয়সে, তার শ্বশুর বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক শফিকুল হক হীরা। কিছুদিন আগে অনলাইন পোর্টালে দেখলাম, তার স্ত্রী সামিরা বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী, পুনরায় বিয়ে করেছেন, ৩ সন্তানের মা। জীবন থেমে থাকে না, জীবন চলে জীবনের গতিতে।
মান্না গেছে, শাকিব খান এসেছে, এরপরে আসবে অন্যকেউ, কিন্তু আরেকজন সালমান কি আর আসবেন? এই প্রশ্নটাই আর্টিস্ট হিসেবে সালমানের স্বার্থকতা। তিনি অবশ্যই সুপারস্টার নন, কিন্তু ব্যাকরণের বাইরেও তো কিছু নিয়ম থাকে যাকে বলে নিপাতনে সিদ্ধ। আমার কাছে, সালমান তেমনই এক নিপাতনে সিদ্ধ আর্টিস্ট, যে কেবল আক্ষেপ বাড়ায়।
ফ্যাশন সচেতন হিসেবে সালমানকে আলাদা করে বলায় অনেকে বলতে পারেন ষাটের দশকের রাজ্জাক বা রহমান কি ফ্যাশন সচেতন ছিলেন না? সময়টা বুঝতে হবে। ষাট এবং সত্তরের দশকে বাংলা সিনেমার দর্শক মার্কেটে শ্রেণি বিভাজন ছিল না। শিক্ষিত, নিম্নবিত্ত সকলেই একইভাবে সিনেমা দেখতেন। বাংলা সিনেমায় বিভাজনটা ঢুকে পড়তে শুরু করে মধ্য আশির দশক থেকে, যখন সাপের সিনেমা, রাজা-রানী, পীর আউলিয়া টাইপ ফোকনির্ভর সিনেমাগুলো নির্মিত হতে থাকে।
সালমান যে সময়টাতে চলচ্চিত্রে আসেন তখন সিনিয়র নায়ক আলমগীর ছিলেন (শাবানার সাথে তার পারিবারিক সিনেমাগুলোর মার্কেট ছিল), ইলিয়াস কাঞ্চন রাজত্ব করছিলেন, অ্যাকশনের কারণে রুবেলের দর্শক ছিল, শাবনাজ-নাঈম জনপ্রিয়তা পাচ্ছিলেন, কিন্তু স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির ইয়ুথ গ্রুপে কোনো তারকার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা ছিল না, তরুণীদের মধ্যে ক্রেজ ছিল না।
সালমান শাহ একমাত্র নায়ক যিনি এই গোষ্ঠীর মাঝে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন; হিন্দি সিনেমার শাহরুখ-সালমান খানদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই নিজের একটা ক্রেজ তৈরি করেছিলেন। ভিউ কার্ড জমানো তরুণ-তরুণীদের কাছে চাহিদা আদায় করে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের আর কোনো নায়ক এই গোষ্ঠীর মনোজগতে এতটা আলোড়ন জাগাতে সমর্থ হননি। এখানেই তিনি অনন্য।
সুকান্ত ভট্টাচার্য মাত্র ২১ এই থেমে গিয়েছিলেন, সালমান থেমেছেন ২৫ এ। এই স্বল্পায়ু মানুষগুলো জানতেও পারে না, কত নিযুত আক্ষেপের দীর্ঘশ্বাস প্রজন্মান্তরে তারা সযতনে উপহার দিয়ে যান।