বিনোদন ডেস্ক : প্রবাসী এক যুবকের দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে ‘কলুর বলদ’ নাটকটির গল্প শুরু। গল্পটি গড়ে উঠেছে মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে রাজুকে কেন্দ্র করে। যে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমায়। একদিকে চাকরি থেকে বাবার অবসর। অন্যদিকে এক বোনের বিয়ে হয়েছে এবং আরো দুজন ছোট ভাই-বোন রয়েছে। পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বলতে বড় ছেলেটি। যার কারণে বাধ্য হয়ে ভালো আয় রোজগারের আশায় বিদেশে পাড়ি জমায় সে। দীর্ঘদিন বিদেশে থেকে রাজু দেশে টাকা পাঠায়। তার উপার্জিত অর্থে বাবা দেশে বাড়ির কাজ শুরু করেন। তা ছাড়া পুরো পরিবারের খরচও বহন করে রাজু। প্রেমিকা শোভাকে না বলে বিদেশ গিয়েছিল সে। যাওয়ার সময় শোভার জন্য একটি চিঠি রেখে গিয়েছিল।
মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের জন্য কাপুরুষের মতো নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দেয় রাজু। দীর্ঘদিন বিদেশে থেকে দেশে ফিরেছে সে। দেশে ফেরার পর বাবা, ভাই, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই জিজ্ঞেস করে ‘আবার কবে বিদেশে ফিরে যাবি’। বাবার তাগিদ বাড়িটির আরেক তলা উঠাতে হবে, মেয়েটির বিয়ে দিতে হবে, ছোট ছেলেটিকে মেডিক্যালে ভর্তি করাতে হবে। এজন্য আরো টাকা লাগবে। শুধু মা আর শোভা চায় রাজু বিয়ে করে দেশে সেটেল হোক। রাজু নিজেও দেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার ভাবনা নিয়েই দেশে ফিরেছে। কারণ দীর্ঘ সময় আপনজনদের কাছ থেকে দূরে থেকে রাজু অনেক ক্লান্ত। কিন্তু সবার চাওয়া আর রাশি রাশি সমস্যার সামনে নিজের কোনো ইচ্ছের কথাই আর বলতে পারে না। নিজের সমস্ত চাওয়া, স্বপ্ন, ভালোলাগা, হৃদয়ের খুব গোপনে লালিত কষ্ট অগোচরে জমা রেখেই আবার বিদেশে চলে যায় রাজু। এই হলো নাটকটির গল্পের সারাংশ।
আমিও মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের সন্তান। ‘কলুর বলদ’ নাটকটির গল্পও মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের। নাটকটি দেখার সময়ও মধ্যবিত্ত একজন মানুষের দৃষ্টি থেকেই দেখেছি। গল্পটি আমার খুব চেনা। গল্পের মা-বাবা, ভাই-বোন আর ‘কলুর বলদ’ রাজু আমার খুব চেনা। দেশের বড় একটি শ্রেণি মধ্যবিত্ত। তাই গল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে নাট্যকার কিংবা পরিচালক বড় সংখ্যক মানুষের খুব চেনা একটি গল্পই নির্বাচন করেছেন। যা খুব সাধারণের মধ্যে অসাধারণ সিদ্ধান্ত।
গল্পটি তখনই সবার হয় যখন গল্পের চরিত্রের সঙ্গে অবচেতন মনে একজন দর্শক নিজেকে মিলিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ অবচেতন মনে দর্শক বিশ্বাস করতে থাকেন এই চরিত্রটি আসলে আমি। আমার বিশ্বাস এই নাটকের ক্ষেত্রেও সাধারণ দর্শক সেটাই ভাবছেন। রাজুর দেশে ফেরার আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে নাট্যকার গল্প বলতে শুরু করেন। তারপর প্রতিটি দৃশ্যে একে একে বিষাদের পাতা খুলেছেন নাট্যকার মেজবাহ উদ্দিন সুমন। তবে গল্পে ক্লাইমেক্সের খেলাটা একটু দুর্বলভাবে খেলেছেন তিনি। এক্ষেত্রে নজরদারি বেশি থাকলে আরো ভালো হতে পারত। কিন্তু যতটা সরলভাবে নাট্যকার গল্পটি বলেছেন সেটা যথেষ্ট প্রশংসার দাবিদার।
নাটকে সংলাপ অপরিহার্য একটি বিষয়। এক্ষেত্রে নাট্যকার কতটা সফল চলুন একটি দৃশ্যের কথোপকথন দেখে উপলদ্ধি করার চেষ্টা করি- ‘তোমার বাবা-মা কেমন আছেন?’ শোভার এমন প্রশ্নের জবাবে রাজু বলে, ‘বাবা-মা ভালোই আছেন। তাদের অনেক আশা, অনেক চাওয়া আমার কাছে।’ স্মিত হেসে শোভা প্রশ্ন করেন, ‘তোমার কোনো চাওয়া নেই?’ উত্তরে রাজু বলে, ‘এক সময় ছিল, এখন আর নেই।’ শোভার দু’চোখে তখন জল ছলছল করছে। তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে খানিক সময় রাজুর দিকে তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি অবনত করে শোভা বলে, ‘মেঘে মেঘে তো অনেক বেলা হলো, এখন বিয়ে করে নাও।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজু বলে, ‘আমাদের বেলা ফুরিয়েই যায়। অন্ধকার নাইমা আসে। কিন্তু নতুন সূর্যোদয় আর হয় না।’
এই অল্প কথোপকথনের মাধ্যমে প্রবাসী রাজুর চাপা কষ্টগুলো অনায়াসে বলে গেছেন নাট্যকার। দেশের বড় একটি অংশ প্রবাসী। যারা ভালো আয় রোজগারের জন্য প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছেন। সেটা পারিবারিক দায় বোধ থেকেই তারা নিয়েছেন। প্রবাস জীবনে তারা কত যে কষ্ট বয়ে বেড়ান তার ইয়ত্তা নেই। একটি নাটকে এত অল্প সময়ে তা তুলে ধরা সম্ভব না হলেও রাজুর এসব কথোপকথন থেকে কিছুটা হলেও অনুমেয়।
মধ্যবিত্তের এই গল্প আর অল্প কজন পাত্রপাত্রী নিয়েই পরিচালক সাজ্জাদ সুমন ‘কলুর বলদ’ নাটকটি নির্মাণ করেন। নাটকটি ঈদুল ফিতরে চ্যানেল আইতে প্রচারিত হয়েছে। ইতোমধ্যে নাটকটি ইউটিউবে প্রায় সাড়ে ছয় লাখবার দেখা হয়েছে। ইউটিউবে নাটকটি দেখে অসংখ্য প্রবাসীকে ইতিবাচক মন্তব্য করতে দেখা যাচ্ছে। যাইহোক, নির্মাণ যাত্রায় সাজ্জাদ সুমন সরল পথে হেঁটেছেন। কিছু দৃশ্যে অভিনয়শিল্পীদের অভিব্যক্তির ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে নাটকটির শুরুর দিকে গুণী অভিনেত্রী দিলারা জামানের একটি দৃশ্যে এমনটা লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া অভিনেতা রিয়াজ কয়েকটি দৃশ্যে সংলাপ বলার সময় চরিত্রটি নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারেননি কিংবা তার আন্তরিকতা কম ছিল। সম্ভবত এসবই পরিচালকের অবহেলায় হয়েছে। কারণ দিলারা জামান ও রিয়াজের মতো অভিনয়শিল্পীর কাছ থেকে ঠিক যে অভিব্যক্তি প্রয়োজন ছিল সেটা চাইলেই পরিচালক বের করে আনতে পারতেন। এজন্য বলব, পরিচালক এখানে ব্যর্থ হয়েছেন।
নাটকটি দেখে দুই একটি দৃশ্যে অনেকের অসংঙ্গতি মনে হতে পারে কিন্তু অধিকাংশ দৃশ্য দর্শককে কাঁদাবে, ভাবাবে, মনে নাড়া দিবে। বিশেষ করে রিয়াজ-তানিয়ার একান্ত সাক্ষাৎ, আবার বিদেশে যাওয়ার আগে তাদের পুনরায় সাক্ষাতের দৃশ্য, কথোপকথন আর নির্মাণ শৈলী দর্শকের মন ভারাক্রান্ত করবে। আর এসব দৃশ্যের জন্য পরিচালক কোনো শিল্পীকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি। আর এই সুযোগে রাজু চরিত্রের রিয়াজ, শোভা চরিত্রের তানিয়া আহমেদ, বাবা-মা চরিত্রে মামুনুর রশীদ ও দিলারা জামান তাদের অনবদ্য অভিনয় দর্শকদের উপহার দিয়েছেন। আর নাটকটির আবহসংগীত প্রশংসার দাবি রাখে। যা প্রতিটি দৃশ্যের মাধুর্যতা বাড়িয়ে তুলেছে। একজন দর্শকের আবেগ উসকে দিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

