নিউজ ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে করা ছয় জাতির পরমাণু চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে চুক্তিটি বর্জন করে ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় ভুল করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
যদিও ট্রাম্পের ইরান চুক্তি বর্জনের সিদ্ধান্তকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছে ইসরাইল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ তিনটি দেশই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র ইরানের ঘোর বিরোধী।
মঙ্গলবার ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পকে এ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়া থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে আসছিলেন। তবে সবাইকে হতাশ করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি বর্জনের ঘোষণাই দেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তে হতাশ বিশ্ব নেতারা। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য সংকট চরম আকার ধারণ করবে। বিশেষ করে বিশ্বে আবার তেল সংকট দেখা দিতে পারে।
বারাক ওবামা বলেছেন, ‘ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্ত ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার ফল। সাবেক এই মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতে, ‘ক্ষমতা বদল হবেই। কিন্তু যে চুক্তি দেশের বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে করা হয়েছে, তা থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন ট্রাম্প।’
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিও ট্রাম্পের ঘোষণাই বিস্মিত হয়ে বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্তে এটাই প্রমাণিত হবে যে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি রাখে না।’ বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রাশিয়া বলেছে, ‘ইরান চুক্তির সব শর্ত মেনে চলেছে। তবুও এমন সিদ্ধান্ত হতাশাজনক।’
যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের রীতিনীতি লঙ্ঘন করেছে।’ তবে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে না থাকলেও বাকি অংশীদারদের চুক্তি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন ইইউ নেতারা।
ইইউর পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মোঘেরিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নিজের অবস্থান পরিবর্তন করলে আমরা তাদের স্বাগত জানাব।’
পরমাণু চুক্তি কোনও দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয় উল্লেখ করে মোঘেরিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলেই চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে না। আমরা ইরানকে পুরোপুরি বিশ্বাস করি। দেশটি পরমাণু চুক্তির শর্ত যতদিন মেনে চলবে, আমরাও ততদিন পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ থাকব।’
ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয় গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান মোঘেরিনি। যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। একইসযেঙ্গ তিনি এও জানিয়েছেন, ‘আমরা চুক্তিতে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।’
চুক্তির বাকি সবপক্ষকে ইরানের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল।
বেশিরভাগ বিশ্ব নেতাই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেও পরমাণু চুক্তিকে সর্বনাশা উল্লেখ করে আসছিলেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। চুক্তি বর্জনের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়েছেন তিনি। তাতে মনে হতে পারে, ট্রাম্প যেন ইসরাইলকে খুশি করার জন্যই পরমাণু চুক্তি থেকে বের হয়ে গেলেন।
নেতানিয়াহু অনেকদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, ইরান গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে। যদিও তা জোরালোভাবে খণ্ডন করে আসছে ইরান।
মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের ঘোষণা মূলত সৌদি আরব ও ইসরাইলের পক্ষেই গেল। কেননা দেশ দুটিই ইরানকে নিজেদের জন্য বড় হুমকি মনে করে। গতবছর ইরানের ভিতরে অস্থিরতা তৈরিতে এই দুই দেশ ভূমিকা রেখেছিল বলেও ধারণা করা হয়। তাছাড়া সম্প্রতি সৌদি ক্রাউন প্রিন্স সালমানের বিভিন্ন বক্তব্যে ইরান বিরোধিতার জোরালো প্রকাশ দেখা গেছে।
সবমিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে সংকটের কালোমেঘ ঘনীভূত হবে বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ইরানকে অযৌক্তিক ভাবে অভিযুক্ত না করে বরং দেশটিকে সহনীয় মাত্রায় রাখলেই মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি বর্জনের মধ্য দিয়ে আপাতত সে সম্ভাবণা ক্ষীণ বলেও জানাচ্ছেন তারা।

