
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের সাথে নির্বাচনের ক্যাম্পেইন
নিজস্ব প্রতিবেদক : নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঙালিরা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। আলোকোজ্জ্বল জীবন, বৈশ্বিক জীবনযাত্রায় ধাপে ধাপে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া বাঙালি বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেনো বুকের মাঝে দেশের ছবিই আঁকে। এ দেশের আলো-বাতাস, হাওড়-নদী-জল তাদের টেনে আনে দেশের মাটিতে। দেশের উত্তাপে তাদের মন মননে তাপ ছড়ায়, দেশের উন্নয়নে তাদের বুকের ছাতি ফুলে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক ওরা বাঙালি-ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশকে পরিচিত করতে তাদের প্রচেষ্টার অন্ত নেই। আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ দিনে দিনে এগিয়ে চলেছে। বিশ্ব বিভূইয়ে এবং বিশ্ব বাস্তবতায় আলোকিত এবং আলোচিত বাংলাদেশকে বিশেষভাবে পরিচিত করে তুলছেন প্রবাসীরা।
সৈয়দ এম হোসেন বাবু গেল দশকের শুরুর দিকে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সৈয়দ এম হোসেন বাবু বর্তমানে বসবাস করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলসে। বাবু আর বাবুর বন্ধুরা লস এঞ্জেলসের বুকে নিয়ে গেছেন বাংলাদেশকে। লস এঞ্জেলসের বাতাসে উড়াচ্ছেন লাল-সবুজের পতাকা। সৈয়দ এম হোসেন বাবু একজন নাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা। একাধিক জনপ্রিয় শিল্পীর মিউজিক ভিডিও নির্মাতা ও পরিচালক তিনি। বাংলাদেশ ইউনিটি ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ২০১৫ সালে বাংলাদেশের ৪৪তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে বাংলাদেশ ডে প্যারেডের সফল সাংস্কৃতিক পরিচালক। লস এঞ্জেলসের বড় আয়োজন বৈশাখী মেলার একাধিকবার সংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন দেশিনাট্য ক্লাব ও বাংলা পাঠশালা।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সৈয়দ এম হোসেন বাবু’র সাথে কথা হয় গণমাধ্যমের। কথকতায় উঠে আসে আশা-হতাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আর প্রত্যাশার কথা। জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যেতো হলো কেনো-এ দেশেই তো কিছু একটা করতে পারতেন? এমন প্রশ্নে সৈয়দ এম হোসেন বাবু বলেন, ‘এমনই তো হবার কথা ছিল। কিন্তু হলো না। খানিকটা না চাইতেও পাড়ি দিতে হলো দেশ ছেড়ে বিদেশে। তখন যে খুব একটা কিছু করতে পারতাম আমার কাছে তেমন মনে হয় না। অবশ্য পরিবেশ পরিস্থিতি এখন আমাদের অনুকুলে। দেশের মানুষ এখন নিজেরা চাকরি করার বদলে চাকরি দেয়ার কথা ভাবছে। এরপরও বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাজার শুধুমাত্র অদক্ষ-আধাদক্ষ শ্রমিকদের জন্য সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। স্কিলড জবে কিন্তু বাংলাদেশের লোকজন অনেক কম। দেশে আমি নিজে এখনই কিছু করতে পারছি না, তবে অন্যরা যে করছেন না তা নয়। তারা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ নিয়ে ভাবেন; বাংলাদেশকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশেই ক্ষুদ্র-মাঝারি, বড় শিল্প গড়ে তুলছেন-এরা প্রত্যেকেই বুকের ভিতর লালন করেন বাংলা আর বাঙালিকে।’
বুকের ভিতর বাঙালি…. কথা চালু আছে-দেশে ছেড়ে বিদেশে গিয়ে অনেকেই দেশকে হারিয়ে ফেলে; নিজেরাই হারিয়ে যায়…. আপনার বেলায় বিষয়টা কেমন? প্রশ্ন করলে বাবু বলেন-‘অস্তিত্ব বিলীন হলে মানুষের আর কী থাকে। শেকড় ভুলে যাই কি করে; সেই যে অনেক দিন আগে দেখা সিনেমা আলিঙ্গন’র একটি গান আছে না-‘কত ঘুরে এলাম কত দেখে এলাম অশান্ত মনে আমি ছুটে এলাম-আমার গায়ের মত কভু দেখিনি, সে যে আমার জন্মভূমি….’। আমার জন্মভূমির চেয়ে প্রিয় আর কী আছে। বিশ্বে আমাদের ছাড়া মা-মাটি-ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে এমন কোন নজির আছে কী। নেই। সুদূর বিদেশ-বিভূঁইয়ে আমি-আমরা অনেকে মিলে অনেক না পাওয়ার মাঝেও বাংলাদেশকে আঁকড়ে আছি। আমাদের সন্তানরা যেনো দেশ-ভাষা হারিয়ে না ফেলে এ জন্যে এখানে ‘বাংলা পাঠশালা’ গড়ে তুলেছি। এখানে ছেলেমেয়েদের প্রমিত বাংলা শেখানো হয়’।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন
দেশের বাইরে আছেন; দেশে নানা বিভাজন আছে, আছে নানা সমস্যা, দেশের উত্তাপ-নিরুত্তাপ কতোটা ভাবায়? এমন প্রশ্নে বাবু বলেন-‘সাকিব-তামিমরা যখন ছক্কা হাঁকায় আমাদের বজ্রমুষ্টি তখন এলএ’র আকাশ ফুঁড়ে ওঠে জানান দেয়, মিরাজের বলে যখন মারকুটে ব্যাটসম্যান ধরাশায়ী হয় তখন আমাদের উল্লাসে এখানকার বাসিন্দারা বুঝে ফেলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতিটা ক্রান্তিলগ্নেই প্রবাসীরা ছিল- আছে- থাকবে। সে ’৭১ হোক, ’৯০ কিংবা ২০১৫ হোক। যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিচারের দাবি হোক কিংবা আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াও হোক- সবগুলি ইস্যুতেই আমরা প্রবাসীরা আমাদের অবস্থান থেকে প্রতিবাদী হয়ে উঠি- জানান দেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই- আগুনসন্ত্রাস বন্ধ চাই।
আমরা প্রবাসে পহেলা বৈশাখ পালন করি; মঙ্গল শোভাযাত্রা করি। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’র সুর ধরি। বাঙালির ঐতিহ্য ধারন করে আমাদের সন্তানরা যেমনি উৎসব পালন করে তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদেরও সম্পৃক্ত করি আমাদের উৎসবে।
এই তো নিকট অতিতে শহীদ পরিবারের সদস্য এজাজ আহমেদ, শিলা মোস্তফা ও অন্যান্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী লস-এঞ্জেলস প্রবাসী বাংলাদেশিরা স্থানীয় পাকিস্তান কনস্যুলেটের সামনে ‘পাকিস্তান পার্লামেন্টে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির বিরুদ্ধে যে নিন্দা প্রস্তাব’ গ্রহণ করা হয় তার প্রতিবাদে আমরা পাকিস্তান কনস্যুলেট ঘেরাও কর্মসূচি ও স্বারকলিপি পেশ করে আমাদের অবস্থান তাদের জানিয়ে দেই’।
বর্তমানে আমাদের দেশ, দেশের পরিবেশ, উন্নয়ন, রাজনীতি… সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? এ প্রশ্নে বাবু বলেন- ‘অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সার্বিকভাবেই ভালো। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে সুযোগ্য নেতৃত্বে। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ এখন ‘ফেলনা’ নয়, ‘ফ্যাক্টর’। এর পুরো ক্রেডিট বর্তমান সরকারের। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতি নিজস্ব ভিতে দাঁড়িয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের মর্যাদা এবং সম্মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব ব্যবস্থায় বাংলাদেশ যে সকল বিষয়ে বিশেষভাবে এগিয়ে আছে এবং কার্যত কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে তার মধ্যে অন্যতম প্রবাসে প্রবাসীদের সাফল্য এবং কর্মতৎপরতা। বিশ্বের দেশে দেশে প্রবাসীরা তাদের মনন, মেধা যোগ্যতার এবং দক্ষতার সাথে কাজ করে চলেছেন। প্রবাসীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করে কেবল তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা এবং নির্ভরতার পরিচয় কেবল দিচ্ছে তা নয়, প্রবাসীরা বিশ্ব বিভূঁইয়ে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করে চলেছেন। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ এবং অনবদ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে বৈদেশিক মূদ্রা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সাফল্য তথা এগিয়ে চলা এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় বিশেষ গতি সঞ্চারিত হওয়ায় আমাদের জাতীয় অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী হলেও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে অধিকতর সুসংহত এবং শক্তিশালী করছে তা স্পষ্ট, প্রবাসীরা পরিবার পরিজন রেখে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বিদেশে অবস্থান করছেন। তাদের পাঠানো অর্থে পরিবার পরিজনের জীবন ধারনের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী হচ্ছে। আমাদের প্রবাসীরা সত্যিকার অর্থে দেশের জন্য গর্ব এবং মর্যাদার প্রতিবিম্ব। প্রবাসে আমরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করি। দেশের সুনাম রক্ষায় নিরন্তর কাজ করে চলেছি’।
ব্যক্তি জীবনের কথা জানতে চাইলে বাবু বলেন- ‘পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা করতাম। ’৮০-র দশকজুড়ে লাইট ওয়েট, লাইট মিডল ওয়েটে বক্সিংয়ে চ্যাম্পিয়ন ছিলাম। অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক আমার ঝুলিতে আছে। আছে আন্তর্জাতিক বক্সিং প্রতিযোগিতায় একাধিক পদক। বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়োজিত বক্সিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছি’।

