নিজস্ব প্রতিবেদক : কুমিল্লায় বিএনপির প্রার্থীকে বিজয়ী করে সেখানকার জনগণ ‘অপশাসনের বিরুদ্ধে’ তাদের রায় দিয়ে নীরব বিপ্লবের মাধ্যমে সরকারকে এক প্রকার বার্তা দিতে চেয়েছে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।
তাদের বিশ্লেষণ, কুমিল্লায় জনগণ ‘মোটামুটি’ ভোট দিতে পেরেছেন। সরকার প্রভাব বিস্তার না করলেও যে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে কুমিল্লা তার দৃষ্টান্ত। তবে একটি নির্বাচন দিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা বিশ্লেষণের সুযোগ নেই জানিয়ে তারা বলছেন, ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত রাখতে সরকারের উচিত বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় বসা।
বৃহস্পতিবার দ্বিতীয়বারের মতো কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১১ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু।
বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মনিরুল হক পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মেয়র প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৭৬৩ ভোট।
কুসিকে মোট ভোটার ২ লাখ ৭ হাজার ৫৬৬। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ২ হাজার ৪৪৭ জন আর নারী ১ লাখ ৫ হাজার ১১৯ জন।
নির্বাচনে বিএনপির জয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কুমিল্লার স্থানীয় বাসিন্দা ও দলটির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘জনগণ এই সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। যে কয়েকস্থানে কারচুপি, জোর করে ব্যালটে সিল এবং অনিয়মের ঘটনা ঘঠেছে; সেটি না হলে ভোটের ব্যবধান দ্বিগুণ হতো।’
জনগণ ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে বিএনপি প্রতিটি নির্বাচনে জয় পাবে দাবি করে দলটির এই নীতি নির্ধারক বলেন, ‘জনগণ ধৈর্য ধারণ করে ছিল। কুমিল্লায় ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তারা তাদের রায় দিয়ে দিয়েছেন। প্রমাণ হয়েছে সুযোগ পেলে তারা ধানের শীষকেই বিজয়ী করবে। এটা নীরব বিপ্লব। সরকারের দুঃশাসন, ফ্যাসিবাদে দেশের মানুষ যে কতটা ক্ষুদ্ধ, সেটির প্রতিফলন ঘটিয়েছে কুমিল্লায়।’
বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের দলের প্রধান সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান মনে করেন, জনগণ পক্ষে থাকায় জয় ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও ক্ষমতাসীনরা সফল হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘অবাধ নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টি হলে বিএনপি সব জায়গায় জিতবে। সেজন্য সরকার সুষ্ঠু নির্বাচনকে ভয় পায়। তবে আশার কথা হচ্ছে, কুমিল্লায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। এটি বড় পাওয়া।’
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘তারা (আওয়ামী লীগ) বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। জনগণ বিএনপির পক্ষে ছিলো তাই জনগণের পাহারায় তারা সেটি পারেনি। কারচুপি, নেতা-কর্মীদের হয়রানি, টর্চার, গ্রেপ্তার করেও ধানের শীষের জয় রুখতে পারেনি। এটা বিএনপির জন্য বড় বিজয়।’
নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক জায়গায় ক্ষমতাসীনদের ভয়ে ভোটাররা নৌকার ব্যাচ পরে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। এটা নীরব বিপ্লব। যদি জনগণ শেষ পর্যন্ত নির্বঘ্নে ভোট দিতে পারতো ভোটের ব্যবধান অনেক বেশি হতো।’
তবে ভোটের হার কম কাস্ট হয়েছে দাবি করে এ নিয়ে অসেন্তাষ প্রকাশ করেন বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী মনিরুল ইসলাম সাক্কু।
তিনি বলেন, ‘দুই লাখ ৭ হাজার ৩৮৫ ভোটের মধ্যে এক লাখ ২০ হাজার ভোট কাস্ট হয় নাই। কেন কাস্ট হয় নাই? এইডার দায়িত্ব কে নিব? আকাশ ভালো (আবহাওয়া ভালো), সবই ভালো, মানুষ কেন আসল না? যদি এক লাখ ৭০ হাজার ভোট কাস্ট হইতো, আমি এক লাখ ২০ হাজার ভোট পাইতাম। মার্কাটা ধানের শীষ। কিছু নিজের ইমেজও আছে, মানুষের বিপদে-আপদে খাড়াইছিলাম, মানুষের কথা কইছি।’
নির্বাচন কমিশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে অসেন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দুঃখ হয়, কী করছে, সাধারণ জনগণ দেখছে। আইনশৃঙ্খলা পুরা ব্যর্থ, সম্পূর্ণ ব্যর্থ। নির্বাচন কমিশন আমারে যে কথাগুলো বলছিল, এগুলো তারা রাখে নাই, কিছুই করে নাই।
‘প্রতিটি কেন্দ্রে তারা লোক দিয়া, পুলিশের সামনে অতর্কিত হামলা করে ঢুইকা যায়। খাবলা দিয়া সিল মাইরা দেয়। আমরা হয়রান হয়ে গেছি দৌড়াতে দৌড়াতে। যেখানে শুনছি দৌড়াই গেছি। তো এটা কি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড?”
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, কুমিল্লার নির্বাচনের মাধ্যমে একটি বিষয় পরিষ্কার, সেটি হচ্ছে জনগণ ভোট দিতে চায় এবং ভোট প্রয়োগের পরিবেশ তৈরি হলে তারা কেন্দ্রে আসবে।
তিনি বলেন, ‘কুমিল্লা সিটির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি প্রক্রিয়ার শুরু হতে পারে। মাত্রই শুরু হয়েছে। এখন এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে রাখা সম্ভব কী না সেটিই দেখার বিষয়।’
আমির খসরু বলেন, ‘কুমিল্লায় মোটামুটি একটি ভোট দেওয়ার পরিবেশ তৈরি হলেও আবার বেশ কয়েকস্থানে বাধাগ্রস্থও হয়েছে। এরপরও বিএনপি জয়ী হয়েছে সেটি জনসমর্থনের কারণে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত জনগণ ভোট দিতে পারলেও বিকেলের দিকে অনিয়মগুলো শুরু হয়। তা না হলে ভোটের ব্যবধান বাড়তো।’
কুমিল্লায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা নিয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চাইলে দলটির এই নেতা বলেন, ‘একটি স্থানীয় নির্বাচনে ইসির ভূমিকা দেখে কিছু বলা যাবে না। তারা ভালো না মন্দ সেজন্য আগামীতে তাদের পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগে অনেকগুলো পরীক্ষা রয়েছে ইসির।’
এদিকে কুমিল্লায় বিএনপির প্রার্থীর জয়কে ‘গণতন্ত্রের জয়’ হিসেবে দেখছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু।
তিনি বলেন, ‘এটি জনগণের জন্য বড় জয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে যারা আন্দোলন করছে তাদের বিজয়। কুমিল্লার নির্বাচন সরকারকে একটি বার্তা দিয়েছে জনগণ। কারণ বিএনপির গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।’
তবে অনেক বিতর্কের পরেও মানুষ মোটামুটি ভোট দিতে পারায় সন্তোষ প্রকাশ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘যদিও বেশ কয়েক জায়গায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। এখন আগামীতে সুষ্ঠুভাবে ভোট দেওয়ার এই ধারাকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় এবং একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন করা যায়; সেজন্য সরকারে উচিত আলোচনায় বসা।’
তিনি বলেন, ‘প্রমাণ হয়েছে, সরকার যদি প্রভাব বিস্তার না করে ইসির অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। এখন জাতীয় নির্বাচনে কীভাবে সরকারের প্রভাব কমিয়ে ইসিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া যায় সেজন্য খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার আলোচনায় বসা উচিত। আর সরকারকেই এই উদ্যোগ নিতে হবে। ’

