নিজস্ব প্রতিবেদক : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ই-ভোটিং চালু করার চিন্তা বা পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে বিএনপি। দলটি বলছে, এতে দুরভিসন্ধি আছে। এই পদ্ধতি চালু হলে ভোট কারসাজি করা সরকারের জন্য সহজ হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিং করে দলটির এই অবস্থানের কথা জানান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ই-ভোটিং করার যে কথা বলেছেন, এটি সরকারের ভোটারবিহীন নির্বাচন করার আরেকটি ডিজিটাল প্রতারণা কি না, তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক সংশয় দেখা দিয়েছে। আমরা মনে করি, তাঁর (প্রধানমন্ত্রী) ঘোষণা জনগণকে আরেকটি তামাশার বায়োস্কোপ দেখানো ছাড়া অন্য কিছু নয়।’
গত বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সব বিধিবিধানের সঙ্গে সংগতি রেখে মানুষের ভোটাধিকার অধিকতর সুনিশ্চিত করার স্বার্থে আগামী নির্বাচনে ই-ভোটিং প্রবর্তন করার পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
এর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে রিজভী দাবি করেন, এটি জনগণের ভোটকে নিজ উদ্দেশ্য সাধনে জালিয়াতি করার প্রচেষ্টামাত্র। এটি প্রধানমন্ত্রীর আরেকটি ভেলকিবাজিরই বর্ধিত প্রকাশ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এখন জনগণের দৃষ্টিকে সিইসির (প্রধান নির্বাচন কমিশনার) দিক থেকে অন্যত্র সরানোর জন্য ই-ভোটিং ব্যবস্থার আরেকটি ম্যাজিক জনগণের সামনে প্রদর্শন করছেন।
রিজভী নতুন সিইসি কে এম নুরুল হুদা সম্পর্কে বলেন, ‘উনি কে? বিসিএস ৭৩ ব্যাচের অফিসার। ৭৩ ব্যাচের ডাকনাম হচ্ছে তোফায়েল সার্ভিস। অর্থাৎ কোনো পরীক্ষা-টরীক্ষা নাই, জাস্ট সুপারিশ দিয়ে এটা করা হয়েছে। এরা চাকরিজীবনে কোনো যোগ্যতাই দেখাতে পারেন নাই। সেই ব্যক্তিকে সিইসি করা হয়েছে, তাদের (আওয়ামী লীগ) কথা অনুযায়ী চলবে বলে।’
বিএনপির এই নেতা বলেন, এক-এগারোর সময়কার সিইসি এ টি এম শামসুল হুদা ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) চালুর প্রস্তাব করেছিলেন। তখন বুয়েটসহ কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ এবং প্রায় সব রাজনৈতিক দল সেটির বিরোধিতা করেছিল। সদ্য বিদায়ী সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদও এই পদ্ধতিটি চালুর জোর প্রচেষ্টা চালান। পরীক্ষামূলকভাবে ২০১০ সালে প্রথম চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কয়েকটি কেন্দ্রে এই পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ হয়। ওই সময়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে আপত্তি তোলায় কাজী রকিবউদ্দীন ইভিএম চালু থেকে সরে আসেন।
রিজভী বলেন, ভারত, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ ই-ভোটিং পদ্ধতি চালু করলেও এর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে দূর থেকে হ্যাক করা সম্ভব বলেই স্বচ্ছ নির্বাচনের স্বার্থে এ পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে সেসব দেশে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনো অনেক মানুষ নিরক্ষর। এত টেকনিক্যাল বিষয় বোঝা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য। এই পদ্ধতিতে ই-ভোটিংয়ের সার্ভার সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সুতরাং, সরকারের জন্য ভোট ম্যানিপুলেট (কারসাজি) করা খুবই সহজ হবে।’
ই-ভোটিং বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক অন্যান্য দলও প্রথম আলোর কাছে প্রায় একই রকম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ বলেন, ইভিএম পদ্ধতির অনেক ত্রুটি আছে। ত্রুটিগুলো সেরে একটি কারণে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বর্তমানে দিনের বেলায় ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। আমার চন্দনাইশ পৌরসভায় ভোর পাঁচটায় ভোট হয়ে গেল। অন্তত এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সব রাজনৈতিক দল থেকে একজন করে বিশেষজ্ঞ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ই-ভোটিং হতে পারে।’
এই বিষয়ে বিএনপি জোটের বাইরের ধর্মভিত্তিক দুটি দল ইসলামী ঐক্যজোট ও ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান ভিন্ন। গত বছরের জানুয়ারিতে বিএনপি জোট ছেড়ে আসা ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী প্রথম আলোকে বলেন, এ পদ্ধতিতে নির্বাচন হতে পারে। কারণ, এখন সবকিছুই আধুনিক পদ্ধতিতে হচ্ছে। আর ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনুছ আহমাদ বলেন, ‘ইভিএম বিষয়টি ভালো। তবে এখানে চাতুরতার সুযোগ আছে। এ জন্য এ পদ্ধতিকে অ-বিতর্কিত বলা যায় না।’

