
২০১৩ সালের ১৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে বীজ বর্ধন খামার স্থাপন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন
হাসান রেজা : দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করে বীজের আমদানি নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে পটুয়াখালীর দশমিনায় গড়ে তোলা বীজ বর্ধন খামার। দশমিনার ৩টি চরে অধিগ্রহণকৃত জমিতে ‘দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে (বরিশাল ও পটুয়াখালী) বীজ বর্ধন খামার স্থাপন প্রকল্প’ নামে পরিচিত দেশের বৃহত্তম এই বীজ বর্ধন খামারটি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।
বর্তমানে এই খামারটিতে উৎপাদিত হচ্ছে বিভিন্ন ফসলের মানসম্পন্ন জাতের বীজ। খামারে উৎপাদিত গুণগত মানসম্পন্ন বীজ দক্ষিণাঞ্চলসহ সারাদেশে সরবরাহ করা হচ্ছে। এভাবে এই বীজ বর্ধন খামারটি দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণ করে বাড়তি খাদ্য উৎপাদনে যেমন অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে তেমনি বীজের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে আমদানি নির্ভরতা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলে জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি এটি একনেকে অনুমোদিত হয়। জানুয়ারি ২০১২ হতে জুন ২০১৪ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করে ২৪৪ কোটি ৯৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। পরবর্তীতে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল জুন ২০১৫ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে প্রাক্কলিত ব্যয় (১ম সংশোধিত) ২৫৭ কোটি ৫৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয় বলে জানা গেছে। নদীবিধৌত পলিমাটিতে অত্যন্ত উর্বর পটুয়াখালীর দশমিনা এবং বরিশালের সদর উপজেলাকে এ প্রকল্পের এলাকা হিসেবে ধরা হয়েছে। ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই খামারটি উদ্বোধন করেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আনুভূমিক ও লম্বিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি করে এসব এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দারিদ্র দূরীকরণসহ প্রকল্প এলাকায় জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। ধান, গম, আলু, ভুট্টা, ডাল ও তৈলের ব্রিডার (মৌল) বীজ হতে ১১ হাজার ৫শ’ মেট্রিক টন ভিত্তি বীজ উৎপাদন, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান হতে উল্লেখিত ফসলের ব্রিডার বীজ ক্রয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাত বিশেষ করে লবণাক্ততা, খরা, জলমগ্নতা সহিষ্ণু জাতের বীজ উৎপাদন বৃদ্ধি, খামারে উৎপাদিত বীজের গুণগতমান পরীক্ষা, প্রক্রিয়াজাত এবং সংরক্ষণ করে এসব বীজ সরবরাহের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করাসহ মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করছে এ প্রকল্পটি।
সংশ্লিষ্টরা আরো জানিয়েছেন, দেশে গুণগত মানসম্পন্ন বীজ বিশেষত ভিত্তিবীজের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিএডিসি সারাদেশে কৃষকদের মাঝে মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ করে চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছে। বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি মানসম্পন্ন বীজের মোট চাহিদার ৮.৪ শতাংশ সরবরাহ করে। প্রতিবছর এই সরবরাহের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের মধ্যে সরবরাহের হার ২৩ শতাংশে উন্নীত হবে বিএডিসি’র সূত্রটি জানিয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন এবং সেইসব জাতের মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন। কিন্তু, নতুন জাতসমূহের বীজ বর্ধিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় খামার এলাকা বিএডিসি’র নেই। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখিত প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মতামত দিয়েছে কৃষি সংশ্লিষ্টরা। এর পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে অধিক সমৃদ্ধি আনয়ন এবং বিভিন্ন শস্যের লবণাক্ততা সহনশীল জাতের বীজ বর্ধিতকরণেও এই প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাস্তবিক এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে বীজবর্ধন এ খামারটি গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প পরিচালক মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, উৎপাদন কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আমন মৌসুমে ৪৮০ একর জমিতে ব্রি ধান ৫১, ৫২, বিনা ৭ ও বিআর ২৩ জাতের ধান বীজ রোপন করা হয়েছে যা থেকে ৭৬৩.৪০ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া, আগামী রবি মৌসুমে প্রকল্প এলাকার ২৯৫ একর জমিতে বোরো (ব্রি ২৮), ভুট্টা, গম (বারি ২৫), চিনা (তুষার), সরগম, কাউন, আলু, মসুর (বারি), স্থানীয় খেসারী, সূর্যমুখীর বীজ বপনের মাধ্যমে ৪৮৫.৯০ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। খরিফ-১ মৌসুমে ১১০ একর জমি বপনের মাধ্যমে ৩৫.২০ মেট্রিক টন মুগডাল ও তৈল বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০১৩-১৪ অর্থবছরে আমন মৌসুমে ৩৮২ একর জমি বপনের মাধ্যমে ২৮০.৪৮ মেট্রিক টন বিভিন্ন জাতের আমন বীজ, রবি মৌসুমে ৩৬২.৭০ একর জমি বপনের মাধ্যমে বোরো ধান, গম, মসুর, খেসারী ও সূর্যমুখীর ৮৬.৫৮০ মেট্রিক টন বীজ এবং খরিফ-১ মৌসুমে ২৫০ একর জমি বপনের মাধ্যমে ১৩.৮ মেট্রিক টন ডাল ও তৈল বীজ উৎপাদন করা হয়েছে বলে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে মোট ১২৫ একর জমি বপন করে ফেলন (বারি-১), মুগ (বারি ৫ ও ৬), তিল (বারি ৩ ও বিনা ২) এবং সয়াবিনের মোট ৪.৪৩ মেট্রিক টন বীজ, রবি মৌসুমে ৬৮ একর জমি থেকে ১১.২৬ মেট্রিক টন এবং খরিফ-১ মৌসুমে ১২৫ একর জমি থেকে বিভিন্ন ফসলের ৪.৪৩ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদন করা হয়েছে বলে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে।

