লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে কমলনগর ও রামগতি উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ।
ভাঙনে তলিয়ে গেছে দুই উপজেলার হাজার হাজার বসতবাড়ি, ফসলি জমি, হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
সরেজমিনে উপজেলার মেঘনা নদীর তীরবর্তী লুধুয়া ফলকন, চরফলকন ও চরজগবন্ধু গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, ওইসব গ্রামে মেঘনার ভাঙনের তাণ্ডব চলছে। যাদের বসতভিটা মেঘনায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে তারা ব্যস্ত ঘর-দরজা ও গাছ-পালা অন্যত্র সরানোর কাজে। আবার যাদের ঘর-বাড়ি ভাঙনের হুমকির মুখে তারা ব্যস্ত রয়েছেন মাথা গোঁজার জন্য এক টুকরো জমির সন্ধানে। ভাঙনকবলিত স্থানীয় লুধুয়া বাজারের ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত দোকানঘর সরিয়ে নিতে।
এদের মধ্যে কেউ কেউ অন্য এলাকায় গিয়ে এক টুকরো জমি নিয়ে কোনো রকম ঠাই নিচ্ছেন। আবর কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে থাকছেন। আর অধিকাংশেরই ঠিকানা হচ্ছে সরকারি বেড়িবাঁধের ওপর। আয়-রোজগারের মাধ্যম হারিয়ে সেখানে মানবেতর দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের।
লুধুয়া বাজারের ব্যবসায়ী মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়ে শত বছরের পুরোনো এ বাজারটি নদীতে বিলীন হওয়ার পথে। ইতোমধ্যে বাজারের ৯০ ভাগ দোকানঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হয়ে গেছে ওই বাজারের শত বছরের পুরোনো জামে মসজিদটিও।
কথা হয় চরফলকন গ্রামের কৃষক আবু ইউসুফের সঙ্গে, ভাঙনের মুখে পড়া বসতভিটাটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে খুবই ব্যস্ত তিনি। ঘর-দরজা নিয়ে কোন এলাকায় যাবেন প্রশ্ন করলে হাও-মাও করে কেঁদে ওঠেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,‘আমগো এখন যাওয়ার কুনু জাইগা নাই, কই যামু জানি না, ফটু তুইল্যা কি হইবু? কতজনে ফটু তুইল্যা নিল কিন্তু আমাগো ভাইগ্যের কিসু হইলু না।’
কিছুদিনের মধ্যে মেঘনার বুকে হারিয়ে যাবে চর ফলকন উচ্চ বিদ্যালয়। নদীভাঙনের প্রভাব সবচেয়ে বেশী পড়ে উপকূলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে। বিদ্যালয় অন্য জায়গা স্থানান্তরিত হলে ঝরে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী।
সূত্রমতে, মেঘনার ভাঙন রোধে সরকার ইতোমধ্যে এক কোটি ৯৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দিলেও কাজ হয়েছে রামগতি উপজেলা শহরের আলেকজান্ডার এলাকায়। কিন্তু এ প্রকল্পের মধ্যে কমলনগর উপজেলায় এক কিলোমিটার কাজ করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত সে ব্যাপারে কার্যকর কোনো ভূমিকা নেওয়া হয়নি। এ কারণে নদী ভাঙনের তীব্রতা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। ভাঙন রোধে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে লক্ষ্মীপুরের মানচিত্র থেকে কমলনগর উপজেলা হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
উপজেলার পাটারীরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট একেএম নুরুল আমিন জানান, গত একমাসে তার ইউনিয়নের অর্ধশত পরিবারের বসতভিটা মেঘনা গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এভাবে প্রতিনিয়তই মেঘনার ভাঙন চলছে। ভাঙনরোধে কাজ শুরু করার জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে জোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল্যা আল-মামুন জানান, মেঘনা নদীর ভায়াবহ ভাঙন থেকে কমলনগর উপজেলাকে রক্ষায় ‘কমলনগর-রামগতি মেঘনার তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের’ আওতায় একনেকে ১৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় রামগতির আলেকজান্ডারে বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। খুব শিগগিরই কমলনগর উপজেলায়ও বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী জানান, রামগতি ও কমলনগর উপজেলাকে মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার প্রয়োজন। ইতোমধ্যে রামগতি উপজেলাকে রক্ষায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে চলছে বাঁধ নির্মাণ কাজ। তবে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের অভাবে কমলনগর উপজেলাকে নদী ভাঙন থেকে রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে নদী ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

