নিজস্ব প্রতিবেদক : ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর তিনদিনেও সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ঠিক করতে পারেনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ। প্রাথমিক তথ্যমতে, ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৩ থেকে ৪’শ কোটি টাকা।
ক্ষতিগ্রস্ত জেলা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রোয়ানুতে লণ্ডভণ্ড ১৫ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত দেড় লাখ পরিবার। প্রাণহানি কম হলেও রোয়ানুর ছোবলে ব্যপক ক্ষতি হয়েছে কৃষি ও অবকাঠামো খাতে।
দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ বলেছেন, ‘রোয়ানুর ক্ষতির পরিমাণ জানতে কাজ চলছে। আরো এক/দু’দিন সময় লাগবে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পেতে।’
প্রাথমিক তথ্যমতে, ২৩ জনের মৃত্যু, ২৩ হাজার সম্পূর্ণ ও ৬৯ হাজার ঘরবাড়ির আংশিক ক্ষতি হয়েছে। বাঁশখালীতে ১৫ কি.মি. এবং হাতিয়া, ভোলা ও তজুমদ্দিনসহ বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ ভেঙেছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা দেড় লাখের কিছু কম-বেশি। এর মধ্যে ৩০ হাজার পরিবার ব্যপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চট্টগ্রামে ৭৬ হাজার ৬৪২ পরিবার, কক্সবাজারে ৭ হাজার ৯৪৫, নোয়াখালীতে ৬ হাজার ৫০০, লক্ষ্মীপুরে ২ হাজার ৫০০, ফেনীতে ১৩৩, চাঁদপুরে ৩ হাজার, বরিশালে ২ হাজার ৮০০, ভোলায় ৪ হাজার, পটুয়াখালীতে ২ হাজার, পিরোজপুরের ২ হাজার ২০, খুলনার এক হাজার ১০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাঁধ ভেঙে গেছে তিন জেলায়। ফেনীতে ১০, বরিশালে ৭ এবং খুলনায় ৭ বাঁধ ভেঙেছে। ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রামে ১১, কক্সবাজারে ৪, নোয়াখালী ও ভোলায় তিনজন করে নিহত হয়েছেন। লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও পটুয়াখালীতে একজন করে মারা গেছেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রসাশন জানিয়েছে, জেলায় প্রায় দেশ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। বরিশাল ও কক্সবাজারেও তাণ্ডব চালিয়েছে রোয়ানু।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড় ও ২০০৭ সালে সিডরে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল। আইলায় ক্ষতি হয়েছে অন্তত ২ মিলিয়ন ডলার। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুতে ক্ষতির পরিমাণ গিয়ে ঠেকতে পারে তিন থেকে চার’শ কোটি টাকায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ঘূর্ণিঝড়, সিডর, আইলার পর উপকূলীয় বাঁধে বড় সংস্কার কাজ হয়নি। তাই রোয়ানুর তোড়ে সেগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ১০০ কি.মির বেশি বাঁধ পানির তোড়ে ভেসে গেছে।
পাউবোর সহকারী প্রকৌশলী রিপন কর্মকার বলেন, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে কয়েক জেলায় বেড়ি বাঁধ ভেঙে গেছে। দীর্ঘ সময় সংস্কার না করায় এমনটা হয়েছে। পানির তোড়ে কত কি.মি. বাঁধ ভেসে গেছে তা চূড়ান্ত হয়নি।
দুর্গত কয়েক জেলায় লক্ষাধিক পরিবার এখন পানিবন্দি। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ায় খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন অন্তত ৫০ হাজার পরিবার। ত্রাণ সহায়তা দেয়া হলেও তা অপ্রতুল।
জলোচ্ছাসে ও বাঁধ ভেঙে ভেসে গেছে বহু গবাদি পশু, মাছের ঘের ও নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি। লণ্ডভণ্ড হয়েছে গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তার। অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন হয়নি। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাব দেখা দিয়েছে। অনেক জায়গায় ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেছেন, ‘সচেতনতা বাড়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুর সংখ্যা কমছে। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে ব্যপক প্রাণহানি এড়াতে উপকূলীয় এলাকায় আবহাওয়া বার্তা আধুনিকায়নের পাশাপাশি অন্তত আরো ২০০০ হাজার ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্র নির্মাণ করা দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘অবকাঠামোগত ক্ষতি কমাতে রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি ঘূর্ণিঝড় সহনীয় অর্থাৎ আরও শক্তিশালী করতে হবে। উপকূলীয় এলাকার ঘরবাড়ি কেমন হওয়া প্রয়োজন তা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। সরকারের উচিত এ নিয়ে সামগ্রিক পরিকল্পনা করে অগ্রসর হওয়া।’

