
খামারে উৎপাদিত আমন ধান মাড়াইয়ে ব্যস্ত শ্রমিকরা
হাসান রেজা : প্রতিকূলতা সহিষ্ণু ও উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন ফসলের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত দশমিনা বীজ বর্ধন খামার বদলে দিয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থা। ৩ বছর আগে ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই খামার উদ্বোধন করেছিলেন। এই অল্প সময়ের ব্যবধানে খামারটি আজ বিভিন্ন ফসল ও বীজের ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। খামারে উৎপাদিত বিভিন্ন ফসলের বীজ কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে তেমনি ভূমিকা রাখছে এ অঞ্চলের দারিদ্র্য দূরীকরণসহ অর্থনীতিতে ধনাত্মক প্রবাহ সৃষ্টিতে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনুকূল আবহাওয়া এবং সঠিক ও সুষ্ঠু তদারকির কারণে এই খামারের উর্বর পলিমাটিতে বোনা বিভিন্ন ফসলের বাম্পার ফলন হচ্ছে এবং প্রতিকূলতা সহিষ্ণু ও উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ অবদান রাখছে। তারা জানিয়েছেন, এ অঞ্চলে এক সময় শুধুমাত্র ডালজাতীয় ফসলের আবাদ হতো। কিন্তু দশমিনা বীজ বর্ধন খামারে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন দেখে এ অঞ্চলের কৃষকরা এখন আমন, বোরো গম, আলুসহ বিভিন্ন ফসল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। স্থানীয় জাতগুলোর উপর এখানকার কৃষকের নির্ভরশীলতা কমে আসার পাশাপাশি তারা উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন ফসল চাষে ঝুঁকছে; সেইসাথে এ অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ পতিত জমি আবাদের আওতায় আসছে।
প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, খামারে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, ডাল ও তেলজাতীয় ফসল এবং এসব ফসলের মৌল বীজ থেকে ভিত্তি বীজের উৎপাদন প্রতি বছর কাঙ্ক্ষিত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জানা গেছে, ২০১৩ সালে খামারে পরীক্ষামূলকভাবে শুধুমাত্র ডাল ও তৈলজাতীয় ফসল চাষ করা হয় এবং ১৮.৩০ মে. টন বীজ উৎপাদন করা হয়। এরপর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিভিন্ন ফসলের ৩৮০.৮৬ মে. টন বীজ উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে আমন ধান বীজ ২৮০.৪৮ মে. টন, বোরো ধান বীজ ২৯.০২ মে. টন, ১.৪০ মেট্রিক টন গম বীজ, ৮০.১৪ মেট্রিক টন ডাল ও তৈল বীজ উৎপাদিত হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিভিন্ন ফসলের ৫৪১.১৩ মে. টন বীজ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে আমন ধান বীজ ২৩০ মে. টন, বোরো ধান বীজ ২১০ মে. টন, গম বীজ ১৭.৮৭ মে. টন, আলু বীজ ৫৫ মে. টন, ডাল ও তৈলবীজ ২৬.৩৫ মে. টন, বিনা ০.৮৮ মে. টন, কাউন ০.৮৮ মে. টন এবং সরগম বীজ ১.৫০ মে. টন উৎপাদিত হয়।

খামারে উৎপাদিত আলু বাছাইকরণে ব্যস্ত শ্রমিকরা
খামার সূত্র জানিয়েছে, চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিভিন্ন ফসলের ১,০৭০ মে. টন বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যে খামারের প্রায় ৮০০ একর জমি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সমাপ্ত আমন মৌসুমে খামারের ৪০০ একর জমিতে ব্রি ধান-৫২ এবং ২০ একর জমিতে বিনা-৭ আবাদ করা হয় এবং এ দু’টি ফসলের ৩১০ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া, চলতি রবি মৌসুমে বিভিন্ন ফসলের ৫১২ মে. টন বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যে খামারের ৩১২ একর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০ একর জমিতে ব্রি ধান-২৮ চাষ করা হয়েছে যা থেকে ৩৮০ মে. টন বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। খামার সূত্র জানায়, ৬৫ মে. টন আলু ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে যেগুলো বর্তমানে প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য বিএডিসি’র হিমাগারে রাখা হয়েছে। এছাড়া, ৫ একর জমিতে সূর্যমুখী এবং ৩ একর জমিতে কাউনের চাষ করা হয়েছে যা থেকে দু’টি ফসলের ১.৫০ মে. টন করে বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রকল্প অফিস।
খরিফ মৌসুমে ৬৫ একর জমিতে মুগ, তিল ও ফেলন আবাদ :
এদিকে সদ্য শুরু হওয়া খরিফ মৌসুমে খামারের ৬৫ একর জমিতে মুগ, তিল ও ফেলন আবাদ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ১৫ মে. টন মুগ ডাল বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যে ৫০ একর জমি, ১.২৫ মে. টন তিল বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যে ৫ একর এবং ৩ মে. টন ফেলন বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যে ১০ একর জমি আবাদ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
দশমিনা বীজ বর্ধন খামারে বিভিন্ন ফসলের বাম্পার ফলনে আশপাশের উপজেলার কৃষকরা উচ্চ ফলনশীল জাত আবাদে উৎসাহী হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দৈনিক পাঞ্জেরী’র পটুয়াখালী প্রতিনিধি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাউফল উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. মোশারেফ হোসেন খান দশমিনা বীজ বর্ধন খামারের উৎপাদন দেখে গত দুই ছর ধরে তার নিজের জমিতে বোরো আবাদ করছেন এবং ভালো ফলনও পাচ্ছেন। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, তার নিজের ইউনিয়ন কালাইয়ে গত বছর ২৭ একর জমিতে বোরো আবাদ করেন। এর মধ্যে ১৫ একর জমিতে ব্রি ধান-২৮ আবাদ করেন যা থেকে তিনি প্রায় ২০ টন ফলন পেয়েছেন। এ ছাড়া, ১২ একর জমিতে ব্রি-৪৭ আবাদ করেন; এটিরও সন্তোষজনক ফলন পেয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে ইঁদুরের উপদ্রবের কারণে ফলন কম পেয়েছেন বলে জানান তিনি। চলতি মৌসুমেও তিনি তার ১২ একর জমিতে ব্রি ধান-২৮ আবাদ করেছেন যা চলতি সপ্তাহে কর্তন করা হবে বলে জানান তিনি। দশমিনা বীজ বর্ধন খামার থেকে সরবরাহকৃত বীজের গুণগত মান সম্পর্র্কে অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। এই খামারে উৎপাদিত বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের কারণে এই অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আসছে বলে জানান তিনি।

খামারের সূযর্মুখী ক্ষেতের সামনে প্রকল্প পরিচালক মো. আলমগীর মিঞা ও বিএডিসি’র মহাব্যবস্থাপক (বীজ) মো. আমিনুল ইসলাম
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক কারণে এ অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ হ্রাস পাচ্ছে। তবে এই বীজ বর্ধন খামার থেকে উৎপাদিত দুর্যোগ-সহিষ্ণু ও মানসম্মত বীজ এ অঞ্চলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারবে। এ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের অনাবাদি অনেক জমি চাষাবাদের আওতায় আসছে। এতে এই অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ এক ফসলি জমি দুই বা তিন ফসলি জমিতে পরিণত হবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আলমগীর মিঞা দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, এই খামারের ধান চাষ দেখে এলাকার অনেক কৃষক উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্রি ধান-৫২ (আমন) এবং ব্রি ধান-২৮ (বোরো) চাষ করে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছেন। ব্রি ধান-৫২ জলমগ্নতা-সহিষ্ণু। এ জাতটি ১৫ দিন পর্যন্ত পানির নিচে বেঁচে থাকতে পারে, যা ওই অঞ্চলের জন্য বিশেষ উপযোগী। এ সময় তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোতে আমন ও বোরো বীজ উৎপাদন কার্যক্রম জোরদারকরণের পাশাপাশি এ অঞ্চলে চাষাবাদ উপযোগী ফসল যেমন, আলু, গম, ফেলন, সূর্যমুখী ও সয়াবিন বীজ উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে।
বিএডিসি’র সদস্য পরিচালক (বীজ ও উদ্যান) রওনক মাহমুদ দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, বর্তমানে অভিজ্ঞ একজন প্রকল্প পরিচালকের তত্ত্বাবধানে খামারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়িত হচ্ছে। দেশে প্রতিকূলতা সহিষ্ণু ও উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন ফসলের মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনে এই খামারটি কাজ করছে। খামারে উৎপাদিত বিভিন্ন ফসলের বীজ এ অঞ্চলের চাষীরা সানন্দে গ্রহণ করছেন এবং আশানুরূপ ফলনে এসব ফসল আবাদে চাষীরা আরো আগ্রহী হচ্ছেন। এতে করে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের যেমন উন্নয়ন ঘটছে তেমনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও মজবুত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক ফজলে ওয়াহেদ খন্দকার দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, দশমিনা বীজ বর্ধন খামারটি বিএডিসি’র তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের বীজ শিল্পে বিএডিসি’র বিরাট অবদান রয়েছে। দশমিনা বীজ বর্ধন খামার বিভিন্ন ফসলের গুণগত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে এই খামারের অনেক বড় অবদান রাখতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জানতে চাইলে বিএডিসি’র চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঠিক ও সুষ্ঠু নির্দেশনায় এবং মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর গতিশীল নেতৃত্বে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। এ মহান অর্জনে বিএডিসি মূখ্য ভূমিকা পালনে বরাবর সচেষ্ট ছিল। তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে কৃষিজমির প্রাচুর্যতার কারণে এ অঞ্চলে কৃষির বিস্তার ঘটাতে হবে, পাশাপাশি বিভিন্ন হাইব্রিড ও উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে দশমিনা বীজ বর্ধন খামার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এখানে প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাতের ধান, গম, আলু, ডাল ও তৈল বীজ, ফেলন ও সূর্যমুখীসহ বিভিন্ন ফসল আবাদের মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে করে এই অঞ্চলে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ও দারিদ্র দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় তিনি আরো বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি ও কৃষকের উন্নতিকল্পে দশমিনার মতো নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ ও হাতিয়া এবং ফেণীর সোনাগাজীতেও বীজ বর্ধন খামার স্থাপনের লক্ষ্যে জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

