নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশের ‘নাস্তিক’ ব্লগারদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া দেশের মধ্যে সম্ভবত যুক্ত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতিমধ্যে জার্মানিতে বেশ কয়েকজন ব্লগার আশ্রয় পেয়েছেন। আরো অনেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে বসেছেন। তারা ঢাকায় দূতাবাসগুলোতে যোগাযোগ করছেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যে গত বুধবার খুন হলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র নাজিমুদ্দিন সামাদ। তিনিও ব্লগার এবং ‘ধর্মান্ধতা’র বিরুদ্ধে ব্লগে লিখতেন বলে শোনা যাচ্ছে।
এই ইস্যুটি উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে। গতকাল বৃহস্পতিবার ওই সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই উঠে আসে বিষয়টি। এ নিয়ে কথা বলেন মন্ত্রণালয়ের উপ-মুখপাত্র মার্ক টোনার।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উঠে আসে বাংলাদেশে ব্লগার হত্যা ও নিরাপত্তা হুমকিতে থাকা ব্লগারদের কথাও। যুক্তরাষ্ট্রে তাদের আশ্রয় দেয়ার গত দুই মাস ধরে আবেদন জানিয়ে আসছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। ‘ইসলামি উগ্রবাদীদের’ হুমকির মুখে থাকা বাংলাদেশি লেখকদের জরুরি আশ্রয় দেয়ার জন্য গত বছরের ২১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির কাছে চিঠি লেখে পেন আমেরিকান সেন্টারের নেতৃত্বে আটটি সংগঠনের একটি জোট। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রিপোর্টাস উইদাউট বর্ডারস এবং ফ্রিডম হাউজ।
বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে এই বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মার্ক টোনার স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই নাজিমুদ্দিনের পরিবারের প্রতি সহানুভূতি ব্যক্ত করে টোনার জানান, চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশের প্রতি সহায়তা অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হতে পারে এমন লোকদের যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় দেয়া হবে কি না- এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আসলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়। আমার জানা মতে, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা ব্লগারদের একটি অংশের ব্যাপারে বিষয়টি বিবেচনাধীন আছে।’
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আবেদনের প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জানতে চাইলে টোনার বলেন, ‘আমি জানি না। আমাকে আসলে দেখতে হবে, কেউ এর সুযোগ নিচ্ছে কি না। এ ব্যাপারে এখনো স্পষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না।’
ত্যিকার অর্থেই বিভিন্ন দেশ থেকে লোকজন এই সুযোগ য়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে সক্ষম কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা তার ধারণা। এ বিষয়ে তার কাছে সামান্য তথ্য আছে বলেও জানান।
অবশ্য টোনার রাজনৈতিক আশ্রয়ের নামে অভিবাসনের সুযোগ নেয়ার বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ না করলেও ইতিমধ্যে বিদেশে পাড়ি দেয়া ব্লগারদের মধ্য থেকেই এমন অভিযোগ এসেছে। তারা ফেসবুকে একাধিকবার স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন, অনেকে নাকি ব্লগার না হয়েও বা অত্যন্ত নিম্নমানের ব্লগার হয়েও নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে আশ্রয়ের জন্য দূতাবাসে ধরণা দিচ্ছেন।
সন্ত্রাসীদের হুমকিতে থাকা লোকদের আশ্রয় দেয়া বিষয়টি সম্পূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এবং এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু করার নেই ইঙ্গিত দিয়ে টোনার বলেন, যদি এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তবে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও জানানো হবে। তবে এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না।
নাজিমুদ্দিন হত্যাকাণ্ডে ইসলামিক চরমপন্থিদের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না- এই প্রশ্নের জবাবে টোনার বলেন, ‘আমরা এখনো কাউকে দায় স্বীকার করতে দেখিনি। আগের ঘটনাগুলোর দায় আল কায়েদার ভারতীয় শাখা স্বীকার করেছিল। তবে আমরা এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট না।’
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সংগামের কথা তুলে ধরে বলা হয়, চরমপন্থা কখনো বাংলাদেশের গৌরবময় ঐতিহ্য এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে পরাজিত করতে পারবে না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে আছে এবং সরকারকে সবসময় সমর্থন দিয়ে যাবে বলেও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।
২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘মুক্তমনা ব্লগার’ হত্যার ধারাবাহিক নৃশংসতা। এরপর এ পর্যন্ত পাঁচ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
একের পর এক হত্যার ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ব্লগাররা। প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ জন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলে গেছেন। আরো অনেকে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে জানা যায়।
বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম অন্তত দু’টি বিদেশি দূতাবাসের বরাত দিয়েছে জানিয়েছে, প্রায় সাতজন ব্লগার তাদের দেশে যাওয়ার জন্য মধ্যে আবেদন করেছেন।
আর যারা এর মধ্যে বিদেশে গেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন- ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন, ওমর ফারুক লুক্স, অনন্য আজাদ, শাম্মী হক, মাহমুদুল হক মুন্সি (সস্ত্রিক), মশিউর রহমান বিপ্লব ও রাসেল পারভেজ। এছাড়া আরেক ব্লগার অমি রহমান পিয়ালও সুইডেনে রাজনৈতিক আশ্রয় নিচ্ছেন বলে ফেসবুকে জানিয়েছে আসিফ মহিউদ্দিন।
এরা সবাই এখন জার্মানিতে। যুক্তরাষ্ট্র রাজি হলে অন্যরা হয়তো সেখানেই যাবেন।
নাজিমুদ্দিন সামাদের আগে সর্বশেষ খুনের শিকার হন নীলাদ্রী চ্যাটার্জি ওরফে নিলয়। ‘নীল নিলয়’ ছদ্মনামে তিনি লিখতেন। এর আগে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, অনন্ত বিজয় দাশ ও ওয়াশিকুর রহমান। কোনো হত্যারই এ পর্যন্ত বিচার হয়নি।
জামায়াত নেতা ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হয় শাহবাগে। তখন জাতীয় দুটি দৈনিক ব্লগারদের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ লেখা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় মাঠে নামে হেফাজতে ইসলাম।
উল্লেখ্য, গত বুধবার দিবাগত রাত ৯টায় রাজধানীর সূত্রাপুর থানাধীন একরামপুর মোড়ে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও পিস্তলের গুলিতে নির্মমভাবে খুন হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিমউদ্দিন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্সের বি সেকশনের ছাত্র ছিলেন। নাজিমুদ্দিনের গ্রামের বাড়ি সিলেটে।

