
ছবি : রাইস ট্রাসপ্লান্টার
হাসান রেজা : বাংলাদেশের কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধিসহ আধুনিক বিভিন্ন প্রযুক্তির প্রসার ঘটেছে। সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করতে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। যান্ত্রিকীকরণের বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রসার ঘটায় ক্রমেই কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটছে।কৃষকদের যান্ত্রিকীকরণে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহী করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প (২য় পর্যায়)’ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। প্রকল্পটি রিপার, কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, পাওয়ার টিলার চালিত বেড প্লান্টারসহ বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহী ও উদ্বুদ্ধ করছে। সেই সাথে এই যন্ত্রগুলো ক্রয়ে সরকারি ৩০ শতাংশ উন্নয়ন সহায়তাও কৃষকদের আকৃষ্ট করেছে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে প্রকল্পটির আওতাভুক্ত ৫১টি জেলার ২১৭টি উপজেলায় প্রদর্শিত রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ও পাওয়ার টিলার চালিত বেড প্লান্টার কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণে চারা রোপণে রাইস ট্রান্সপ্লান্টার বেশ কার্যকরি। পাশাপাশি পাওয়ার টিলার চালিত বেড প্লান্টার যন্ত্র দিয়ে ১-২ চাষেই বেড তৈরি, সার প্রয়োগ ও বীজ বপনের কাজ একইসঙ্গে করা যায়। বীজতলা তৈরিসহ চারা রোপণে সময় ও অর্থ বাঁচাতে এই যন্ত্র দু’টির কার্যকারিতা দেখে প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া কৃষকরা উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন।

ছবি : বেড প্লান্টার
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কৃষক পর্যায়ে যন্ত্রের ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ে যেতে পারলে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, টেকসই কৃষি উন্নয়ন, কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, শস্য অপচয় কমানো, শস্য নিবিড়তা এবং কৃষকের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। উৎপাদন পর্যায় হতে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত যাতে শস্য নষ্ট না হয়, ফলন যাতে হ্রাস না পায় সে লক্ষ্যে খামার যান্ত্রিকীকরণের এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, দেশে কৃষিকাজের মধ্যে সবচেয়ে শ্রম নির্ভর হচ্ছে বীজ বা চারা রোপণ, বীজতলা তৈরি, আগাছা দমন ও ফসল কর্তন। মৌসুমের নির্দিষ্ট সময়ে বীজ বপন এবং ফসল কেটে ঘরে তুলতে কৃষককে বেশ সংকটে পড়তে হয়। ঐ সময় কৃষিশ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। কখনো কখনো দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও কৃষিশ্রমিক পাওয়া যায় না। এই প্রেক্ষাপটে রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ও বেড প্লান্টার যন্ত্র দু’টি দেশের কৃষি ও কৃষকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে প্রকল্পটির মনিটরিং অফিসার বদরুজ্জামান মুসলিমী দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, প্রকল্পভুক্ত প্রতিটি উপজেলায় রাইস ট্রান্সপ্লান্টার যন্ত্রের ৪টি করে মোট ৮৬৮টি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে একই সংখ্যক উপজেলার প্রতিটিতে ২টি করে মোট ৪৩৪টি বেড প্লান্টারের প্রদর্শনী সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত ও নিখুঁতভাবে অত্যন্ত কম খরচ ও সময়ে অধিক জমিতে নির্দিষ্ট পরিমাণে চারা লাগানো যায়। এতে ঘণ্টায় মাত্র ০.৫-০.৬ লিটার অকটেন খরচ হয় এবং এই সময়ে ৩০-৪০ শতাংশ জমিতে চারা লাগানো যায়। চারা থেকে চারার দূরত্ব ১১-২০ সে.মি. পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সে.মি. বজায় রাখা সম্ভব। ব্যবহার শেষে মেশিন ধোয়ার জন্য যন্ত্রটিতে রয়েছে অটোমেটিক ওয়াটার পাম্প, ফলে খুব সহজেই মেশিন পরিষ্কার করা যায়।
অন্যদিকে পাওয়ার টিলার চালিত বেড প্লান্টার দিয়ে কম খরচ, স্বল্প শ্রম ও সময়ে বেড পদ্ধতিতে গম, ভুট্টা, আলু, মুগ, তিলসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি বীজ বপন করা যায়। স্থায়ী বেডে ফসলের অবশিষ্টাংশ রেখে শূন্য চাষে বীজ বপন করা যায়। বেড প্লান্টার দিয়ে বেডে ফসল চাষ করলে ২৫ শতাংশ সেচ খরচ ও সময় কমে যায়। এটির কার্যক্ষমতা ঘণ্টায় ২৭ শতাংশ।
প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ শেখ মো. নাজিম উদ্দিন দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, প্রতি মৌসুমে কৃষকদের উৎসাহ যোগাতে প্রকল্পভুক্ত উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী স্পট প্রদর্শন করা হচ্ছে। প্রদর্শনী দেখে চাষিরা বিভিন্ন প্রযুক্তির সাথে দ্রুত পরিচিত হতে পারায় এবং অর্থ ও সময় বাঁচাতে এগুলোর কার্যকারিতা অনুধাবন করায় খুব অল্প সময়ে যান্ত্রিকীকরণের সুফল ছড়িয়ে পড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মো. হামিদুর রহমান দৈনিক পাঞ্জেরীকে বলেন, বর্তমানে দেশের কৃষিখাতে নিবিড়করণ ও বাণিজ্যিকিকরণসহ ব্যাপক বৈচিত্র্য এসেছে। কিন্তু আমাদের কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা তো বাড়েনি বরং তাদের শহরমুখিতা, অন্য কর্মসংস্থানসহ অকৃষিখাতে যুক্ত হওয়ায় ভরা মৌসুমে চাষাবাদ ও ফসল কর্তনে শ্রমিক সংকটে কৃষকরা দিনে দিনে আতংকিত হয়ে পড়ছেন। এমন প্রেক্ষাপটে কৃষিখাতে যান্ত্রিকীকরণের কোন বিকল্প নেই। তবে যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে বিদেশি যন্ত্রের উপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশীয় যন্ত্রের উদ্ভাবক, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের উৎসাহী ও উদ্বুদ্ধকরণে সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান হামিদুর রহমান।

